সর্বশেষ

মতামত

প্রসঙ্গ ক্রসফায়ার থেকে মব : রক্তের রাজনীতি

মনজুর এহসান চৌধুরী
মনজুর এহসান চৌধুরী

মঙ্গলবার, ২৩ জুন, ২০২৬ ৬:৩৮ অপরাহ্ন

শেয়ার করুন:
২০০৪ সালের ২৮ জুন, সোমবার। কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালের মর্গের সামনে ভীড় জমেছে। সকালেই পত্রিকা গুনে গুনে পৌঁছে যায় পাঠকের কাছে। প্রিন্ট আর ইলেকট্রনিক মিডিয়ার সাংবাদিকরা এখন সেই মর্গের চারপাশে—ছবি, বিবরণ, বক্তব্য সংগ্রহে ব্যস্ত। তাদের সামনে কুষ্টিয়া জেলার প্রথম ক্রসফায়ারের মৃত দেহ: গণমুক্তিফৌজের ক্যাডার আরব আলী।

পুলিশের সাথে বন্দুকযুদ্ধে নিহত বলে দাবি করা হয়। কিন্তু সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে পুলিশ কর্মকর্তাদের হালকা উত্তপ্ত পরিবেশে ঘটে বাকবিতন্ডা। এই ঘটনাটি ছিল কুষ্টিয়া জেলার প্রথম ক্রসফায়ার।

স্থানীয় পত্রিকায় যে ছবি ফুটেছিল

২৯ জুন ২০০৪ সালে প্রকাশিত দৈনিক আন্দোলনের বাজার‑এর এক প্রতিবেদন থেকে সেদিনের ঘটনার কিছু অংশ ছিল প্রায় এরকম:
• গণমুক্তিফৌজের ফ্যাক্স বার্তা চলে আসে শিরোনামে: “হাত–পা বাঁধা অবস্থায় পুলিশী হেফাজতে আরব আলীর মৃত্যু।”
• পুলিশ জানায়, আরব আলীকে অস্ত্র উদ্ধারের নামে নিয়ে যেতে গেলে তার দলের সন্ত্রাসীদের সাথে বন্দুকযুদ্ধ হয়, তাতেই সে ক্রসফায়ারে নিহত হয়।
• আরব আলীর পরিবার দাবি করে, পুলিশ অস্ত্র উদ্ধারের নাটক করে তাকে পুরোপুরি পরিকল্পিতভাবে গুলি করে হত্যা করেছে।
• লাশ কুষ্টিয়া জেনারেল হাসপাতালে আনা হলে জাতীয়–স্থানীয় মিডিয়ার সাংবাদিকরা ছবি নিতে গেলে কর্তব্যরত পুলিশ তাদের সাথে রূঢ় আচরণ করে, কয়েকজনকে লাঞ্চিত করেও।
আরব আলীর পিতা আকরাম আলীর দাবি: পুলিশ তার ছেলেকে গ্রেফতার করে অস্ত্র উদ্ধারের নামে টাকা দাবি করে। তাদের দাবীকৃত টাকা দেওয়া না হওয়ায় ক্রসফায়ার বানিয়ে তাকে হত্যা করা হয়। তিনি ঘটনার বিচারের দাবী জানান।

লন্ডনে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড

২০০৫ সালের জুন মাসের ১৭ তারিখে ইউরোপিয়ান হিউম্যান রাইটস কমিটির আমন্ত্রণে লন্ডনে মানবাধিকার কর্মশালায় যোগ দিই। লর্ড এভেরী আমাকে বিষয় বেঁধে দেন: “বাংলাদেশে বিচার বহির্ভূত হত্যাকাণ্ড।” আমি সেখানে কোনো দীর্ঘ বক্তৃতা না দিয়ে শুধু ৫ মিনিট ৫২ সেকেন্ডের একটি বর্ণনাহীন ভিডিও জমা দিই। লন্ডনের একটি সোয়াস অডিটরিয়ামে সেই ভিডিও দেখানো হয় ইউরোপীয় ইউনিয়নের নেতাদের উপস্থিতিতে। অনেকে সেদিন চোখ ঢেকে ধরে কাঁদেন। ১২ বছর পর সেই ভিডিওটি আমি সোশ্যাল মিডিয়ায় আপলোড করেছিলাম ২০১৬ সালে।

সম্পাদকীয় থেকে যে আহ্বান এলো

ক্রসফায়ার শুরু হওয়ার পর আমি একটি সম্পাদকীয় লিখেছিলাম:
“মানুষ যখন মানুষকে হত্যা করবে আর সেই অপরাধের জন্য কোনো বিচারের মুখোমুখি হতে হবে না, যদি এ অবস্থা চলতে থাকে—একদিন পুলিশ চাইলেই যে কোনো মানুষকে ক্রসফায়ার দেবে। রক্তের এক ধরনের নেশা আছে, আর সেই নেশায় পুলিশ আসক্ত হয়ে পড়লে সেখান থেকে ফিরে আসা কঠিন হয়ে পড়ে। ঠিক সেটাই হয়েছে। এই নেশা এখন পুলিশকে তাড়না করছে। তাই এ ধরনের হত্যার শিকার হয়েছে রাজনৈতিক প্রতিহিংসা, গ্রেফতার বাণিজ্য, অপরাধী বা নিরপরাধ মানুষ। অনেককে লঘু পাপে প্রাণদণ্ড দেওয়া হয়েছে।”
এবং ঠিক সেই লেখার জন্যই আমি নিজেও তালিকাভূক্ত হয়ে যাই। ২০০৬ সালের ১৮ মে, আন্দোলনের বাজার পত্রিকার প্রথম পাতায় একটি বিশেষ সম্পাদকীয় প্রকাশের রাতেই কুষ্টিয়া ছাড়তে হয়। রাতের অন্ধকারে প্রস্থান করি। আমার ভাগ্য ভালো ছিল, তাই আজও বেঁচে আছি। সে সময় আমাকে একজন RAB কর্মকর্তা সাহায্য করেছিলেন।

মব লিন্চিং: বিচারহীনতার নতুন নতুন সংস্করণ

ক্রসফায়ার তখন যে বিচারহীনতার শিক্ষা দিয়েছিল, সেই শিক্ষা থেকেই ধীরে ধীরে গড়ে উঠছে আজকের নতুন শিক্ষা। সেই সময় একটা প্রচলন ছিল—কোনো ডাকাত বা অপরাধীকে ধরে মারলে তাকে “গণপিটুনীতে মারা গেছে” বলে ঘোষণা করা হত। গণপিটুনি নাকি পুলিশ এনকাউন্টার, প্রশ্ন তোলা হত না; রাস্তা–বাজারে মানুষের সন্তোষই ছিল যথেষ্ট।
কিন্তু বছর কেটে যাওয়ার সাথে সাথে সেই গণপিটুনির একটা নব্য সংস্করণ হয়ে উঠেছে মব লিন্চিং। আজ ফেসবুক, টিকটক–এর মাধ্যমে উসকানি দেওয়া হয়, মানুষ সরাসরি উস্কানির তালে তালে একটা মব সৃষ্টি করে নানা ধরনের অপরাধী বা সন্দেহভাজনদের ধরে মারতে শুরু করে। একদিকে ছিলো স্টেট এনকাউন্টার, অন্যদিকে এখন চলছে মানুষের হাতে মানুষের বিচারহীন নিদারুণ হত্যা।
অর্থাৎ, যে বিচারহীনতার শিক্ষা রাষ্ট্র–পুলিশ–RAB একসময় দিয়েছে, সেই শিক্ষা আজ প্রতিটি মুঠোফোনে ধরে ধরে ঢুকেছে গণস্তরে। গণপিটুনি থেকে মব লিন্চিং—এই নয়া সংস্করণের মাধ্যমে নিজেকে বিচারক, ফাঁসির স্তম্ভ নির্মাতা হিসেবে দাঁড়িয়ে গেছে এক গোষ্ঠী। এটাও তখন যে শিক্ষার ফল, তা আজ আর অস্বীকার করার উপায় নেই।

কুষ্টিয়ার ক্রসফায়ারের ধারা

ক্রসফায়ার শুরু হওয়ার পর বছর কেটে গেল—একজন, দুইজন, তিনজন আর কখনও আবার চারজন একসাথে ক্রসফায়ার হতে থাকে কুষ্টিয়াতে। এই নিহতদের তালিকায় এক সময় কুষ্টিয়া বাংলাদেশের শীর্ষস্থান দখল করে ছিল। আজও সেই ছাপ পুরোপুরি কাটেনি।
ক্রসফায়ারের প্রথম বছরে (২০০৪–০৫) কুষ্টিয়াতে নিহত হয় ৬৪ জন। প্রথম তিন বছরে নিহত হয় ২৭২ জন। যাদের কে ক্রসফায়ার দেওয়া হয়েছে তাদের মধ্যে রয়েছে রাজনীতিক, ব্যবসায়ী, ছাত্র, ছিঁচকে চোর, ডাকাত, মাদক ব্যবসায়ী, গোপন সংগঠনের নেতা–কর্মী। তাদের অধিকাংশকেই বিচারের মাধ্যমে দায়বদ্ধ করা যেতো। কিন্তু তা না করে রক্তের নেশায় হলি খেলেছে RAB–পুলিশ।

মধ্যরাতে স্মৃতি কাঁপে, ফোন বাজে না


এখন থেকে দুই দশকের বেশি সময় পার হয়ে গেছে। এখন টেলিফোন বাজে না, আর মোবাইল বাজলে আমি আর ছুটে যাই না ক্যামেরা হাতে ক্রসফায়ারের ঘটনাস্থলে। কিন্তু রাতের নিস্তব্ধতা ভেদ করে মাঝে মাঝে ফিরে আসে সেই সময়ের স্মৃতি। যখন ফোন বাজলেই মনে হতো হয়তো আরেকজন ক্রসফায়ার নিহত হয়েছে। সেই সময় মাথার মধ্যে একটা ঝংকার বাজত—ছুটতে হবে মৃত শরীরের ছবি নিতে। সেই একই কাহিনী ছাপতে হবে, শুধু বদলে যায় নাম, জায়গা আর উদ্ধার করা অস্ত্রের তালিকা।
এভাবে আমি নিজ হাতে তুলেছি ১২৮টি বিচার বহির্ভূত হত্যার ছবি। তখন অনেক দূরে সরে যাওয়ার পরও সেই স্মৃতিগুলো থেকে মুক্তি পাইনি। প্রতিটি মুখ এখনও জীবন্ত থাকে আমার ভেতরে।

শেষ কথা

ক্রসফায়ার শুধু কুষ্টিয়ার ঘটনা নয়, বাংলাদেশের রাজনীতির একটি কালো পরিচ্ছেদ। এটি আইন ও ন্যায়বিচারকে ঠেলে সরিয়ে দিয়ে রাজনৈতিক ক্ষমতা ও পুলিশ–RAB‌’র অপরাধমুক্ত চলার পথ তৈরি করেছে। এর বিচার হবে তখনই, যখন সব ক্রসফায়ারের রেকর্ড ও ভিডিও, সব মৃতদেহের ময়নাতদন্ত রিপোর্ট, সব সাক্ষী ও সাংবাদিকের বক্তব্য খোলা হবে। তার আগে পর্যন্ত ক্রসফায়ার থাকবে কেবল মৃত্যুর ঘটনা নয়, বাংলাদেশের রক্তের রাজনীতির একটি বার্থমার্ক হিসেবে।


লেখক : সাংবাদিক, কলামিস্ট ও লেখক।

১২৩ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন
এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন














সর্বশেষ সব খবর
মতামত নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

২৫০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন