তাপদাহে বাংলাদেশের ক্ষতি ১৮০ কোটি ডলার, ঝুঁকিতে ঢাকা ও শিল্পখাত
শুক্রবার, ৩১ জুলাই, ২০২৬ ৪:৩৭ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
তীব্র গরম ও তাপপ্রবাহের কারণে ২০২৪ সালে বাংলাদেশে সরাসরি ১৩০ থেকে ১৮০ কোটি মার্কিন ডলারের অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে। এই ক্ষতি দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) প্রায় ০.৩ থেকে ০.৪ শতাংশের সমান। বিশ্বব্যাংক ও সহযোগী সংস্থাগুলোর এক প্রতিবেদনে সতর্ক করা হয়েছে, তাপমাত্রা ৩৭ ডিগ্রি সেলসিয়াস ছাড়িয়ে গেলে ক্ষতির পরিমাণ দ্রুত বাড়তে থাকে।
তীব্র তাপদাহের কারণে বাংলাদেশের অর্থনীতি, শ্রমবাজার, শিল্প উৎপাদন ও অবকাঠামো বড় ধরনের ঝুঁকির মুখে পড়ছে। বিশ্বব্যাংক, যুক্তরাজ্যের আন্তর্জাতিক উন্নয়ন সংস্থা (এফসিডিও), সিটি রেজিলিয়েন্স প্রোগ্রাম এবং গ্লোবাল ফ্যাসিলিটি ফর ডিজাস্টার রিডাকশন অ্যান্ড রিকভারি (জিএফডিআরআর) যৌথভাবে প্রকাশিত ‘এ লাইভেবল ফিউচার: প্রোটেক্টিং জবস অ্যান্ড গ্রোথ ফ্রম এক্সট্রিম হিট ইন সাউথ এশিয়াস সিটিজ’ শীর্ষক প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দক্ষিণ এশিয়ার বড় শহরগুলোর মধ্যে তাপদাহজনিত কর্মঘণ্টা ক্ষতির দিক থেকে সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিতে রয়েছে ঢাকা। বর্তমানে অতিরিক্ত তাপমাত্রার কারণে রাজধানীতে বছরে মোট কর্মঘণ্টার প্রায় ৩ শতাংশ নষ্ট হচ্ছে, যা প্রায় ৪ লাখ ৬৫ হাজার পূর্ণকালীন চাকরির সমপরিমাণ।
বিশেষজ্ঞদের আশঙ্কা, পরিস্থিতির উন্নতি না হলে ২০৫০ সালে ঢাকায় এই ক্ষতি বেড়ে প্রায় ৭ লাখ ৮ হাজার পূর্ণকালীন চাকরির সমান হতে পারে। আর ২০৮০ সালে কর্মঘণ্টা অপচয়ের হার ৭ দশমিক ৪ শতাংশে পৌঁছাতে পারে, যা প্রায় ১৬ লাখ ৫০ হাজার পূর্ণকালীন চাকরির সমপরিমাণ। একই সময়ে কলকাতায় এই ক্ষতি হবে প্রায় ৮ লাখ ৩৩ হাজার এবং নয়াদিল্লিতে প্রায় ৬ লাখ ২৯ হাজার চাকরির সমান।
বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান খাত তৈরি পোশাকশিল্পও তাপদাহের কারণে বড় ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে পারে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দ্রুত কার্যকর অভিযোজন ব্যবস্থা নেওয়া না হলে ২০৩০ সালের মধ্যে বাংলাদেশসহ দক্ষিণ এশিয়ার তৈরি পোশাক খাত প্রায় ৬৫ দশমিক ৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলারের রপ্তানি আয় হারানোর ঝুঁকিতে রয়েছে।
তবে পরিবেশবান্ধব শিল্পায়নের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ কিছু অগ্রগতি করেছে। সরকারের গ্রিন ট্রান্সফরমেশন ফান্ডের আওতায় ২০১৬ সাল থেকে সবুজ কারখানা তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এর ফলে দেশের ২৭০টির বেশি কারখানা আন্তর্জাতিক মানের লিড (LEED) সনদ অর্জন করেছে।
তাপদাহের প্রভাব পড়ছে বিদ্যুৎ সরবরাহ ও অবকাঠামোতেও। অতিরিক্ত গরমে বিদ্যুতের চাহিদা বেড়ে যাওয়ায় সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর চাপ তৈরি হচ্ছে। ২০২৬ সালের এপ্রিলের তাপপ্রবাহের সময় দেশে সর্বোচ্চ বিদ্যুৎ চাহিদা ছিল ১৬ হাজার ২৩৭ মেগাওয়াট, বিপরীতে গড় উৎপাদন ছিল ১৩ হাজার ৯৮৮ মেগাওয়াট। ফলে প্রায় ২ হাজার ২০০ মেগাওয়াট ঘাটতির কারণে লোডশেডিং করতে হয়েছে, যার প্রভাব পড়ে শিল্প ও ব্যবসা কার্যক্রমে।
এ ছাড়া ২০২৪ সালের প্রচণ্ড গরমে দেশের কয়েকটি মহাসড়কের বিটুমিন গলে যাওয়ার ঘটনাও ঘটে। এতে সড়ক সংস্কারে অতিরিক্ত সরকারি ব্যয়ের প্রয়োজন হয়।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, আগাম সতর্কতা ও পরিকল্পিত ব্যবস্থাপনায় বিনিয়োগ করলে তাপদাহের ক্ষতি অনেকাংশে কমানো সম্ভব। ভারতের আহমেদাবাদের হিট অ্যাকশন প্ল্যানের উদাহরণ দিয়ে প্রতিবেদনে বলা হয়, সেখানে প্রতি ১ ডলার বিনিয়োগে প্রায় ৫০ ডলার সমমূল্যের আর্থিক ও সামাজিক সুরক্ষা পাওয়া গেছে।
বাংলাদেশেও তাপপ্রবাহ মোকাবিলায় আগাম ব্যবস্থা নেওয়া শুরু হয়েছে। ২০২৪ সালের এপ্রিলে বাংলাদেশ রেড ক্রিসেন্ট সোসাইটি প্রথমবারের মতো পূর্বাভাসভিত্তিক তাপপ্রবাহ সহায়তা কর্মসূচি চালু করে। এ কর্মসূচির আওতায় ঝুঁকিপূর্ণ প্রায় ৪ হাজার পরিবারকে মোবাইল ব্যাংকিংয়ের মাধ্যমে পরিবারপ্রতি ৫ হাজার টাকা সহায়তা দেওয়া হয়।
অন্যদিকে, তীব্র গরমের কারণে দেশে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ যন্ত্রের ব্যবহার বেড়েছে। ২০২৫ সালে দেশে প্রায় ৫ লাখ ৫০ হাজার এসি বিক্রি হয়েছে, যা গত পাঁচ বছরের তুলনায় প্রায় তিন গুণ বেশি। যদিও এসি ব্যবহারে বিদ্যুতের চাহিদা বাড়ছে, তবে এটি মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি ও কর্মক্ষমতা ধরে রাখতে সাময়িক সহায়তা করছে।
বিশ্বব্যাংক জানিয়েছে, বাংলাদেশকে এখনই তাপসহনশীল অবকাঠামো, উন্নত পূর্বাভাস ব্যবস্থা এবং অভিযোজনমূলক পদক্ষেপে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। প্রতিবেদনে তাপদাহের সময় শিল্পকারখানায় নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ, জাতীয় দুর্যোগ ঝুঁকি তহবিলে তাপদাহ অন্তর্ভুক্ত করা এবং ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্পের জন্য সহজ শর্তে পরিবেশবান্ধব অর্থায়নের ব্যবস্থা করার মতো ১৫টি সুপারিশ দেওয়া হয়েছে।
১০৯ বার পড়া হয়েছে