দিনাজপুরে লিচুর গুটি কমলেও আছে কোটি টাকার স্বপ্ন, দুর্যোগের শঙ্কা
শনিবার, ২৫ এপ্রিল, ২০২৬ ৯:২৬ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
দিনাজপুর প্রতিনিধি: উত্তরের উত্তপ্ত আবহাওয়া আর প্রাকৃতিক দুর্যোগের চোখ রাঙানির মাঝেও দিনাজপুরে নীরব বিপ্লব ঘটাচ্ছে ঐতিহ্যবাহী লিচু।
চলতি মৌসুমে বৈরী আবহাওয়ার কারণে গাছে লিচুর গুটি তুলনামূলক কম এলেও, হাল ছাড়েননি চাষি ও বাগান মালিকরা। হাজার কোটি টাকার এই বিশাল বাজারকে ঘিরে এখন চলছে শেষ মুহূর্তের লড়াই ও পরিচর্যা।
বিরল উপজেলার মহেশপুর গ্রামের আজিজুল ইসলাম। পেশায় মুহুরী হলেও তিনি একজন পুরোদস্তুর লিচু উদ্যোক্তা। প্রতি মৌসুমে তিনি ৩০ থেকে ৫০ লাখ টাকার বাগান কেনেন। চলতি বছরও তিনি প্রায় ৩৫ লাখ টাকা বিনিয়োগ করেছেন। তার কণ্ঠে শঙ্কার সুর, > "গাছে গুটি এসেছে মাত্র ৪০ থেকে ৫০ শতাংশ। আমরা গুটি বাঁচাতে সর্বোচ্চ চেষ্টা করছি। তবে তাপদাহ আর প্রাকৃতিক দুর্যোগের ভয় রয়েই গেছে।"
একই চিত্র দেখা যায় মাধববাটীর আমজাদ হোসেনের বাগানে। ঝড়ে ভাঙা ডাল আর ঝরে পড়া গুটি নিয়ে প্রকৃতির সাথে যেন এক অসম লড়াই করছেন তিনি। তিনি জানান, > "অর্ধেকেরও কম গাছে গুটি এসেছে। কীটনাশক দিয়েও অনেক গুটি ঝরে যাচ্ছে। এখন সবচেয়ে বড় চিন্তা প্রকৃতি।"
ব্যক্তিগত এই শঙ্কার মাঝেও আশার আলো দেখছে স্থানীয় কৃষি বিভাগ। মাঠে মাঠে গিয়ে কৃষকদের পরামর্শ দিচ্ছেন কর্মকর্তারা।
বিরল উপজেলার চিত্র: উপ-সহকারী কৃষি কর্মকর্তা এ.এস.এম হানিফ জানান, তাদের এলাকায় প্রায় ২৫০ হেক্টর জমিতে লিচুর আবাদ হয়েছে, যেখানে গুটি এসেছে ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ গাছে। গুটি ঝরা রোধে কৃষকদের নিয়মিত ছত্রাকনাশক ও কীটনাশক ব্যবহারের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। উৎপাদন কিছুটা কম হওয়ায় বাজারে দাম বেশি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
উপজেলা কৃষি কর্মকর্তার বক্তব্য: বিরল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা রুম্মান আক্তার জানান, উপজেলার ১২টি ইউনিয়নে ২,৫৫৮ হেক্টর জমিতে লিচুর আবাদ হয়েছে। মৌসুমের শুরুতে মুকুল ভালো এলেও ঝড় ও শিলাবৃষ্টিতে কিছু ক্ষতি হয়েছে। এরপরও বর্তমানে ৭০ থেকে ৮০ শতাংশ গাছে গুটি রয়েছে। তিনি বলেন, > "মাঠ পর্যায়ে আমরা কৃষকদের দ্বারে দ্বারে গিয়ে পরামর্শ দিচ্ছি। দিনাজপুর লিচুর জন্য ঐতিহ্যবাহী—আমরা এই ঐতিহ্য ধরে রাখতে কাজ করছি এবং এর রপ্তানির সম্ভাবনাও জোরালোভাবে বিবেচনা করা হচ্ছে।"
জেলা পর্যায়ের পরিসংখ্যান: জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপ-পরিচালক (শস্য) মোঃ আনিছুজ্জামান জানান, জেলার ১৩টি উপজেলায় ৫,৪১৮টি বাগানে মোট ৫,৮৭০ হেক্টর জমিতে লিচুর আবাদ হয়েছে। ঝড়-বৃষ্টিতে মুকুল নষ্ট হলেও বর্তমানে ৬০ থেকে ৭০ শতাংশ গাছে গুটি টিকে আছে। প্রতি হেক্টরে ৬ থেকে ৮ মেট্রিক টন ফলনের আশা করছে কৃষি বিভাগ। উন্নত বালাইনাশক পদ্ধতি এবং রপ্তানি ব্যবস্থা চালু হলে কৃষকরা আরও লাভবান হবেন বলে তিনি মত প্রকাশ করেন।
হাজার কোটি টাকার বাজার ও আধুনিকায়নের দাবি
দিনাজপুরের অর্থনীতিতে লিচুর প্রভাব অপরিসীম। জেলা কাঁচামাল আড়তদার সমিতির নেতা মিন্টু মিয়া লিচু কেন্দ্রিক অর্থনীতির বিশাল চিত্র তুলে ধরেন। তিনি বলেন, > "দিনাজপুরে প্রতিবছর ৬০০ থেকে ৭০০ কোটি টাকার লিচু সরাসরি বিক্রি হয়। পরিবহন, প্যাকেজিং ও অন্যান্য সংশ্লিষ্ট ব্যবসা মিলিয়ে এই বাজারের আকার হাজার কোটি টাকারও বেশি।"
তবে বাজার ব্যবস্থার দুর্বলতার কারণে কৃষকরা অনেক সময় ন্যায্য দাম থেকে বঞ্চিত হন উল্লেখ করে তিনি একটি আধুনিক লিচুর বাজার স্থাপনের জোর দাবি জানান।
প্রকৃতির খামখেয়ালিপনা আর অর্থনীতির কঠিন বাস্তবতার মাঝেও দিনাজপুরের লিচু চাষিরা স্বপ্ন দেখছেন। গুটি কিছুটা কম হলেও, পরিচর্যা আর শ্রমে ঘাটতি নেই। প্রতিটি লিচুর ভেতরেই যেন মিশে আছে এই অঞ্চলের কৃষকের প্রার্থনা আর বেঁচে থাকার অদম্য প্রত্যয়।
১২৩ বার পড়া হয়েছে