অগ্নি-বীণার তারে বাঁশরীর সুর
নজরুলের জীবন-দর্শনে প্রেম ও দ্রোহের নান্দনিক সংশ্লেষ
মঙ্গলবার, ১২ মে, ২০২৬ ৭:৫৫ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
আজ ২০২৬ সালের মে। ঠিক এক শতাব্দী আগেও হয়তো আকাশটা এমন তপ্ত ছিল, যখন এক অস্থির যুবক তাঁর কলম দিয়ে বাংলা সাহিত্যের নিস্তরঙ্গ জলরাশিকে প্রবলভাবে আলোড়িত করেছিলেন। সেই যুবকটি আর কেউ নন—কাজী নজরুল ইসলাম।
আজও নজরুলের নামটা মনে পড়তেই বুকের মধ্যে এক অদ্ভুত ধুকপুকানি অনুভব করা যায়। কেন আজও তাঁর কথা উঠলে রক্তে শিহরণ জাগে? কেন তাঁর নাম নিলেই চোখের সামনে একই সঙ্গে রণতূর্য আর বাঁকা বাঁশের বাঁশরী ভেসে ওঠে?
নজরুল কোনো সুসংজ্ঞায়িত গণ্ডিতে আবদ্ধ থাকার কবি ছিলেন না। তিনি ছিলেন ঝড়ের রাতের সেই বাতাসের মতো, যা একই সঙ্গে জীর্ণকে উপড়ে ফেলে আবার ফুলের ঘ্রাণকে বহু দূরে পৌঁছে দেয়। তাঁর কাব্যের প্রধান সুরটি দাঁড়িয়ে আছে এক অদ্ভুত দ্বান্দ্বিকতার ওপর। তিনি একদিকে যেমন মহাকালের রুদ্র রূপ, অন্যদিকে তেমনি বসন্তের প্রথম মঞ্জরিত মাধবী। তাঁর নিজের উচ্চারিত সেই অবিনশ্বর সত্য— "মম এক হাতে বাঁকা বাঁশের বাঁশরী আর হাতে রণতূর্য"—এ কেবল কোনো কাব্যের পঙ্ক্তি নয়, এটি তাঁর সমগ্র সত্তার এক প্রগাঢ় স্বীকারোক্তি।
বিশ শতকের সেই উত্তাল সময়ে নজরুল যখন কলম ধরলেন, তখন ভারতমাতা পরাধীনতার শৃঙ্খলে আষ্টেপৃষ্ঠে জড়িয়ে আছেন। এক গভীর বিষাদ আর গ্লানি গ্রাস করেছিল শিক্ষিত সমাজকে। ঠিক সেই সময়ে নজরুলের 'অগ্নিবীণা' কেবল একটি বই হিসেবে আসেনি, এসেছিল এক জলন্ত আগ্নেয়গিরি হয়ে। তাঁর দ্রোহ কেবল ব্রিটিশ রাজের বিরুদ্ধে ছিল না, তা ছিল শত বছরের সঞ্চিত জড়তা, ভণ্ডামি আর অন্ধকারের বিরুদ্ধে। এই যে ভাঙার নেশা, একে কোনো তাত্ত্বিক কাঠামোর মাপকাঠিতে ধরা কঠিন। একে হয়তো আমরা 'উত্তর-ঔপনিবেশিক' প্রতিবাদ বলতে পারি, কিন্তু তাঁর ভেতরের সেই আগুন কি কেবল রাজনীতির? মোটেই না।
নজরুলের দ্রোহের মূল উৎস ছিল তাঁর অগাধ ভালোবাসা। যিনি মানুষকে ভালোবাসেন না, তিনি মানুষের অপমানে জ্বলে উঠতে পারেন না। তাঁর ‘বিদ্রোহী’ কবিতায় যখন তিনি বলেন, "আমি পরশুরামের কঠোর কুঠার, নক্ষত্র-রহিত করিব জগত, আনিব শান্ত উদার"—তখন বোঝা যায় এই ধ্বংসের পেছনে এক প্রশান্ত পৃথিবীর স্বপ্ন কাজ করছে। তিনি ভাঙতে চেয়েছিলেন বলেই গড়তে জানতেন। তাঁর কবিতায় শ্রমজীবী মানুষের যে জয়গান, তা কোনো কেতাবি সাম্যবাদ থেকে ধার করা নয়। তিনি নিজেই ছিলেন এক যাযাবর, এক সর্বহারা। তাই কুলি-মজুরদের ঘামে ভেজা পিঠের ওপর যে সভ্যতার ভিত্তি দাঁড়িয়ে আছে, তার অবিচার তিনি সইতে পারেননি। তাঁর কাছে ‘মানুষ’ ছিল সবকিছুর ঊর্ধ্বে। আজকের এই ২০২৬ সালেও যখন মানুষে-মানুষে ভেদাভেদ, জাতিগত দাঙ্গা আর ক্ষমতার দম্ভ পৃথিবীকে ক্ষতবিক্ষত করছে, তখন নজরুলের সেই ‘সাম্যের গান’ এক পরম ঔষধের মতো মনে হয়।
নজরুলের আধুনিকতা সবচেয়ে বেশি চোখে পড়ে নারীর প্রতি তাঁর দৃষ্টিভঙ্গিতে। যে যুগে নারী ছিল কেবল অন্দরমহলের শোভাবর্ধনকারী বা ভোগের সামগ্রী, নজরুল সেই যুগে দাঁড়িয়ে ঘোষণা করেছিলেন— "বিশ্বে যা-কিছু মহান সৃষ্টি চির-কল্যাণকর/ অর্ধেক তার করিয়াছে নারী, অর্ধেক তার নর।" তিনি নারীকে কেবল মমতাময়ী মা বা প্রেমিকা হিসেবে দেখেননি, তিনি তাকে দেখেছেন সংগ্রামের সাথী হিসেবে। তাঁর কবিতায় নারী ও পুরুষ কোনো আলাদা সত্তা নয়, বরং তারা একই প্রাণের দুটি রূপ। আজকের যুগের যে লৈঙ্গিক সমতার লড়াই, তার ভিত্তিপ্রস্তর নজরুল অনেক আগেই স্থাপন করে গিয়েছেন। তিনি বুঝেছিলেন, সমাজ নামক যে রথটি চলছে, তার একটি চাকা যদি অকেজো থাকে, তবে রথ কখনো লক্ষ্যে পৌঁছাতে পারবে না।
কিন্তু নজরুলের এই রুদ্র রূপের আড়ালে লুকিয়ে ছিল এক অত্যন্ত কোমল, স্পর্শকাতর ও অভিমানী প্রাণ। যারা কেবল তাঁকে ‘বিদ্রোহী কবি’ বলে চেনেন, তারা তাঁর জীবনের বড় এক অংশকে বাদ দিয়ে দেখেন। তাঁর প্রেমের কবিতা বা গজলগুলোর দিকে তাকালে এক অন্য নজরুলকে পাওয়া যায়। সেখানে রণতূর্য নেই, আছে বিরহের অতলান্ত ব্যাকুলতা। ‘দোলন-চাঁপা’ বা ‘সিন্ধু-হিন্দোল’-এর প্রতিটি ছত্রে ছড়িয়ে আছে প্রাপ্তি আর অপ্রাপ্তির এক গভীর হাহাকার।
সাহিত্যের নন্দনতত্ত্বের বিচারে নজরুল ছিলেন এক দুঃসাহসী কারিগর। তিনি যখন বাংলা শব্দের সঙ্গে আরবি, ফারসি বা তুর্কি শব্দের মালা গাঁথতেন, তখন মনে হতো যেন গঙ্গার বুকে কোনো নতুন উপনদী এসে মিশেছে। এই যে ভাষার মিশ্রণ, এটি কোনো জোর করে চাপিয়ে দেওয়া বিষয় ছিল না। এটি ছিল বাংলা সংস্কৃতির সেই অসাম্প্রদায়িক রূপ, যা তিনি নিজের অন্তরে ধারণ করতেন। তিনি যখন বলেন, "খেলিছ এ বিশ্বলয়ে বিরাট শিশু আনমনে"—তখন সেখানে দর্শনের এক গূঢ় গভীরতা টের পাওয়া যায়। তাঁর ছন্দ ছিল চলন্ত ট্রেনের মতো গতিশীল, আবার কখনো পাহাড়ি ঝরনার মতো চঞ্চল। তিনি জানতেন শব্দের ভেতরে কীভাবে প্রাণ সঞ্চার করতে হয়। তাঁর প্রতিটি গান যেন এক একটি জীবন্ত ছবি, যা শ্রোতার কানে বাজলেই চোখের সামনে রঙের মেলা বসিয়ে দেয়।
নজরুলের ব্যক্তিজীবন কোনো রূপকথা ছিল না। অভাব, বঞ্চনা আর লাঞ্ছনা তাঁকে আষ্টেপৃষ্ঠে ধরেছিল। কিন্তু সেই অন্ধকারেই তিনি জ্বালিয়েছিলেন তাঁর প্রতিভার মশাল। প্রথম বিশ্বযুদ্ধের রণক্ষেত্রে সৈনিক হিসেবে জীবন কাটানো থেকে শুরু করে জেলের অন্ধকার প্রকোষ্ঠে দিনের পর দিন অনশন—সবই ছিল তাঁর জীবন-দর্শনের অংশ। তিনি জীবনকে দূর থেকে দেখতেন না, তিনি জীবনকে মাঝখান থেকে জড়িয়ে ধরতেন। তাঁর সেই দুই চোখ—যেখানে একদিকে ঝিলিক দিত আগুনের শিখা, আর অন্য চোখে টলমল করত করুণার অশ্রু—সেই চোখ দুটিই ছিল তাঁর সাহিত্যের মূল আয়না। প্রমীলার দীর্ঘ অসুস্থতা এবং নিজের বাকরুদ্ধ হয়ে যাওয়ার সেই বিষাদময় অধ্যায় আজও পাঠককে এক গভীর শূন্যতায় নিমজ্জিত করে। প্রকৃতির এক অদ্ভুত খেয়ালে যে মানুষটি সারা জীবন মানুষের মুক্তির কথা বলে গেলেন, শেষ জীবনে সেই মানুষটিই নিজের মৌনতার কারাগারে বন্দি হয়ে গেলেন।
আজকের এই পৃথিবীতে আমরা খুব বেশি একা হয়ে পড়ছি। প্রযুক্তির উৎকর্ষ আমাদের কানে হেডফোন গুঁজে দিয়েছে ঠিকই, কিন্তু মানুষের হৃদস্পন্দন শোনার ক্ষমতা কেড়ে নিয়েছে। এই ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে নজরুলের প্রাসঙ্গিকতা কোনো রাজনৈতিক বক্তৃতায় নয়, বরং আমাদের মানবিক অস্তিত্ব রক্ষায়। নজরুলের বিদ্রোহ কোনো দলীয় এজেন্ডা ছিল না, তা ছিল আত্মার স্বাধীনতা।
আজকের তরুণ প্রজন্ম যখন বিষণ্ণতায় ভোগে, যখন তারা অস্তিত্বের সংকটে দুলতে থাকে, তখন নজরুলের ‘উন্নত শির’ তাদের পথ দেখাতে পারে। তিনি আমাদের শিখিয়েছেন কীভাবে ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে সৃষ্টির জয়গান গাইতে হয়।
কাজী নজরুল ইসলাম কোনো কালের নন, তিনি মহাকালের। তাঁকে কোনো বিশেষ গোষ্ঠীর ফ্রেমে বন্দি করা মানে নিজের ক্ষুদ্রতা প্রকাশ করা। তিনি সেই মহাসমুদ্র, যেখানে দ্রোহের নোনা জল আর প্রেমের সুমিষ্ট স্রোত একই সঙ্গে মিশে যায়। তাঁর বাঁশরী আর রণতূর্য আসলে আলাদা কিছু নয়; যারা ভালোবাসতে জানে না, তারা কখনো অন্যায়ের বিরুদ্ধে গর্জে উঠতে পারে না।
হয়তো কোনো এক নিভৃত বিকেলে, যখন মেঘের আড়ালে সূর্য লুকাবে, কোনো এক উদাসীন পাঠক নজরুলের ধূলিমলিন কাব্যগ্রন্থটি হাতে নেবেন। তখন তিনি টের পাবেন, পাতার ভাঁজ থেকে এখনো এক তপ্ত নিঃশ্বাস বের হচ্ছে। সেই নিঃশ্বাস আমাদের মনে করিয়ে দেয়—পৃথিবীতে যতক্ষণ অবিচার থাকবে, যতক্ষণ মানুষের ওপর মানুষের শোষণ চলবে, ততক্ষণ নজরুল প্রাসঙ্গিক থাকবেন। তিনি কোনো দিন পুরনো হবেন না, কারণ তাঁর সৃষ্টি আমাদের বুকের সেই ধুকপুকানির নাম, যার নাম মানুষ। নজরুল কেবল এক কবির নাম নয়; নজরুল হলো সেই চিরন্তন আকাঙ্ক্ষার নাম, যা মানুষকে পরাধীনতার অন্ধকার থেকে মুক্তির আলোর দিকে নিয়ে যেতে চায়। তাঁর কণ্ঠ চিরকাল আমাদের কানে বাজতে থাকবে—কখনো বজ্রের মতো গর্জনে, কখনো বা বাঁশির মতো করুণ সুরে। আর আমরা সেই সুরেই খুঁজে পাব আমাদের অস্তিত্বের ঠিকানা।
লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক।
১২২ বার পড়া হয়েছে