সর্বশেষ

মতামত

রামিসার নীরব কান্না: শিশু ধর্ষণ ও সামাজিক অবক্ষয়ের নির্মম বিশ্লেষণ

খাজা মাসুম বিল্লাহ কাওছারী
খাজা মাসুম বিল্লাহ কাওছারী

শনিবার, ২৩ মে, ২০২৬ ২:১৬ অপরাহ্ন

শেয়ার করুন:
চারপাশের নারীদের চোখে আজ ভয়, আতঙ্ক আর অনিশ্চয়তার ছাপ স্পষ্ট। একজন নারী কখন, কোথায়, কার হাতে সহিংসতার শিকার হবেন,এই শঙ্কা যেন প্রতিনিয়ত তাঁদের তাড়া করে ফিরছে। ঘরের ভেতর শিশুরা ধর্ষণের শিকার হচ্ছে, নিষ্ঠুর হত্যাকাণ্ডের ভিকটিম হচ্ছে।

কোথাও স্বামীর সঙ্গে বেড়াতে গিয়ে নারী ধর্ষিত হচ্ছেন, কোথাও নিজ বাড়িতেই লাঞ্ছনার শিকার হচ্ছেন। এমনকি চার বছরের নিষ্পাপ শিশুও ধর্ষকের বিকৃত লালসা থেকে রেহাই পাচ্ছে না। প্রতিদিন সংবাদমাধ্যম খুললেই শিশু ধর্ষণ, গণধর্ষণ কিংবা নারী নির্যাতনের খবর আমাদের বিবেককে নাড়া দেয়, মনকে ভারাক্রান্ত করে তোলে।

বাংলাদেশে শিশু ধর্ষণের ঘটনা আজ ভয়াবহ সামাজিক মহামারিতে রূপ নিয়েছে। বিভিন্ন মানবাধিকার সংস্থা ও সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী- ২০২৬ সালের প্রথম চার মাসেই অন্তত ১১৮ কন্যাশিশু ধর্ষণের শিকার হয়েছে। গত ১৬ মাসে প্রায় ৫৮০ শিশু ধর্ষণের ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে। শুধু একটি মাসেই নারী ও শিশু মিলিয়ে অন্তত ৫০টির বেশি ধর্ষণের ঘটনা আলোচনায় এসেছে। অথচ বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সামাজিক লজ্জা, বিচারহীনতা, প্রভাবশালীদের চাপ এবং পরিবারের নীরবতার কারণে অসংখ্য ঘটনা কখনোই প্রকাশ্যে আসে না। অর্থাৎ প্রকাশিত সংখ্যার চেয়েও বাস্তবতা আরও ভয়ংকর।

এই পরিসংখ্যানের ভিড়ে হারিয়ে যায় অনেক নাম, অনেক স্বপ্ন, অনেক নিষ্পাপ মুখ। তেমনি এক নাম—রামিসা।

রামিসা, তোমার ছোট্ট দু’টি চোখে হয়তো এখনো পৃথিবীকে বিশ্বাস করার সরলতা লেগে ছিল। তুমি বুঝতে পারোনি মানুষের মুখোশের আড়ালে কিছু হিংস্র নরপিশাচ ঘুরে বেড়ায়। তোমার হাসি ছিল নির্মল, তোমার স্বপ্ন ছিল রঙিন, তোমার বেঁচে থাকার অধিকার ছিল এই পৃথিবীর মতোই সত্য। কিন্তু একদল বিকৃত মানসিকতার মানুষ সেই স্বপ্ন নির্মমভাবে ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছে।

হয়তো সেদিন তোমার আর্তচিৎকার কোনো দেয়াল ভেদ করে বাইরে আসতে পারেনি। কিন্তু সেই নীরব কান্না আজও প্রতিধ্বনিত হয় বিবেকবান মানুষের হৃদয়ে। তোমার চোখ আজ পুরো সমাজকে প্রশ্ন করে—“আমি কি শুধু একটি সংখ্যা? একটি সংবাদশিরোনাম?”

একটি সমাজ তখনই ধ্বংসের দিকে এগিয়ে যায়, যখন সেখানে শিশুর কান্না উপহাসে পরিণত হয়, নারীর নিরাপত্তা ভেঙে পড়ে, আর অপরাধীরা ক্ষমতার ছায়ায় নিরাপদ থাকে। রামিসার ধর্ষণ ও হত্যা কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়। এটি আমাদের সামাজিক, নৈতিক ও মানবিক অবক্ষয়ের নগ্ন প্রতিচ্ছবি।

ধর্ষণকে অনেকেই কেবল যৌন অপরাধ হিসেবে দেখেন। কিন্তু গবেষণা ও সমাজতাত্ত্বিক বিশ্লেষণ বলছে, ধর্ষণ মূলত ক্ষমতা, নিয়ন্ত্রণ এবং আধিপত্যের বহিঃপ্রকাশ। নারীবাদী লেখক সুসান ব্রাউনমিলার বহু আগেই বলেছিলেন, “ধর্ষণের সঙ্গে যৌন আকাঙ্ক্ষার চেয়ে বেশি সম্পর্ক ক্ষমতা ও দমনের।” কারণ সব পুরুষের কামনা থাকে, কিন্তু সবাই ধর্ষক হয় না। ধর্ষক হয়ে ওঠে সেই ব্যক্তি যে নারীকে মানুষ নয়, ভোগের বস্তু হিসেবে দেখতে শেখে।

এই মানসিকতার পেছনে কাজ করে পিতৃতান্ত্রিক সমাজব্যবস্থা। আমাদের সমাজ ছেলেদের শেখায়—তুমি পুরুষ, তোমাকে আধিপত্য করতে হবে। মেয়েদের শেখানো হয়-তোমাকে সহ্য করতে হবে, নীরব থাকতে হবে। ছোটবেলা থেকেই ছেলেদের মধ্যে একধরনের কর্তৃত্ববোধ তৈরি করা হয়। “ছেলেরা কাঁদে না”, “পুরুষ মানে শক্তি”, “না শুনবে না”—এই ধরনের সামাজিক শিক্ষা ধীরে ধীরে কিছু মানুষের মধ্যে সহিংস মানসিকতা তৈরি করে।

ফলে নারীকে সম্মান করার বদলে তাকে নিয়ন্ত্রণ করার প্রবণতা জন্ম নেয়। একজন নারীর ‘না’কে অস্বীকার করার সংস্কৃতি তৈরি হয়। এভাবেই জন্ম নেয় সহিংস পুরুষতন্ত্র।

গবেষণা বলছে- অধিকাংশ ধর্ষণের ঘটনা ঘটে পরিচিত মানুষের দ্বারা। পরিবার, আত্মীয়স্বজন, প্রতিবেশী কিংবা কাছের মানুষের হাতেই নারী ও শিশুরা সবচেয়ে বেশি নির্যাতিত হয়। ফলে “রাতে বাইরে গেলে ধর্ষণ হয়” কিংবা “উত্তেজক পোশাক ধর্ষণের কারণ”—এসব বক্তব্য কেবল ভুক্তভোগীকেই দায়ী করার অপচেষ্টা।

বাস্তবতা হলো-পর্দানশীন নারীও ধর্ষণের শিকার হয়েছেন, শিশুদেরও ধর্ষণ করা হয়েছে। চার বছরের শিশুর পোশাকে কী ছিল? একটি শিশুর মধ্যে কী প্রলোভন থাকতে পারে? এই প্রশ্নই প্রমাণ করে সমস্যার মূল নারীর পোশাক নয় বরং বিকৃত মানসিকতা ও ক্ষমতার অপব্যবহার।

বাংলাদেশের বহু পরিবারে আজও নারী নির্যাতনকে “পারিবারিক বিষয়” বলে এড়িয়ে যাওয়া হয়। ধর্ষণের শিকার মেয়েটিকেই সমাজের চোখে “কলঙ্ক” হিসেবে দেখা হয়। ফলে পরিবার অনেক সময় বিচার চাওয়ার বদলে নীরবতাকে বেছে নেয়। এই নীরবতাই অপরাধীদের আরও সাহসী করে তোলে।

আমরা প্রযুক্তিতে উন্নতির গল্প বলছি, বহুতল অট্টালিকা নির্মাণ করছি, ডিজিটাল সভ্যতার জয়গান গাইছি। কিন্তু মানুষ গড়ার শিক্ষায় ভয়াবহভাবে ব্যর্থ হয়েছি। পরিবারে নৈতিক শিক্ষা কমে গেছে, সমাজে দায়িত্ববোধ ও লজ্জা হারিয়ে যাচ্ছে।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অশ্লীলতা, সহিংসতা ও বিকৃত বিনোদনের সহজ বিস্তার তরুণদের মননে প্রভাব ফেলছে। অনলাইন পর্নোগ্রাফি, নারীকে পণ্য হিসেবে উপস্থাপন, আগ্রাসী পুরুষতান্ত্রিক কনটেন্ট।এসব ধীরে ধীরে কিছু মানুষের অনুভূতি ও বিবেককে বিকৃত করে দিচ্ছে।

একই সঙ্গে ধর্মীয় ও মানবিক মূল্যবোধের চর্চাও কমে যাচ্ছে। ভোগবাদ, ক্ষমতার অহংকার ও আত্মকেন্দ্রিকতা মানুষের মনকে ক্রমশ নিষ্ঠুর করে তুলছে। ফলে কিছু মানুষ নারীকে সম্মানের চোখে নয়, কেবল ভোগের বস্তু হিসেবে দেখতে শিখছে।

যে সমাজে অপরাধের বিচার হয় না, সেখানে অপরাধ বাড়তেই থাকে। বাংলাদেশে ধর্ষণের বহু ঘটনায় দেখা যায়, প্রভাবশালী মহল অভিযুক্তদের রক্ষা করার চেষ্টা করে। কখনো মামলা নিতে গড়িমসি হয়, কখনো সাক্ষ্যপ্রমাণ নষ্ট হয়, কখনো ভুক্তভোগীকেই সামাজিকভাবে অপমানিত করা হয়।

ফলে অপরাধীরা বুঝে যায় যে ক্ষমতা থাকলে শাস্তি এড়ানো সম্ভব। এই বিচারহীনতার সংস্কৃতি ধর্ষণের মতো ভয়াবহ অপরাধকে আরও উসকে দেয়।

শুধু কঠোর আইন করলেই হবে না। আইনের কার্যকর প্রয়োগ নিশ্চিত করতে হবে। দ্রুত বিচার, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত না হলে সমাজে ভয় তৈরি হবে না। একই সঙ্গে ভুক্তভোগী ও তার পরিবারের নিরাপত্তা নিশ্চিত করাও জরুরি।

ধর্ষণের শিকার ব্যক্তির মানসিক ক্ষত দীর্ঘস্থায়ী হয়। অনেকেই পোস্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডারে ভোগেন। তারা আতঙ্কে থাকেন, মানুষের প্রতি বিশ্বাস হারিয়ে ফেলেন এবং স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হয়। অনেক শিশু সারাজীবনের জন্য মানসিক ট্রমা বহন করে বেড়ায়।

একটি ধর্ষণ কেবল একজন মানুষকে ধ্বংস করে না। একটি পরিবারকে ভেঙে দেয়, একটি সমাজকে অসুস্থ করে তোলে। প্রতিটি ধর্ষণ আসলে আমাদের সম্মিলিত মানবিকতার ওপর আঘাত।

নারীর প্রতি সহিংসতা বন্ধে পরিবারকে সবচেয়ে বড় ভূমিকা নিতে হবে। ছেলে শিশুদের ছোটবেলা থেকেই নারীকে সম্মান করতে শেখাতে হবে। ঘরের পুরুষ যদি নারীর সঙ্গে সহিংস ও অসম্মানজনক আচরণ করেন, তাহলে শিশুরাও সেটিই শিখবে।

আমাদের সন্তানদের শেখাতে হবে যে সম্মতি ছাড়া কোনো সম্পর্ক নয়। কাউকে অপমান করা শক্তির পরিচয় নয়। প্রকৃত পুরুষত্ব সহিংসতায় নয় মানবিকতা ও শ্রদ্ধাবোধে।

শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেও নৈতিক শিক্ষা, মানবাধিকার শিক্ষা এবং জেন্ডার সচেতনতা জরুরি। ধর্মীয় ও সামাজিক নেতাদেরও এ বিষয়ে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে হবে। কারণ শুধুমাত্র আইন দিয়ে সমাজ পরিবর্তন সম্ভব নয়। পরিবর্তন আনতে হবে মানুষের চিন্তায়।

সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রতিবাদ, রাস্তায় মানববন্ধন, পোস্টার, সচেতনতামূলক বক্তব্য সবকিছুরই মূল্য আছে। হয়তো একটি পোস্টেই পিতৃতন্ত্র ভেঙে পড়বে না কিন্তু নীরবতা কখনো পরিবর্তন আনে না।

অ্যাসিড সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে যেমন দীর্ঘ আন্দোলনের ফলে ইতিবাচক পরিবর্তন এসেছে। তেমনি নারী ও শিশু নির্যাতনের বিরুদ্ধেও ধারাবাহিক সামাজিক প্রতিরোধ গড়ে তুলতে হবে। রাষ্ট্রকে দায়িত্ব নিতে হবে, রাজনৈতিক সদিচ্ছা দেখাতে হবে, নারীবান্ধব নীতি কার্যকর করতে হবে।

সবচেয়ে বড় কথা, সমাজকে ধর্ষকের পাশে নয় বরং ভুক্তভোগীর পাশে দাঁড়াতে শিখতে হবে।

রামিসা আজ আর নেই। কিন্তু তার রক্তমাখা নীরবতা আমাদের সামনে কঠিন প্রশ্ন ছুঁড়ে দেয়। আমরা কেমন সমাজ গড়ে তুলছি? যেখানে একটি শিশুকন্যা নিরাপদ নয়, সেখানে সভ্যতার সব দাবি আসলে ভণ্ডামি।

রামিসা, আমরা তোমাকে বাঁচাতে পারিনি। তোমার স্বপ্ন রক্ষা করতে পারিনি। কিন্তু তোমার নাম যেন আরেকটি পরিসংখ্যান হয়ে না যায়—সেই প্রতিজ্ঞা অন্তত আমাদের করতে হবে।

প্রতিবাদ চলুক ঘরে, বাইরে, স্কুলে, বিশ্ববিদ্যালয়ে, কর্মক্ষেত্রে, রাজপথে। যেন একদিন এই সহিংসতা, বৈষম্য যেন নিরাপত্তা ও মানবিক মর্যাদার আলো ছড়িয়ে পড়ে সমাজের প্রতিটি স্তরে।

লেখকঃ সিনিয়র সাংবাদিক, বেসরকারি গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক।

১২৮ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন
এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন














সর্বশেষ সব খবর
মতামত নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন