মায়ের চলে যাওয়া, বাবার মৃত্যু- ১০ বছরের জুনায়েদের কাঁধে পুরো সংসার
রবিবার, ৩ মে, ২০২৬ ৬:৩৮ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
কুষ্টিয়ার দৌলতপুর উপজেলার সীমান্তবর্তী আদাবাড়িয়া ইউনিয়নের গড়ুরার মিস্ত্রিপাড়ায় এক হৃদয়বিদারক ঘটনার সাক্ষী হয়েছে স্থানীয় মানুষ।
মায়ের পরিত্যাগ, বাবার মৃত্যু—সব মিলিয়ে তিন শিশুসন্তানসহ একটি অসহায় পরিবার এখন চরম সংকটে দিন কাটাচ্ছে।
গত মার্চ মাসে অসুস্থ স্বামী হাবিবুর রহমানের চিকিৎসার জন্য জমানো টাকা নিয়ে স্ত্রী রোজিনা খাতুন তিন সন্তানকে ফেলে স্থানীয় এক বখাটে যুবকের সঙ্গে পালিয়ে যান। স্ত্রীর এই বিশ্বাসঘাতকতা এবং প্রয়োজনীয় চিকিৎসার অভাবে শারীরিক ও মানসিকভাবে ভেঙে পড়েন হাবিবুর রহমান। অবশেষে পবিত্র ঈদুল ফিতরের দিন বিনা চিকিৎসায় মৃত্যুবরণ করেন তিনি।
বাবার মৃত্যুর পর ভেঙে পড়া সংসারের দায়িত্ব এসে পড়ে মাত্র ১০ বছর বয়সী তৃতীয় শ্রেণির শিক্ষার্থী জুনায়েদের কাঁধে। পরিবারে রয়েছে অসুস্থ দাদা-দাদি, ১২ বছর বয়সী বড় ভাই (যিনি নিজেও শারীরিকভাবে অসুস্থ) এবং একটি ছোট বোন।
ছোট্ট জুনায়েদ এখন বাবার রেখে যাওয়া ভ্যান চালিয়ে সংসারের হাল ধরেছে। রোদ-বৃষ্টি উপেক্ষা করে প্রতিদিন ভ্যান চালিয়ে যা আয় হয়, তা দিয়েই পরিবারের খাবার এবং অসুস্থ দাদা-দাদির খরচ চালাতে হচ্ছে তাকে। ফলে তার পড়াশোনা কার্যত বন্ধ হয়ে গেছে। স্থানীয় ১ নম্বর প্রাগপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের তৃতীয় শ্রেণির ছাত্র জুনায়েদের নতুন বইগুলো এখনো প্রায় অছোঁয়াই রয়ে গেছে।
জুনায়েদ জানায়, “বাবার ভ্যান চালিয়ে যা আয় হয়, তা দিয়ে কোনোমতে আমাদের খাবার আর দাদা-দাদির খরচ চালাচ্ছি। মা চলে যাওয়ার পর বাবা মারা গেলেন, এখন আমাদের দেখার কেউ নেই।”
স্থানীয় কলেজশিক্ষক সামসুল হক, যিনি একদিন জুনায়েদের ভ্যানে যাত্রী হয়েছিলেন, আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, “সবাই বড়দের ভ্যানে ওঠে, এই ছোট বাচ্চাটার ভ্যানে কেউ উঠতে চায় না। ওর কষ্ট দেখে আমি ওর ভ্যানে উঠেছি। এত অল্প বয়সে সে যে দায়িত্ব পালন করছে, তা সত্যিই অবাক করার মতো।”
জুনায়েদের বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক শাহাবুদ্দিন বলেন, “বাবার মৃত্যু এবং মায়ের চলে যাওয়ার পর থেকে জুনায়েদ নিয়মিত স্কুলে আসছে না। আমরা তার খোঁজখবর রাখছি এবং তাকে আবার স্কুলে ফিরিয়ে আনার চেষ্টা করছি।”
জুনায়েদের ৬৫ বছর বয়সী দাদি সপা জান নেছা কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, “ঈদের দিন সবাই যখন নতুন জামা পরে আনন্দ করছে, তখন আমার জুনায়েদ বাবার লাশ কাঁধে নিয়েছে। ওর মা শুধু চিকিৎসার টাকা নেয়নি, আমাদের পুরো পরিবারটাকে পথে বসিয়ে দিয়ে গেছে। ছোট তিনটি বাচ্চা রেখে কীভাবে চলে যেতে পারে!”
এ বিষয়ে আদাবাড়িয়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আব্দুল বাকি জানান, তিনি আগে বিষয়টি জানতেন না। তবে দ্রুত খোঁজ নিয়ে পরিবারটির পাশে দাঁড়ানোর আশ্বাস দিয়েছেন।
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) অনিন্দ্য গুহ বলেন, “ঘটনাটি অত্যন্ত হৃদয়বিদারক। প্রশাসনের পক্ষ থেকে পরিবারটির খোঁজ নিয়ে প্রয়োজনীয় সহায়তার উদ্যোগ নেওয়া হবে।”
এখন প্রশ্ন উঠছে—সমাজের বিত্তবান মানুষ কি এগিয়ে আসবেন এই অসহায় পরিবারটির পাশে? নাকি অকালেই হারিয়ে যাবে ১০ বছরের লড়াকু শিশু জুনায়েদের স্বপ্ন?
১৬৫ বার পড়া হয়েছে