২০২৬ বিশ্বকাপ ফাইনালের টিকিটে আকাশচুম্বী দাম, সমালোচনার মুখে ফিফা
শনিবার, ২৫ এপ্রিল, ২০২৬ ৮:৫২ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
২০২৬ ফুটবল বিশ্বকাপের ফাইনাল ম্যাচ ঘিরে টিকিটের দাম রীতিমতো আকাশছোঁয়া পর্যায়ে পৌঁছেছে। ফিফার অফিশিয়াল রিসেল (পুনর্বিক্রয়) প্ল্যাটফর্মে ফাইনালের চারটি টিকিট বিক্রির জন্য তালিকাভুক্ত করা হয়েছে, যার প্রতিটির দাম প্রায় ২৩ লাখ মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি মুদ্রায় প্রায় ২৮ কোটি ২১ লাখ টাকা।
আগামী ১১ জুন যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো ও কানাডায় শুরু হবে বিশ্বকাপ। ফাইনাল ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে ১৯ জুলাই যুক্তরাষ্ট্রের নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে। ওই স্টেডিয়ামের গ্যালারির নিচতলার ১২৪ নম্বর ব্লকের ৪৫ নম্বর সারিতে, গোলপোস্টের পেছনের ৩৩ থেকে ৩৬ নম্বর আসনের প্রতিটির দাম ধরা হয়েছে ২২ লাখ ৯৯ হাজার ৯৯৮ ডলার।
ফিফার রিসেল বা বিনিময় প্ল্যাটফর্মে টিকিটের দাম নির্ধারণে সংস্থাটির সরাসরি নিয়ন্ত্রণ থাকে না, ফলে বিক্রেতারা ইচ্ছেমতো দাম নির্ধারণ করতে পারেন। তবে প্রতিটি লেনদেন থেকে ফিফা বড় অঙ্কের কমিশন আয় করে। নিয়ম অনুযায়ী, ক্রেতা ও বিক্রেতা উভয়ের কাছ থেকে ১৫ শতাংশ করে কমিশন নেয় সংস্থাটি। সেই হিসাবে, এই চারটি টিকিট নির্ধারিত দামে বিক্রি হলে শুধু কমিশন থেকেই ফিফার আয় হতে পারে প্রায় ২৬ লাখ ৯৯ হাজার ডলার, অর্থাৎ ৩৩ কোটি টাকারও বেশি।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘দ্য টেলিগ্রাফ’ জানিয়েছে, ফাইনালকে ঘিরে টিকিটের বাজারে অস্থিরতা গত শুক্রবার সকালেও অব্যাহত ছিল। ওইদিন গ্যালারির অন্যান্য আসনের টিকিটও বিক্রি হয়েছে কয়েক লাখ পাউন্ডে। এমনকি সবচেয়ে কম দামের টিকিটের মূল্যও ছিল ১০ হাজার ৯২৩ মার্কিন ডলার, যা প্রায় ১৩ লাখ টাকার সমান।
ফিফা জানিয়েছে, টুর্নামেন্ট থেকে অর্জিত আয় ২১১টি সদস্য দেশের ফুটবল উন্নয়নে ব্যয় করা হয়। সংস্থাটি সম্প্রতি তাদের ওয়েবসাইটে সরাসরি বিক্রির জন্য নতুন কিছু টিকিট ব্লক উন্মুক্ত করেছে, যেখানে ফাইনালের টিকিটের দাম ধরা হয়েছে ১০ হাজার ৯৯০ ডলার (প্রায় ১৩ লাখ ৪৮ হাজার টাকা)।
এ ছাড়া সেমিফাইনাল ম্যাচের টিকিটের দামও অত্যন্ত বেশি। ১৪ জুলাই টেক্সাসের আর্লিংটনে সেমিফাইনালের টিকিটের মূল্য ১১ হাজার ১৩০ ডলার, ১৫ জুলাই আটলান্টার সেমিফাইনালের টিকিটের দাম ৯ হাজার ৬৬০ ডলার এবং কিছু আসনের দাম ৪ হাজার ৩৬০ ডলার নির্ধারণ করা হয়েছে।
বিশ্বকাপের এই অস্বাভাবিক ব্যয় নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন ম্যানচেস্টার সিটি কোচ পেপ গার্দিওলা। তিনি বলেন, কয়েক বছর আগেও বিশ্বকাপ ছিল সাধারণ মানুষের জন্য একটি আনন্দঘন উৎসব, যেখানে সমর্থকরা সহজেই নিজের দেশকে সমর্থন দিতে যেতে পারত। কিন্তু বর্তমানে এটি অত্যন্ত ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে।
তিনি আরও বলেন, ফুটবল মূলত দর্শকদের জন্যই। স্পনসর ও বাণিজ্যিক দিক গুরুত্বপূর্ণ হলেও সাধারণ দর্শকদের বাদ দিয়ে এই খেলা টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়।
বিশ্বকাপ টিকিটের এই অস্বাভাবিক মূল্যের পেছনে ‘ডায়নামিক প্রাইসিং’ বা পরিবর্তনশীল মূল্যনীতি বড় ভূমিকা রাখছে বলে অভিযোগ উঠেছে। এই পদ্ধতির কারণে চাহিদা অনুযায়ী টিকিটের দাম কয়েক গুণ বেড়ে যাচ্ছে।
ফিফার নিজস্ব রিসেল প্ল্যাটফর্মে উচ্চ দামে টিকিট বিক্রির সুযোগ তৈরি হওয়ায় নতুন করে বিতর্ক তৈরি হয়েছে। কমিশন কাঠামো এবং পুনর্বিক্রয় ব্যবস্থাও সমালোচনার মুখে পড়েছে। যদিও ফিফা দাবি করছে, এসব থেকে অর্জিত আয় ফুটবলের উন্নয়নে পুনঃবিনিয়োগ করা হবে।
এদিকে কিছু সীমিত টিকিট মাত্র ৬০ ডলারে জাতীয় ফুটবল অ্যাসোসিয়েশনের মাধ্যমে অনুগত সমর্থকদের জন্য বরাদ্দ দেওয়ার ঘোষণা দিয়েছে ফিফা।
বিশ্বকাপকে ঘিরে শুধু টিকিট নয়, হোটেল, যাতায়াত এবং অন্যান্য খরচও ব্যাপকভাবে বেড়ে গেছে।
বিশ্বকাপের সময়সূচি ঘোষণার পর যুক্তরাষ্ট্র, কানাডা ও মেক্সিকোর হোটেল ভাড়া কয়েক গুণ বৃদ্ধি পেয়েছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে ১৫৭ ডলারের কক্ষ ভাড়া বেড়ে ৩ হাজার ৮৮২ ডলারে পৌঁছেছে।
নিউ জার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে ট্রেন টিকিটের দাম সাধারণ ১২.৯০ ডলার থেকে বেড়ে ১৫০ ডলারেরও বেশি করা হয়েছে। এ বিষয়ে নিউ জার্সি ট্রানজিটের বিরুদ্ধে ‘লুটতরাজের’ অভিযোগ তুলেছে ফিফা।
নিউ জার্সির গভর্নর মাইকি শেরিল সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ক্ষোভ প্রকাশ করে জানান, ফিফা পরিবহন খাতে কোনো অর্থ দিচ্ছে না, অথচ সমর্থকদের যাতায়াতের জন্য রাজ্যকে প্রায় ৪ কোটি ৮০ লাখ ডলার ব্যয় বহন করতে হচ্ছে।
গাড়ি পার্কিং ফিও আকাশছোঁয়া পর্যায়ে পৌঁছেছে। মেটলাইফ স্টেডিয়ামে পার্কিং ফি ধরা হয়েছে ২২৫ ডলার এবং বোস্টনের জিলেট স্টেডিয়ামে ১৭৫ ডলার।
এছাড়া ফ্যান জোনেও প্রবেশ ফি চালু করা হয়েছে। নিউ জার্সির ফ্যান জোনে প্রবেশের জন্য টিকিটের দাম ধরা হয়েছে ১২ ডলার ৫০ সেন্ট, যা সাধারণত বিনামূল্যে হয়ে থাকে।
টিকিট, যাতায়াত, হোটেল এবং অন্যান্য খরচের এই অস্বাভাবিক বৃদ্ধি বিশ্বজুড়ে ফুটবলপ্রেমীদের মধ্যে ক্ষোভ সৃষ্টি করেছে। সমালোচকদের মতে, ফিফার বাণিজ্যিক নীতির কারণে বিশ্বকাপ ধীরে ধীরে সাধারণ মানুষের নাগালের বাইরে চলে যাচ্ছে।
তবে ফিফার দাবি, এসব আয়ের মাধ্যমে বিশ্বজুড়ে ফুটবলের উন্নয়ন কার্যক্রম পরিচালনা করা হয়।
১১৭ বার পড়া হয়েছে