মাদক নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইন, কিন্তু বাস্তবতায় চ্যালেঞ্জ; বাংলাদেশের সামনে বড় পরীক্ষা
মঙ্গলবার, ২৩ জুন, ২০২৬ ৫:৩৮ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ মাদক নিয়ন্ত্রণে কঠোর আইন ও কঠোর প্রয়োগের পথ বেছে নিয়েছে। সিঙ্গাপুর, মালয়েশিয়া, সৌদি আরব কিংবা ইন্দোনেশিয়ার মতো দেশগুলোতে মাদক পাচার ও বাণিজ্যের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। বাংলাদেশেও আইন আছে, তবে বিশেষজ্ঞদের মতে, আইনের কার্যকর প্রয়োগ, সামাজিক সচেতনতা এবং রাজনৈতিক সদিচ্ছার ঘাটতির কারণে মাদকের বিস্তার পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হচ্ছে না।
মাদককে সমাজ ও রাষ্ট্রের জন্য অন্যতম বড় হুমকি হিসেবে বিবেচনা করা হয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ নিজেদের বাস্তবতা অনুযায়ী মাদক নিয়ন্ত্রণে ভিন্ন ভিন্ন নীতি গ্রহণ করেছে। আধুনিক সিঙ্গাপুরের প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী লি কুয়ান ইউ মাদকের বিরুদ্ধে কঠোর অবস্থানের জন্য পরিচিত ছিলেন। তাঁর নেতৃত্বে সিঙ্গাপুরে কঠোর মাদকবিরোধী আইন প্রণয়ন করা হয়, যার লক্ষ্য ছিল মাদক পাচার ও অপব্যবহার নিয়ন্ত্রণের মাধ্যমে নিরাপদ সমাজ গড়ে তোলা।
বিশ্লেষকদের মতে, সিঙ্গাপুরের অপরাধ নিয়ন্ত্রণে অর্থনৈতিক উন্নয়ন, কার্যকর আইনশৃঙ্খলা ব্যবস্থা, সামাজিক নীতি এবং মাদকবিরোধী কঠোর অবস্থান—সবকিছুই ভূমিকা রেখেছে। বর্তমানে দেশটি বিশ্বের অন্যতম নিরাপদ রাষ্ট্র হিসেবে পরিচিত।
শুধু সিঙ্গাপুর নয়, মালয়েশিয়া, সৌদি আরব, ইন্দোনেশিয়া, কুয়েত ও কাতারসহ অনেক দেশ মাদক পাচারের বিরুদ্ধে কঠোর আইন প্রয়োগ করে থাকে। বিভিন্ন দেশে মাদক-সংক্রান্ত অপরাধের জন্য দীর্ঘমেয়াদি কারাদণ্ড, ভারী জরিমানা কিংবা মৃত্যুদণ্ড পর্যন্ত রয়েছে।
যুক্তরাষ্ট্রেও মাদক নিয়ন্ত্রণ দীর্ঘদিন ধরে রাষ্ট্রীয় অগ্রাধিকারের বিষয়। ১৯৭১ সালে তৎকালীন মার্কিন প্রেসিডেন্ট রিচার্ড নিক্সন মাদককে দেশের অন্যতম বড় সামাজিক সমস্যা হিসেবে চিহ্নিত করে ‘ওয়ার অন ড্রাগস’ কর্মসূচি শুরু করেন। এরপর থেকে মাদক পাচার রোধে বিভিন্ন আইন ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা কার্যক্রম পরিচালিত হয়ে আসছে।
ফিলিপাইনের সাবেক প্রেসিডেন্ট রদ্রিগো দুতার্তেও মাদকবিরোধী অভিযানের জন্য আলোচিত ও সমালোচিত ছিলেন। তাঁর শাসনামলে পরিচালিত অভিযানে মানবাধিকার লঙ্ঘনের অভিযোগ ওঠে এবং বিষয়টি আন্তর্জাতিক মহলে ব্যাপক বিতর্কের জন্ম দেয়। তবে দেশটির একাংশের জনগণ মাদক নিয়ন্ত্রণে তাঁর ভূমিকার প্রশংসাও করে থাকে।
বাংলাদেশে মাদক নিয়ন্ত্রণে একাধিক আইন ও নীতিমালা থাকলেও বাস্তব পরিস্থিতি নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়মিত অভিযানের পরও দেশের বিভিন্ন এলাকায় মাদকের বিস্তার অব্যাহত রয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।
সরকারের তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে দেশজুড়ে হাজার হাজার মাদকবিরোধী অভিযান পরিচালিত হয়েছে। এসব অভিযানে বিপুলসংখ্যক মাদক কারবারি গ্রেপ্তার এবং অসংখ্য মামলা দায়ের করা হয়েছে। পাশাপাশি শীর্ষ মাদক কারবারিদের তালিকা প্রস্তুত ও তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার উদ্যোগও চলছে।
তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, শুধু অভিযান চালালেই হবে না; মাদক ব্যবসার পেছনের নেটওয়ার্ক, অর্থের উৎস এবং প্রভাবশালী পৃষ্ঠপোষকদের বিরুদ্ধে কার্যকর ব্যবস্থা নিতে হবে। একই সঙ্গে বিচারপ্রক্রিয়ার দীর্ঘসূত্রতা ও সাক্ষ্যপ্রমাণের দুর্বলতা অনেক ক্ষেত্রে মামলার সফল নিষ্পত্তিকে বাধাগ্রস্ত করছে।
প্রচলিত ইয়াবা, হেরোইন ও গাঁজার পাশাপাশি দেশে নতুন প্রজন্মের বিভিন্ন সিনথেটিক বা কৃত্রিম মাদকের ব্যবহার বাড়ছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। এসব মাদকের মধ্যে রয়েছে এলএসডি, এমডিএমএ, কিটামিন, ফেন্টানাইল, ম্যাজিক মাশরুমসহ বিভিন্ন উচ্চঝুঁকিপূর্ণ পদার্থ।
চিকিৎসকদের মতে, এসব মাদক তরুণদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের জন্য মারাত্মক হুমকি। সময়মতো কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে ভবিষ্যৎ প্রজন্মের ওপর এর নেতিবাচক প্রভাব আরও বাড়তে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, মাদক নিয়ন্ত্রণে শুধু আইন প্রয়োগ যথেষ্ট নয়। এর পাশাপাশি প্রয়োজন—
সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানভিত্তিক প্রতিরোধমূলক কার্যক্রম, পুনর্বাসন ব্যবস্থার উন্নয়ন, রাজনৈতিক সদিচ্ছা ও জবাবদিহি, সীমান্ত নজরদারি জোরদার করা এবং বিচারপ্রক্রিয়ার গতি বৃদ্ধি।
তাঁদের মতে, মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে সরকার, রাজনৈতিক দল, পরিবার, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান এবং নাগরিক সমাজকে সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে। দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই উদ্যোগ ছাড়া মাদকের বিস্তার রোধ করা কঠিন হবে।
১২৩ বার পড়া হয়েছে