শিশুদের ডিজিটাল আসক্তি, ১৬ বছরের নিচে নিষেধাজ্ঞা নিয়ে ভাবছে বাংলাদেশ
বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন, ২০২৬ ১১:২০ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
মোবাইল ফোন ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অতিরিক্ত ব্যবহারে বাংলাদেশের শিশু-কিশোরদের মধ্যে ঘুমের সমস্যা, মনোযোগহীনতা, মানসিক চাপ এবং সামাজিক বিচ্ছিন্নতা বাড়ছে বলে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারে কড়াকড়ি আরোপ করলেও বাংলাদেশে এখনো কার্যকর কোনো বয়সভিত্তিক নীতিমালা নেই। তবে সরকার বিষয়টি নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে বিবেচনা করছে বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ।
বাংলাদেশের শিশু-কিশোরদের মধ্যে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ব্যবহার দ্রুত বাড়ছে। ফেসবুক, ইউটিউব, টিকটক ও ইনস্টাগ্রামের মতো প্ল্যাটফর্মে দীর্ঘ সময় কাটানোর ফলে তাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে বলে বিভিন্ন গবেষণায় উঠে এসেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, অতিরিক্ত স্ক্রিননির্ভরতা শিশুদের স্মৃতিশক্তি, মনোযোগ ও সৃজনশীলতাকে ক্ষতিগ্রস্ত করছে। বাংলাদেশ মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগবিদ্যা বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. সালাহউদ্দিন কাউসার বিপ্লব বলেন, সামাজিক মাধ্যম ও ইন্টারনেটের অতিরিক্ত ব্যবহার মস্তিষ্কে ডোপামিনের ক্ষরণ বাড়িয়ে আসক্তির প্রবণতা তৈরি করে। এর ফলে শিশু-কিশোররা বাস্তব জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে ভার্চ্যুয়াল জগতে বেশি সময় কাটাতে শুরু করে।
তিনি জানান, ডিজিটাল আসক্তিতে আক্রান্ত অনেক শিশুর মধ্যে ঘুমের সমস্যা, ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতায় অনীহা, শারীরিক নিষ্ক্রিয়তা এবং চোখের বিভিন্ন জটিলতা দেখা যাচ্ছে। একই সঙ্গে পারিবারিক সম্পর্কেও দূরত্ব তৈরি হচ্ছে।
বেসরকারি গবেষণা প্রতিষ্ঠান সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ড. ফাহমিদা খাতুন বলেন, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের ইতিবাচক দিক থাকলেও যথাযথ নিয়ন্ত্রণের অভাবে তা শিশু-কিশোরদের মানসিক বিকাশ ও সৃজনশীলতার জন্য ঝুঁকির কারণ হয়ে উঠছে। তিনি শিশুদের জন্য সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারে নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে সীমাবদ্ধতা আরোপের প্রয়োজনীয়তার কথা বলেন।
গবেষণাগুলোও উদ্বেগজনক চিত্র তুলে ধরছে। ‘নেচার অ্যান্ড সায়েন্স অব স্লিপ’ জার্নালে প্রকাশিত এক গবেষণায় দেখা গেছে, সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারের সময় যত বাড়ছে, শিক্ষার্থীদের ঘুমের মান তত খারাপ হচ্ছে। যারা দিনে চার থেকে পাঁচ ঘণ্টার বেশি সামাজিক মাধ্যম ব্যবহার করে, তাদের মধ্যে মনোযোগের ঘাটতি, বিরক্তি ও মানসিক অস্থিরতা বেশি দেখা যায়।
অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক উদরাময় গবেষণা কেন্দ্র বাংলাদেশ (আইসিডিডিআরবি)-এর এক গবেষণায় দেখা গেছে, ঢাকার শিশুরা প্রতিদিন গড়ে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা ডিজিটাল ডিভাইস ব্যবহার করছে। এতে চোখের সমস্যা, মাথাব্যথা, ঘুমের ঘাটতি এবং স্থূলতার ঝুঁকি বাড়ছে।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশ ইতিমধ্যে শিশুদের সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারে কড়াকড়ি আরোপ করেছে। অস্ট্রেলিয়া ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। যুক্তরাজ্যও বয়স যাচাই ব্যবস্থার মাধ্যমে একই ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়নের পরিকল্পনা করছে। ফ্রান্স, নরওয়ে, স্পেন, ডেনমার্ক, গ্রিস, পোল্যান্ড ও স্লোভেনিয়াসহ আরও কয়েকটি দেশ শিশুদের অনলাইন সুরক্ষায় নতুন আইন ও নীতিমালা প্রণয়ন করছে।
চীন শিশুদের জন্য নির্দিষ্ট স্ক্রিন টাইম নির্ধারণ করেছে। দেশটিতে নির্দিষ্ট বয়সের নিচে শিশুদের রাতের নির্দিষ্ট সময়ের পর অনলাইন গেমিং ও সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারেও সীমাবদ্ধতা রয়েছে।
বাংলাদেশে বর্তমানে শিশুদের সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারে কোনো বয়সভিত্তিক আইনি নিষেধাজ্ঞা নেই। শিশু আইন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন কিংবা সাম্প্রতিক সাইবার নিরাপত্তা অধ্যাদেশেও এ বিষয়ে সুনির্দিষ্ট বিধান নেই। তবে ইউনিসেফের এক জরিপে দেখা গেছে, দেশের উল্লেখযোগ্য সংখ্যক তরুণ সাইবার বুলিংয়ের শিকার হয়েছে এবং অধিকাংশই অনলাইন নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কঠোর নীতিমালার পক্ষে মত দিয়েছে।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, সাম্প্রতিক বছরগুলোতে কিশোর গ্যাংয়ের সদস্যদের মধ্যে সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারের প্রবণতা ব্যাপক ছিল। অনেক ক্ষেত্রে অনলাইন প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে তারা নিজেদের মধ্যে যোগাযোগ রক্ষা করত।
বিশেষজ্ঞরা বলছেন, কেবল আইন করলেই সমস্যার সমাধান হবে না। এর পাশাপাশি অভিভাবকদের সচেতনতা বৃদ্ধি, শিশুদের খেলাধুলা ও সৃজনশীল কর্মকাণ্ডে সম্পৃক্ত করা, স্কুল পর্যায়ে ডিজিটাল নিরাপত্তা শিক্ষা চালু করা এবং সামাজিক মাধ্যম কোম্পানিগুলোর জন্য কার্যকর বয়স যাচাই ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করা প্রয়োজন।
তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি (আইসিটি) বিভাগের ভারপ্রাপ্ত সচিব মো. মামুনুর রশীদ ভূঞা জানিয়েছেন, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ১৬ বছরের কম বয়সীদের জন্য সামাজিক মাধ্যম ব্যবহারে যে ধরনের বিধিনিষেধ আরোপ করা হচ্ছে, বাংলাদেশেও সে ধরনের বিষয় নীতিনির্ধারণী পর্যায়ে আলোচনায় রয়েছে। বৈশ্বিক অভিজ্ঞতা পর্যালোচনা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে বলে তিনি জানান।
১৩৪ বার পড়া হয়েছে