সর্বশেষ

মতামত

সন্তান মানুষ করছি, নাকি মানুষ গড়ছি?

গুলশান চৌধুরী
গুলশান চৌধুরী

বৃহস্পতিবার , ৪ জুন, ২০২৬ ১০:৪৭ পূর্বাহ্ন

শেয়ার করুন:
সম্প্রতি দেশে ঘটে যাওয়া একটি হৃদয়বিদারক ঘটনা আমাদের সবাইকে গভীরভাবে নাড়া দিয়েছে। ঘটনাটি শুধু একটি পরিবারের ট্র্যাজেডি নয়, বরং আমাদের সামাজিক ও পারিবারিক মূল্যবোধের সংকটকেও সামনে নিয়ে এসেছে।

বিশেষ করে বাবা-মায়ের প্রতি সন্তানের অবহেলা ও অমানবিক আচরণের যে চিত্র সেখানে ফুটে উঠেছে, তা সত্যিই বেদনাদায়ক।

প্রশ্ন জাগে—কেন এমন হচ্ছে? কেন একজন সন্তান, যাকে বাবা-মা সীমাহীন ত্যাগ, ভালোবাসা ও পরিশ্রমের মাধ্যমে বড় করে তোলেন, একসময় নিজের জীবন নিয়ে এতটাই ব্যস্ত হয়ে পড়ে যে সেই বাবা-মায়ের দিকেই আর ফিরে তাকায় না? কেন দিন দিন বৃদ্ধাশ্রমের সংখ্যা বাড়ছে? এর জন্য কি শুধু সন্তানই দায়ী, নাকি বাবা-মায়েরও কিছু দায় রয়েছে?

সত্য হলো, বাবা-মায়ের যেমন সন্তানের প্রতি দায়িত্ব ও কর্তব্য রয়েছে, তেমনি সন্তানেরও বাবা-মায়ের প্রতি কিছু অবিচ্ছেদ্য দায়িত্ব রয়েছে। আর সেই দায়িত্ববোধের বীজ রোপণ করার কাজটিও শুরু করতে হয় বাবা-মাকেই।

অনেকেই মনে করেন, সন্তানের ভালো ভবিষ্যৎ মানেই তাকে সারাদিন পড়ার টেবিলে বসিয়ে রাখা, অন্যদের সঙ্গে মিশতে না দেওয়া, ভালো ফলাফল অর্জন করানো কিংবা ক্লাসে প্রথম হওয়া। কিন্তু প্রকৃত অর্থে একজন “ভালো মানুষ” গড়ে তোলা কি শুধু এতটুকুতেই সীমাবদ্ধ?

না, মোটেও নয়।

একজন সত্যিকারের ভালো মানুষ হতে হলে সন্তানের মধ্যে মানবিকতা, সহমর্মিতা, দায়িত্ববোধ, সামাজিকতা এবং অন্যের প্রতি শ্রদ্ধাবোধ গড়ে তুলতে হয়। তাকে শেখাতে হয় ভাগাভাগি করে নেওয়ার আনন্দ, অন্যের কষ্ট উপলব্ধি করার ক্ষমতা এবং মানুষের পাশে দাঁড়ানোর মানসিকতা।

যে সন্তান কখনো সমাজের সঙ্গে মিশতে শেখেনি, আত্মীয়-স্বজনের খোঁজখবর নিতে শেখেনি, প্রতিবেশীর সুখ-দুঃখ ভাগাভাগি করতে শেখেনি, সে কীভাবে বুঝবে পরিবারের প্রতি তার দায়িত্ব কী? সে কীভাবে উপলব্ধি করবে বাবা-মায়ের ত্যাগ ও ভালোবাসার মূল্য?

একজন মানুষের জীবনে শুধু বাবা-মা নন, আত্মীয়-স্বজন, প্রতিবেশী, সমাজ ও সংস্কৃতিও গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। কিন্তু অনেক সময় আমরা সন্তানের ক্যারিয়ার গড়ার চিন্তায় এতটাই ব্যস্ত হয়ে পড়ি যে তাকে মানবিক মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার বিষয়টি ভুলে যাই।

অনেক বাবা-মা সন্তানকে ছোটবেলা থেকেই চার দেয়ালের মধ্যে বন্দি করে রাখেন। তাদের ধারণা, বাইরের জগত থেকে দূরে রাখলেই সন্তান সফল হবে। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন কথা বলে। যে শিশু সমাজের সঙ্গে পরিচিত হয় না, মানুষের সঙ্গে মিশতে শেখে না, সে বড় হয়ে প্রায়ই আত্মকেন্দ্রিক হয়ে ওঠে। নিজের প্রয়োজন ও স্বার্থের বাইরে অন্য কারও অনুভূতি বা অধিকার তার কাছে গুরুত্ব পায় না।

যে সন্তান ভাই-বোনের সঙ্গে দায়িত্ব ভাগাভাগি করতে শেখেনি, আত্মীয়দের সম্মান করতে শেখেনি, সমাজের প্রতি কর্তব্য বুঝতে শেখেনি—সে একদিন বাবা-মায়ের প্রতিও নিজের কর্তব্য ভুলে যেতে পারে।

আরেকটি বিষয় অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদি বাবা-মা সন্তানকে শুধু পেতেই শেখান, দিতে না শেখান, তবে সেই সন্তান ধীরে ধীরে স্বার্থপর হয়ে ওঠে। সে মনে করতে শুরু করে, সবকিছু পাওয়াই তার অধিকার। কিন্তু জীবন কেবল পাওয়ার নয়, দেওয়ারও। ভালোবাসা, সম্মান, সহানুভূতি এবং দায়িত্ব—এসবও দিতে জানতে হয়।

সন্তান শুধু বিদ্যালয়ে নয়, পরিবারে, সমাজে এবং প্রকৃতির সান্নিধ্যে মানুষ হয়ে ওঠে। প্রকৃত শিক্ষা বইয়ের পাতার বাইরে বিস্তৃত। মানুষের সঙ্গে মিশে, অভাব-অনটন দেখে, অন্যের কষ্ট অনুভব করে এবং বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে একজন মানুষ প্রকৃত মানবিকতা অর্জন করে।

এ প্রসঙ্গে মহানবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর জীবনের কথা স্মরণ করা যায়। তিনি সম্ভ্রান্ত বংশে জন্মগ্রহণ করলেও শৈশবের একটি গুরুত্বপূর্ণ সময় কাটিয়েছেন দুধমাতা হালিমা (রা.)-এর সাধারণ ও অভাবী পরিবারে। মরুর কঠিন পরিবেশে বেড়ে ওঠা, পশুচারণ করা এবং প্রকৃতির সঙ্গে নিবিড় সম্পর্ক তাঁকে জীবনের গভীর শিক্ষা দিয়েছিল। মহান আল্লাহ তাঁকে মানবতার শ্রেষ্ঠ আদর্শ হিসেবে গড়ে তুলেছিলেন বাস্তব জীবনের অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়েই।

আজ আমাদেরও সেই শিক্ষা গ্রহণ করতে হবে।

আমরা যদি চাই আমাদের সন্তানরা ভবিষ্যতে আমাদের সম্মান করুক, আমাদের পাশে দাঁড়াক, সমাজের জন্য কল্যাণকর মানুষ হয়ে উঠুক, তাহলে শুধু তাদের শিক্ষিত করলেই হবে না; মানবিকও করে তুলতে হবে। তাদের হৃদয়ে ভালোবাসা, মমতা, দায়িত্ববোধ ও সামাজিক মূল্যবোধের বীজ বপন করতে হবে।

কারণ একজন সফল মানুষ সমাজকে গর্বিত করতে পারে, কিন্তু একজন মানবিক মানুষ সমাজকে আলোকিত করে।

লেখক: কবি।

২৭৮ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন
এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন














সর্বশেষ সব খবর
মতামত নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

২৫০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন