বটবাহিনীর দাপটে হুমকিতে ডিজিটাল জনমত, গণতন্ত্র ও তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা
রবিবার, ৫ জুলাই, ২০২৬ ৬:০০ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
বাংলাদেশে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বট বা কৃত্রিম অ্যাকাউন্টের ব্যবহার উদ্বেগজনকভাবে বাড়ছে বলে বিভিন্ন মহলে আলোচনা চলছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, সংগঠিত বটবাহিনী ভুয়া জনমত তৈরি, অপপ্রচার, চরিত্রহনন এবং বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে গণতান্ত্রিক পরিবেশ ও তথ্যপ্রবাহকে প্রভাবিত করতে পারে। তাই প্রযুক্তিগত নজরদারি, আইনি কাঠামো এবং ডিজিটাল সচেতনতা জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।
বাংলাদেশে ইন্টারনেট ও স্মার্টফোনের ব্যবহার বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম মানুষের মতপ্রকাশ, তথ্য আদান-প্রদান ও যোগাযোগের অন্যতম প্রধান প্ল্যাটফর্মে পরিণত হয়েছে। তবে এই ইতিবাচক পরিবর্তনের পাশাপাশি নতুন ধরনের একটি চ্যালেঞ্জও সামনে এসেছে—সংগঠিত বটবাহিনী বা সমন্বিত ভুয়া অনলাইন কার্যক্রম।
সম্প্রতি এক অনুষ্ঠানে প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ দাবি করেন, দেশের সাইবার জগতের উল্লেখযোগ্য অংশের ট্রাফিক কৃত্রিম বা বটনির্ভর। তাঁর মতে, অনলাইন প্রতিক্রিয়া বা জনমত বিশ্লেষণের সময় প্রকৃত ব্যবহারকারী ও কৃত্রিম কার্যক্রম আলাদা করতে না পারলে ভুল সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আশঙ্কা থাকে।
বট কী?
'বট' শব্দটি এসেছে 'রোবট' থেকে। এটি এমন একটি সফটওয়্যার, যা মানুষের মতো আচরণ করে স্বয়ংক্রিয়ভাবে বিভিন্ন অনলাইন কার্যক্রম পরিচালনা করতে পারে। বিপুলসংখ্যক ভুয়া অ্যাকাউন্টকে একই উদ্দেশ্যে ব্যবহার করা হলে সেটিকে সাধারণভাবে 'বট আর্মি' বা 'বটবাহিনী' বলা হয়।
বিশেষজ্ঞদের মতে, বট সাধারণত দুই ধরনের হয়ে থাকে। একটি সম্পূর্ণ স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যারভিত্তিক বট, যা নির্দিষ্ট নির্দেশনা অনুযায়ী মন্তব্য, প্রতিক্রিয়া বা পোস্ট করতে পারে। অন্যটি হলো সমন্বিত ভুয়া অ্যাকাউন্ট পরিচালনাকারী মানবচালিত ট্রল নেটওয়ার্ক, যেখানে একজন ব্যক্তি একাধিক আইডি নিয়ন্ত্রণ করে একই ধরনের প্রচারণায় অংশ নেন।
কীভাবে কাজ করে বটবাহিনী?
বটবাহিনীর প্রধান লক্ষ্য থাকে কোনো নির্দিষ্ট ইস্যুতে জনমত প্রভাবিত করা। একই ধরনের হাজারো মন্তব্য, লাইক, শেয়ার কিংবা প্রতিক্রিয়ার মাধ্যমে একটি কৃত্রিম জনসমর্থনের পরিবেশ তৈরি করা হয়।
এ ছাড়া নির্দিষ্ট ব্যক্তি, প্রতিষ্ঠান বা সংগঠনের বিরুদ্ধে পরিকল্পিত অপপ্রচার চালানো, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সমন্বিতভাবে রিপোর্ট করে কোনো পেজ বা অ্যাকাউন্ট বন্ধ করার চেষ্টা এবং বিভ্রান্তিকর তথ্যকে দ্রুত ছড়িয়ে দেওয়াও বটবাহিনীর পরিচিত কৌশলগুলোর মধ্যে অন্যতম।
কীভাবে শনাক্ত করা যায়?
প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞদের মতে, কোনো পোস্ট প্রকাশের কয়েক সেকেন্ডের মধ্যেই অস্বাভাবিক সংখ্যক অভিন্ন মন্তব্য দেখা গেলে সেটি বট কার্যক্রমের ইঙ্গিত হতে পারে।
এ ছাড়া একই ভাষা ও একই ধরনের মন্তব্য, ভুয়া বা অসম্পূর্ণ প্রোফাইল, ব্যক্তিগত তথ্যের অভাব, শুধুই শেয়ার করা পোস্ট এবং অস্বাভাবিক ফলোয়ার বা বন্ধু তালিকাও সন্দেহের কারণ হতে পারে।
কেন এটি উদ্বেগের বিষয়?
বিশ্লেষকদের মতে, সংগঠিত বটবাহিনী কৃত্রিমভাবে এমন একটি পরিবেশ তৈরি করতে পারে, যাতে সাধারণ মানুষ মনে করেন একটি নির্দিষ্ট মতই সংখ্যাগরিষ্ঠের মতামত। মনোবিজ্ঞানে এটিকে 'ব্যান্ডওয়াগন ইফেক্ট' এবং রাজনৈতিক যোগাযোগে 'অ্যাস্ট্রোটার্ফিং' বলা হয়।
এ ধরনের কৃত্রিম প্রচারণা বিভ্রান্তি ছড়ানোর পাশাপাশি সামাজিক বিভাজন, বিদ্বেষ এবং তথ্যের প্রতি মানুষের আস্থাও দুর্বল করতে পারে। একই সঙ্গে গণতান্ত্রিক আলোচনার পরিবেশ ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়।
করণীয় কী?
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকট মোকাবিলায় সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম পরিচালনাকারী আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর স্থানীয় ভাষা ও বাস্তবতা বোঝার সক্ষমতা বাড়াতে হবে। পাশাপাশি সমন্বিত ডিজিটাল অপপ্রচার ও ভুয়া অ্যাকাউন্ট পরিচালনার বিরুদ্ধে কার্যকর আইন ও নজরদারি প্রয়োজন।
এ ছাড়া স্কুল-কলেজ পর্যায় থেকেই ডিজিটাল মিডিয়া লিটারেসি, তথ্য যাচাই এবং দায়িত্বশীল অনলাইন আচরণ বিষয়ে শিক্ষা জোরদার করা জরুরি বলে মত দিয়েছেন সংশ্লিষ্টরা। সচেতন ব্যবহারকারী, কার্যকর প্রযুক্তিগত ব্যবস্থা এবং জবাবদিহিমূলক নীতিমালাই কৃত্রিম জনমত তৈরির প্রবণতা মোকাবিলায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
১৩৯ বার পড়া হয়েছে