সর্বশেষ

মতামত

মুক্ত গণমাধ্যম, শিকলে বন্দি তৃণমূল

লিটন আব্বাস
লিটন আব্বাস

রবিবার, ৩ মে, ২০২৬ ৭:০৫ পূর্বাহ্ন

শেয়ার করুন:
আজ ৩ মে, বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবস। বিশ্বজুড়ে সংবাদপত্রের স্বাধীনতার জয়গান গাওয়া হলেও, আমাদের দেশের তৃণমূল পর্যায়ের সংবাদকর্মীদের জীবন কাটছে চরম বঞ্চনা আর নিরাপত্তাহীনতায়। রাষ্ট্র ও সমাজের উচ্চস্তরে সংবাদপত্রের স্বাধীনতা নিয়ে বড় বড় বুলি আওড়ানো হয়; অথচ মাঠ পর্যায়ের সাংবাদিকরা জীবন যাপন করছেন অবর্ণনীয় বৈষম্যের মধ্য দিয়ে।

সাংবাদিককে বলা হয় 'কলম সৈনিক' বা 'সংবাদ শ্রমিক'। রোদে পুড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে, জীবনের ঝুঁকি নিয়ে যারা তথ্যের সন্ধানে ছোটেন, তাদের সামাজিক মর্যাদা থাকলেও পেশাগত ও আর্থিক সুরক্ষা আজ তলানিতে---বিশেষ করে জেলা ও উপজেলা সাংবাদিকতায়।

রাজধানীর বড় বড় মিডিয়া হাউজগুলোর সাথে জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সাংবাদিকদের সুযোগ-সুবিধার ব্যবধান আকাশ-পাতাল। দেশের অধিকাংশ প্রিন্ট ও ইলেকট্রনিক মিডিয়া তাদের স্থানীয় প্রতিনিধিদের কোনো মাসিক বেতন দেয় না। অধিকাংশ ক্ষেত্রে দেখা যায়, বেতন তো দূরের কথা, দুপুরের খাবার বা যাতায়াত খরচটুকুও সাংবাদিককে নিজের পকেট থেকে দিতে হয়। ওয়েজ বোর্ড বা নির্দিষ্ট বেতন কাঠামোর তোয়াক্কা না করে বছরের পর বছর তাদের খাটিয়ে নেওয়া হচ্ছে। অথচ ডিজিটাল যুগে একজন প্রতিনিধিকে একই সাথে নিউজ লিখতে হয়, ভিডিও ফুটেজ পাঠাতে হয় এবং সোশ্যাল মিডিয়ায় লাইভ করতে হয়। এই অতিরিক্ত শ্রমের বিনিময়ে তারা পায় কেবল অবজ্ঞা আর শূন্য প্রাপ্তি।

একজন সংবাদ শ্রমিক যখন জীবনের ঝুঁকি নিয়ে দুর্নীতির খবর প্রকাশ করেন, তখন তাকে রাষ্ট্র বা তার প্রতিষ্ঠান থেকে পর্যাপ্ত সুরক্ষা দেওয়া হয় না। নানা ধরনের হুমকি-ধমকি এবং রাজনৈতিক ও প্রভাবশালী মহলের রক্তচক্ষু উপেক্ষা করে তাদের চলতে হয়। বিপদের দিনে যে প্রতিষ্ঠানটির হয়ে তিনি লড়ছেন, সেই প্রতিষ্ঠানকেও পাশে পাওয়া যায় না। এই নিঃসঙ্গ লড়াই একজন সাংবাদিকের পেশাদারিত্বকে প্রতিনিয়ত বাধাগ্রস্ত করছে। যখন একজন সাংবাদিকের পেটে ক্ষুধা থাকে এবং পরিবার নিয়ে অনিশ্চয়তায় ভোগেন, তখন তার পক্ষে শতভাগ স্বাধীন সাংবাদিকতা করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে।

বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসের মূল সুরই হলো—সাংবাদিকরা যেন নির্ভয়ে ও স্বাধীনভাবে কাজ করতে পারেন। কিন্তু কেবল নীতিবাক্য দিয়ে জীবন চলে না। এই দিবসে জোরালো দাবি—সাংবাদিকদের ন্যায্য অধিকার ও প্রাপ্য সম্মান ফিরিয়ে দিতে হবে। তাদের শ্রমকে স্বীকৃতি দিয়ে ন্যায্য মজুরি নিশ্চিত করতে হবে।
বর্তমানে একজন সাংবাদিককে একই সঙ্গে নিউজ রাইটার, ভিডিও এডিটর এবং সোশ্যাল মিডিয়া ম্যানেজারের দায়িত্ব পালন করতে হয়। যেখানে একজন বিসিএস ক্যাডারের (৯ম গ্রেড) এন্ট্রি-লেভেল বেতন অন্তত ৩০-৪০ হাজার টাকা হওয়া উচিত বলে আলোচনা চলছে; সেখানে তৃণমূলের সাংবাদিকরা শূন্য হাতে ফিরছেন।
জেলা ও উপজেলা পর্যায়ের সাংবাদিকদের প্রাপ্য সুযোগ-সুবিধা বঞ্চিত রেখে গণমাধ্যমের প্রকৃত মুক্তি বা স্বাধীনতা সম্ভব নয়।
বিনা বেতনে বা বঞ্চনার শিকার হয়ে সাংবাদিকতা করা মানে হলো দুর্নীতির কাছে আপস করার ক্ষেত্র তৈরি করা।

গণমাধ্যমের স্বাধীনতা তখনই অর্থবহ হবে যখন সাংবাদিকের পেটে ক্ষুধা থাকবে না। বর্তমানে নবম ওয়েজ বোর্ড অনেক প্রতিষ্ঠান কার্যকর করেনি; অথচ জীবনযাত্রার ব্যয় বহুগুণ বেড়েছে। সরকারের উচিত অবিলম্বে ১০ম ওয়েজ বোর্ড গঠন করে তৃণমূল সাংবাদিকদের বেতন কাঠামো বাধ্যতামূলক করা। 

সাংবাদিকদের কেবল 'কলম সৈনিক' বলে ফুলিয়ে-ফাঁপিয়ে সম্মান দিলেই চলবে না, তাদের পেশাগত অধিকার ও আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে হবে। মিডিয়া হাউজগুলোকে কেবল মুনাফা নয়, মাঠ পর্যায়ের প্রতিনিধিদের জীবনমানের প্রতিও দায়বদ্ধ হতে হবে। রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে সাংবাদিকদের নিরাপত্তা এবং একটি বৈষম্যহীন জাতীয় বেতন কাঠামো নিশ্চিত করা। সাংবাদিকরা যদি তাদের মৌলিক অধিকার ও প্রাপ্য সম্মান ফিরে না পান, তবে গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভটি অন্তঃসারশূন্য হয়ে পড়বে।

দিনশেষে একজন সাংবাদিক কেবল খবরের ফেরিওয়ালা নন, তিনি সমাজের বিবেক। অথচ সেই বিবেকের ঘরেই ক্ষুধার হাহাকার। কলম সৈনিকদের পেটে ক্ষুধা, মনে নিরাপত্তাহীনতা নিয়ে পথ চলতে হয়---তবে তাদের কাছ থেকে নিরপেক্ষ সাহস আশা করা নিছক বিলাসিতা।
তারা যদি তাদের মৌলিক অধিকার, ন্যায্য পাওনা আর প্রাপ্য সম্মানটুকু ফিরে না পান; তবে গণতন্ত্রের অট্টালিকা কেবলই একটি কঙ্কালে পরিণত হবে। গণতন্ত্রের চতুর্থ স্তম্ভটি যদি এভাবে ভেতরে ভেতরে অন্তঃসারশূন্য হয়ে ভেঙে পড়ে---সেই ধ্বংসস্তূপের নিচে চাপা পড়বে জাতির ভবিষ্যৎ।

আজ বিশ্ব মুক্ত গণমাধ্যম দিবসে আকুতি— খবরওয়ালাদের জীবন যেন আর সস্তা খবর না হয়ে যায়; তাদের বেঁচে থাকার লড়াইয়ে রাষ্ট্র ও সমাজ যেন আর নিশ্চুপ দর্শক না থাকে।

১৪৭ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন
এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন














সর্বশেষ সব খবর
মতামত নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন