সর্বশেষ

জাতীয়

জুলাইয়ের পরিবর্তনের প্রত্যাশা, দুর্নীতির পুরোনো চক্রেই আটকে প্রশাসন

বিশেষ প্রতিনিধি
বিশেষ প্রতিনিধি

শনিবার, ১ আগস্ট, ২০২৬ ১:১৫ পূর্বাহ্ন

শেয়ার করুন:
জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর রাষ্ট্র পরিচালনায় স্বচ্ছতা, জবাবদিহি ও দুর্নীতিমুক্ত প্রশাসনের যে প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা এখন বড় প্রশ্নের মুখে। সরকার পরিবর্তনের পরও সরকারি সেবা নিতে গিয়ে ঘুষ, হয়রানি ও প্রশাসনিক অনিয়মের অভিযোগ কমেনি। বিভিন্ন জরিপে উঠে এসেছে, রাষ্ট্রের পুরোনো দুর্নীতির কাঠামো এখনো অনেকাংশে বহাল রয়েছে।

জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানের পর দেশের মানুষের প্রত্যাশা ছিল রাষ্ট্রের গুরুত্বপূর্ণ প্রতিষ্ঠানগুলোতে বড় ধরনের সংস্কার আসবে। প্রশাসনে স্বচ্ছতা বাড়বে, কমবে দুর্নীতি ও অনিয়ম, আর নাগরিক সেবা হবে আরও সহজ ও জবাবদিহিমূলক। তবে পরিবর্তনের এক বছরের বেশি সময় পরও সেই প্রত্যাশা পুরোপুরি বাস্তব রূপ পায়নি বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।

২০২৪ সালের আগস্টে দায়িত্ব নেওয়া অন্তর্বর্তী সরকারের সামনে অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ ছিল দীর্ঘদিনের দুর্নীতি, দুর্বল প্রতিষ্ঠান ও প্রশাসনিক অনাস্থার জায়গা থেকে রাষ্ট্রব্যবস্থাকে নতুন পথে এগিয়ে নেওয়া। কিন্তু বাস্তবতা বলছে, রাজনৈতিক পরিবর্তনের সঙ্গে সঙ্গে প্রশাসনিক সংস্কৃতিতে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন দৃশ্যমান হয়নি।

ট্রান্সপারেন্সি ইন্টারন্যাশনাল বাংলাদেশ (টিআইবি)-এর ‘ন্যাশনাল হাউসহোল্ড সার্ভে ২০২৫’ প্রতিবেদনে সরকারি সেবায় দুর্নীতির বিস্তারের একটি চিত্র উঠে এসেছে। প্রতিবেদনে বলা হয়, ২০২৪ সালের নভেম্বর থেকে ২০২৫ সালের অক্টোবর পর্যন্ত সরকারি সেবা নিতে গিয়ে নাগরিকদের প্রায় ১২ হাজার ৬৩৩ কোটি ২০ লাখ টাকা ঘুষ দিতে হয়েছে। আগের জরিপের তুলনায় এ পরিমাণ বেড়েছে ১৫ দশমিক ৯ শতাংশ।

টিআইবির জরিপ অনুযায়ী, অন্তত একটি সরকারি সেবা গ্রহণ করতে গিয়ে দুর্নীতির অভিজ্ঞতা হয়েছে ৮১ দশমিক ৬ শতাংশ পরিবারের। ২০২৩ সালে এ হার ছিল ৭০ দশমিক ৯ শতাংশ। একই সময়ে সেবা পাওয়ার জন্য ঘুষ দিতে হয়েছে ৬৩ দশমিক ৬ শতাংশ পরিবারকে, যেখানে আগের জরিপে এই হার ছিল ৫০ দশমিক ৮ শতাংশ।

দুর্নীতির শিকার হলেও বড় একটি অংশ অভিযোগ করতে আগ্রহী হয়নি। জরিপে দেখা যায়, ৬১ দশমিক ৩ শতাংশ মানুষ অভিযোগ করার প্রয়োজন মনে করেননি। তাদের আশঙ্কা ছিল, অভিযোগ করেও কাঙ্ক্ষিত প্রতিকার পাওয়া কঠিন হবে।

টিআইবির তথ্য অনুযায়ী, পাসপোর্ট, বিচার বিভাগীয় সেবা, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং ভূমি প্রশাসন খাতে দুর্নীতির অভিযোগ তুলনামূলক বেশি।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, অনেক ক্ষেত্রে ঘুষ এখন একটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিয়েছে। নাগরিকদের একটি বড় অংশ মনে করেন, সরকারি সেবা পেতে ঘুষ দেওয়া ছাড়া বিকল্প নেই। এর সবচেয়ে বেশি প্রভাব পড়ছে নিম্ন আয়ের মানুষ, নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর ওপর।

বিশ্লেষকদের মতে, রাজনৈতিক পরিবর্তনের পরও প্রশাসনিক কাঠামোর ভেতরে বড় ধরনের সংস্কার না হওয়ায় পুরোনো অনিয়মের প্রবণতা টিকে গেছে। সরকার পরিবর্তন হলেও রাষ্ট্র পরিচালনার মূল কাঠামো পরিবর্তন করা কঠিন—এটাই বড় বাস্তবতা।

বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকারমন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরও প্রশাসনিক ব্যবস্থায় কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন না আসার বিষয়ে মন্তব্য করেছেন। সরকারি দায়িত্ব পালনের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, যারা আগে অনিয়মের সঙ্গে যুক্ত ছিল, তারা এখনো বিভিন্নভাবে সেই সুযোগ খুঁজছে।

তার এই বক্তব্যের পর নতুন করে আলোচনা শুরু হয়েছে—শুধু ক্ষমতার পরিবর্তন কি রাষ্ট্রের অভ্যন্তরীণ সংস্কৃতি বদলাতে পারে, নাকি প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি প্রাতিষ্ঠানিক সংস্কার।

জুলাই আন্দোলনের নেতৃত্ব থেকে উঠে আসা ছাত্র প্রতিনিধিদের ঘিরেও মানুষের প্রত্যাশা ছিল বেশি। তারা প্রচলিত রাজনীতির বাইরে থেকে নতুন ধরনের জবাবদিহিমূলক রাষ্ট্রব্যবস্থার কথা বলেছিলেন। তবে দায়িত্ব নেওয়ার পর তাদের কর্মকাণ্ড নিয়েও নানা বিতর্ক তৈরি হয়।

টিআইবির নির্বাহী পরিচালক ড. ইফতেখারুজ্জামান বলেন, ছাত্র উপদেষ্টারা জনগণের প্রত্যাশা অনুযায়ী ভূমিকা রাখতে পারেননি। তাদের দায়িত্বে থাকা বিভিন্ন মন্ত্রণালয়কে ঘিরে স্বজনপ্রীতি, সিদ্ধান্ত গ্রহণের স্বচ্ছতা ও স্বার্থের সংঘাত নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

সাবেক উপদেষ্টা আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়াকে ঘিরে বিভিন্ন সময়ে প্রকল্প বরাদ্দ, নিয়োগ ও প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত নিয়ে অভিযোগ ওঠে। তবে তিনি এসব অভিযোগের অনেকগুলোই অস্বীকার করেছেন এবং ব্যাখ্যা দিয়েছেন।

অন্যদিকে সাবেক তথ্য উপদেষ্টা মাহফুজ আলমের সময়ে গণমাধ্যম সংস্কার কমিশনের সুপারিশ বাস্তবায়নের গতি নিয়েও আলোচনা হয়। সাংবাদিক সুরক্ষা আইনসহ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ বাস্তবায়নে ধীরগতির সমালোচনা করেন সংশ্লিষ্টরা।

রাজনীতি বিশ্লেষক আলতাফ পারভেজের মতে, গণঅভ্যুত্থানের পর যে কাঠামোগত পরিবর্তনের প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। অনেক ক্ষেত্রে নতুন নেতৃত্ব পুরোনো প্রশাসনিক ব্যবস্থার মধ্যেই কাজ করতে বাধ্য হয়েছে।

তবে অন্তর্বর্তী সরকারের সমর্থকদের যুক্তি, তারা এমন একটি রাষ্ট্রব্যবস্থা পেয়েছিল যার দুর্নীতির শিকড় বহু বছরের পুরোনো। অল্প সময়ে পুরো প্রশাসনিক সংস্কৃতি বদলে ফেলা বাস্তবসম্মত ছিল না।

বিশেষজ্ঞদের মতে, এখন সবচেয়ে বড় প্রয়োজন হলো দুর্নীতির বিরুদ্ধে কার্যকর প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলা। সরকারি সেবার ডিজিটালাইজেশন, অভিযোগ ব্যবস্থার কার্যকারিতা বৃদ্ধি, সম্পদের হিসাব প্রকাশ, দুর্নীতিবিরোধী নীতির বাস্তব প্রয়োগ এবং আইনের যথাযথ প্রয়োগ নিশ্চিত করা জরুরি।

তাদের মতে, জুলাইয়ের আন্দোলনের মূল শিক্ষা হলো—রাজনৈতিক পরিবর্তন তুলনামূলক সহজ হলেও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন অনেক বেশি কঠিন। জনগণের প্রত্যাশাকে বাস্তব রূপ দিতে হলে শুধু সরকার পরিবর্তন নয়, রাষ্ট্রের ভেতরের কাঠামোগত সংস্কারও প্রয়োজন।

কারণ শেষ পর্যন্ত কোনো সরকারের মূল্যায়ন হবে শুধু তাদের ঘোষণায় নয়, বরং তারা পরিবর্তনের সুযোগকে কতটা কার্যকর সংস্কারে রূপ দিতে পেরেছে তার ওপর।

১৪২ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন
এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন














সর্বশেষ সব খবর
জাতীয় নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

২৫০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন