সর্বশেষ

ফিচার

মধুমাসের মাধুর্যে বাংলার গ্রীষ্ম

গুলশান চৌধুরী
গুলশান চৌধুরী

শুক্রবার, ১২ জুন, ২০২৬ ২:২২ পূর্বাহ্ন

শেয়ার করুন:
ঋতুবৈচিত্র্যের অপার সৌন্দর্যে ভরা আমাদের বাংলাদেশ। ঋতুর পালাবদলে বাংলার প্রকৃতি বদলে নেয় আপন রূপ, ধারণ করে নতুন নতুন রঙের সমারোহ।

ছয় ঋতুর এই দেশে প্রতিটি ঋতুরই রয়েছে নিজস্ব বৈশিষ্ট্য, নিজস্ব আবেদন। আর সেই ঋতুচক্রের প্রথম ঋতু হলো গ্রীষ্মকাল।

পহেলা বৈশাখের নববর্ষের আনন্দ আর কালবৈশাখীর দুরন্ত ঝঞ্ঝা নিয়ে শুরু হয় গ্রীষ্মের যাত্রা। তীব্র রোদ, খরতাপ আর দাবদাহের মাঝেও প্রকৃতি যেন তার অফুরন্ত দান নিয়ে হাজির হয় মানুষের দুয়ারে। তাই গ্রীষ্মকালকে বলা হয় ফলের ঋতু, মধুমাস।

গ্রীষ্মের শুরুতেই বাজারে দেখা মেলে তরমুজ, বাঙ্গি, আতা ও আনারসের। এরপর একে একে গাছের ডালে ডালে শোভা পায় আম, জাম, লিচু ও কাঁঠাল। বাংলার আনাচে-কানাচে পাওয়া যায় জামরুল, তেঁতুল, গাব, বেতফলসহ নানা দেশীয় ফল। প্রকৃতির এই অফুরন্ত ফলভাণ্ডারের কারণেই গ্রীষ্মকে বলা হয় মধুমাস।

আম, জাম, কাঁঠাল, লিচু, আনারস কিংবা আতা—প্রতিটি ফলই শুধু সুস্বাদু নয়, পুষ্টিগুণেও ভরপুর। এসব ফলে রয়েছে প্রচুর ভিটামিন, খনিজ ও অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, যা শরীরের রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা বৃদ্ধি করে এবং সুস্থতা বজায় রাখতে সহায়তা করে। তাই প্রত্যেক মানুষের খাদ্যাভ্যাসে মৌসুমি ফলের উপস্থিতি থাকা অত্যন্ত জরুরি।

গ্রীষ্মের দাবদাহে যখন জনজীবন হয়ে ওঠে বিপর্যস্ত, যখন তৃষ্ণায় বুক ফেটে যায় আর চারপাশে নেমে আসে রুক্ষতার ছাপ, তখনও প্রকৃতির উদারতা চোখে পড়ে ফলের প্রাচুর্যে। বাংলার মাঠে-ঘাটে, বাগানে-বাগানে আর গ্রামের পথের ধারে দেখা যায় ফলের সমারোহ।

প্রচণ্ড গরমে তৃষ্ণা মেটাতে মানুষ খায় তরমুজ, বাঙ্গি ও তালের শাঁস। এসব ফল শরীরের পানির ঘাটতি পূরণের পাশাপাশি এনে দেয় প্রশান্তি ও তৃপ্তি। কিছুদিনের মধ্যেই চারপাশ ভরে ওঠে আম, লিচু ও কাঁঠালের মাদকতাময় সুগন্ধে। গাছের ডালে ডালে ঝুলতে থাকে কাঁচা-পাকা ফলের বাহার।

ফলবাগানগুলো তখন মুখর হয়ে ওঠে মানুষের পদচারণায়। শুধু মানুষই নয়, নানা পাখি ও প্রাণীও এই ফলের উৎসবে অংশ নেয়। প্রকৃতির সকল প্রাণ যেন একসঙ্গে উপভোগ করে মধুমাসের আনন্দ।

মধুমাস এলে আমবাগান, লিচুবাগান ও কাঁঠালবাগানে বাড়ে ব্যবসায়ীদের আনাগোনা। ফলের ব্যবসা হয়ে ওঠে গ্রামের অর্থনীতির একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ। রাস্তার ফুটপাত থেকে শুরু করে বড় বড় বিপণিবিতান পর্যন্ত সাজিয়ে রাখা হয় নানান রকম ফল। ফলের রসে আর মিষ্টি স্বাদে ভরে ওঠে মানুষের মন।

ফুটপাতের দোকানগুলোতে ফলের পসরা সাজিয়ে বসেন ক্ষুদ্র ব্যবসায়ীরা। ভ্যানগাড়িতে করে পাড়া-মহল্লায় ঘুরে ঘুরে তারা বিক্রি করেন আম, জাম, লিচু ও তালের শাঁস। স্বল্প আয়ের মানুষদের জন্যও এটি হয়ে ওঠে জীবিকার একটি গুরুত্বপূর্ণ মাধ্যম। ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবাই সাধ্যমতো ফল কিনে উপভোগ করে মধুমাসের স্বাদ।

একসময় মধুমাস ছিল এক অনন্য সামাজিক উৎসবের নাম। ফল হয়ে উঠত আত্মীয়তার বন্ধনের অন্যতম মাধ্যম। আত্মীয়-স্বজনরা ফল নিয়ে একে অপরের বাড়িতে যেতেন। দূরদূরান্ত থেকে মেয়েরা বাবার বাড়িতে নাইওর আসত ফলের মৌসুমে। শহর, গ্রাম, পাড়া-মহল্লা—সবখানেই বইত আনন্দের হাওয়া। ঘরে ঘরে রান্না হতো সুস্বাদু খাবার, পিঠা-পায়েশের পাশাপাশি চলত ফল খাওয়ার ধুম।

আমাদের পরিচিত ফলগুলোর মধ্যে খেজুরও একটি গুরুত্বপূর্ণ ফল। গ্রীষ্মের শেষ দিকে দেশীয় খেজুর পাওয়া যায়। পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্য থেকেও আসে নানা জাতের উন্নতমানের খেজুর। ইসলামি ঐতিহ্যে খেজুরের বিশেষ মর্যাদা রয়েছে। এছাড়া ডুমুর, আঙুর ও আনারও ইতিহাস ও সংস্কৃতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িত ফল।

তবে ফল কেবল মৌসুমভিত্তিক খাবার নয়। সুস্থ জীবনের জন্য সারা বছরই ফল খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তোলা প্রয়োজন। সমাজের সুবিধাবঞ্চিত মানুষদের মাঝেও ফল বিতরণের উদ্যোগ নেওয়া উচিত, যাতে তারাও পুষ্টিকর খাদ্যের সুবিধা পেতে পারে।

ফলের চাহিদা পূরণে আমাদের আরও বেশি করে ফলদ বৃক্ষ রোপণ করতে হবে। এতে যেমন মানুষের পুষ্টি নিশ্চিত হবে, তেমনি সবুজে-শ্যামলে ভরে উঠবে আমাদের প্রিয় বাংলাদেশ। প্রকৃতি সেজে উঠবে আরও অপরূপ রূপে, আর মধুমাস ছড়িয়ে দেবে তার মধুরতা প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে।

লেখক: কবি।

১২৬ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন
এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন














সর্বশেষ সব খবর
ফিচার নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

২৫০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন