ভেনেজুয়েলায় প্রাণহানির সংখ্যা বাড়ছে, এখন পর্যন্ত মৃত্যু ২৬৪৫
শনিবার, ৪ জুলাই, ২০২৬ ৪:৫৮ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
ভেনেজুয়েলায় ২৪ জুন ভোরে মাত্র ৩৯ সেকেন্ডের ব্যবধানে ৭.২ ও ৭.৫ মাত্রার দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। এতে হাজারো মানুষের প্রাণহানি, ব্যাপক অবকাঠামোগত ক্ষয়ক্ষতি এবং বড় ধরনের মানবিক সংকট তৈরি হয়েছে। উদ্ধার অভিযান অব্যাহত থাকলেও বিশুদ্ধ পানি, চিকিৎসাসেবা ও আশ্রয়ের সংকট পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে।
ভেনেজুয়েলায় ২৪ জুন ভোর ৬টা ৪ মিনিটে মাত্র ৩৯ সেকেন্ডের ব্যবধানে ৭.২ ও ৭.৫ মাত্রার দুটি শক্তিশালী ভূমিকম্প আঘাত হানে। দেশটির সাম্প্রতিক ইতিহাসে এটি অন্যতম শক্তিশালী ভূমিকম্প হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, এ ঘটনায় অন্তত ২ হাজার ৬৪৫ জন নিহত এবং ১২ হাজার ৬৬৬ জনের বেশি মানুষ আহত হয়েছেন।
দুর্যোগ প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এখন পর্যন্ত ৬ হাজার ৪৬২ জনকে জীবিত উদ্ধার করা হয়েছে। পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্ত ৮৬ হাজার ১১৭টি পরিবারকে জরুরি সহায়তা দেওয়া হয়েছে। সরকারি হিসাবে ভূমিকম্পে ৮৮৫টি ভবন ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যার মধ্যে ১৮৯টি ভবন সম্পূর্ণ ধসে পড়েছে।
তবে স্যাটেলাইট বিশ্লেষণের ভিত্তিতে নাসার গবেষণায় ধারণা করা হয়েছে, প্রায় ৫৮ হাজার ৮৭০টি ভবন আংশিক বা সম্পূর্ণ ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে থাকতে পারে। এই সংখ্যা সরকারি হিসাবের তুলনায় উল্লেখযোগ্যভাবে বেশি।
জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি) জানিয়েছে, ভূমিকম্পে আর্থিক ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ ৬ দশমিক ৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলারেরও বেশি হতে পারে।
উদ্ধার তৎপরতায় দেশি-বিদেশি হাজারো কর্মী কাজ করছেন। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, ৩ হাজার ৩০০-এর বেশি আন্তর্জাতিক উদ্ধারকর্মী এবং রাজধানী কারাকাস থেকে পাঠানো প্রায় ৩০ হাজার কর্মী দুর্গত এলাকায় মোতায়েন রয়েছেন। এ ছাড়া ইকুয়েডর, ইসরায়েলসহ বিভিন্ন দেশের অন্তত ৫০টি আন্তর্জাতিক উদ্ধারকারী দল উদ্ধার অভিযানে অংশ নিয়েছে।
মানবিক সহায়তায় যুক্তরাষ্ট্র ৯০০ সামরিক সদস্য মোতায়েন করেছে। পাশাপাশি মানবিক সহায়তাবাহী বিমানের অবতরণের জন্য কারাকাসের প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের ক্ষতিগ্রস্ত রানওয়ে মেরামত করা হয়েছে এবং উপকূলে নৌবাহিনীর জাহাজ মোতায়েন করা হয়েছে। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের আরও ১০০ সদস্যও ত্রাণ কার্যক্রমে সহায়তা করছেন।
এ পর্যন্ত যুক্তরাষ্ট্রের ট্রাম্প প্রশাসন জাতিসংঘ ও বিভিন্ন আন্তর্জাতিক ত্রাণ সংস্থার মাধ্যমে ৩০০ মিলিয়ন মার্কিন ডলারের সহায়তা ঘোষণা করেছে। তবে ইউএনডিপির মূল্যায়ন অনুযায়ী, মোট ক্ষয়ক্ষতির তুলনায় এই সহায়তা এখনও প্রয়োজনের তুলনায় অনেক কম।
এদিকে ভূমিকম্প-পরবর্তী পরিস্থিতিতে বিশুদ্ধ পানির সংকট, অস্থায়ী আশ্রয়কেন্দ্রে অতিরিক্ত ভিড় এবং অস্বাস্থ্যকর পরিবেশ নতুন উদ্বেগ তৈরি করেছে। মানবিক সংস্থাগুলো সতর্ক করে বলেছে, অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতির কারণে সংক্রামক রোগ ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি বেড়েছে।
কারাকাসের হাসপাতাল দেল ওয়েস্তের ট্রমা ইউনিটের প্রধান ড. ইউজেনিও কোভা বলেন, দীর্ঘ সময় ধ্বংসস্তূপে আটকে থাকা আহত ব্যক্তিদের মধ্যে সংক্রমণের ঝুঁকি দ্রুত বাড়ছে। ফলে চিকিৎসাসেবার ওপর চাপ আরও বৃদ্ধি পাচ্ছে।
লাতিন আমেরিকা ও ক্যারিবীয় অঞ্চলের জন্য জাতিসংঘের মানবিক সংস্থার মুখপাত্র ভেরোনিক দুরো বলেন, তীব্র গরমের কারণে মশাবাহিত রোগ ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কাও রয়েছে। একই সঙ্গে বর্জ্য ও ধ্বংসস্তূপ অপসারণ এখন বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
মার্কিন ভূতাত্ত্বিক জরিপ সংস্থা (USGS) জানিয়েছে, ৭.৫ মাত্রার ভূমিকম্পটির উৎপত্তিস্থল ছিল ইয়ারাকুই অঙ্গরাজ্যের ইউমারে শহরের দক্ষিণ-পূর্বে প্রায় ২৩ কিলোমিটার দূরে। অন্যদিকে ৭.২ মাত্রার ভূমিকম্পটির কেন্দ্র ছিল একই অঙ্গরাজ্যের সান ফেলিপের উত্তর-পূর্বে প্রায় ২৩ দশমিক ৯ কিলোমিটার দূরে।
দেশটির যোগাযোগ ও তথ্য মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এ পর্যন্ত ৮৯০টি আফটারশক বা পরাঘাত রেকর্ড করা হয়েছে। ফলে দুর্গত এলাকায় উদ্ধার অভিযান ও সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ এখনো কাটেনি।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, তাৎক্ষণিক উদ্ধার কার্যক্রমের পাশাপাশি বিশুদ্ধ পানি, চিকিৎসাসেবা, আশ্রয় ও জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থার উন্নয়ন নিশ্চিত করাই এখন ভেনেজুয়েলার সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
১১৪ বার পড়া হয়েছে