রক্তলিপ্ত নক্ষত্রের আলপনা: আনোয়ার পাশার সৃজন-বেদনা ও অবিনাশী পথচলা
বৃহস্পতিবার , ১৬ এপ্রিল, ২০২৬ ৫:২৪ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
আজ বিকেলের রোদে একটা বিষণ্ণ মায়া মাখানো থাকে, বিশেষ করে যখন দিনটি চৈত্র-বৈশাখের সন্ধিক্ষণে এসে দাঁড়ায়। ঢাকার ব্যস্ত রাজপথের কোলাহল ছাড়িয়ে যদি একটু নিভৃতে যাওয়া যায়, তবে অনুভব করা যায় মহাকালের এক আশ্চর্য স্তব্ধতা।
আজ এই সময়ে দাঁড়িয়ে যখন কোনো এক নিভৃতচারী মন অতীতের দিকে তাকায়, তখন সেখানে ফুটে ওঠে একটি নাম—আনোয়ার পাশা। ১৫ এপ্রিল তাঁর ৯৮তম জন্মবার্ষিকী। ৯৮ বছর—একটি দীর্ঘ সময়, অথচ তাঁর রেখে যাওয়া কাজ আর তাঁর সেই করুণ কিন্তু বীরত্বগাথা আত্মাহুতির কথা ভাবলে মনে হয়, এই তো সেদিনের কথা। ইতিহাসের পাতায় ধুলো জমলেও চেতনার আয়নায় তিনি আজও অম্লান।
তাঁকে কি কেবল একজন কথাসাহিত্যিক বা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হিসেবে চেনা যায়? বোধহয় না। কিছু মানুষ জন্মান সময়ের প্রয়োজনে, আর কিছু মানুষ সময়ের বুক চিরে নতুন এক সময়ের পথ তৈরি করে দেন। আনোয়ার পাশা ছিলেন সেই বিরল প্রতিভাদের একজন, যাঁদের কলমের ডগায় ছিল আগ্নেয়গিরির তপ্ত লাভা, আর হৃদয়ে ছিল বাংলার শ্যামল প্রকৃতির জন্য এক গভীর মমত্ববোধ। ১৯২৮ সালের মুর্শিদাবাদের সেই নিভৃত ডুগু গ্রাম থেকে শুরু হওয়া যাত্রাটি যে একদিন ঢাকার রায়েরবাজারের বধ্যভূমিতে গিয়ে এক মহাকাব্যিক ট্র্যাজেডিতে রূপ নেবে, তা হয়তো সেদিন কেউ ভাবেনি। কিন্তু নিয়তি তাঁর জন্য এক বিশাল ক্যানভাস সাজিয়ে রেখেছিল, যেখানে তিনি রক্ত দিয়ে লিখে গেছেন একটি জাতির স্বাধীনতার ইশতেহার।
মানুষের শিকড় বড় অদ্ভুত এক জিনিস। ১৯৪৭-এর দেশভাগ যখন লক্ষ লক্ষ মানুষের জীবনকে ছিন্নভিন্ন করে দিল, আনোয়ার পাশাও তার বাইরে ছিলেন না। তবে তাঁর সেই দেশত্যাগ বা এক ভূখণ্ড থেকে অন্য ভূখণ্ডে চলে আসা কেবল একটা ভৌগোলিক পরিবর্তন ছিল না। এটি ছিল নিজের অস্তিত্বকে নতুন করে চেনার এক প্রক্রিয়া। ১৯৫৮ সালে যখন তিনি পূর্ব পাকিস্তানে থিতু হওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন, তখন তাঁর বুকের ভেতর হয়তো বাজছিল এক অসাম্প্রদায়িক বাংলার সুর।
আনোয়ার পাশার কথা বললেই অবধারিতভাবে চোখের সামনে ভেসে ওঠে ‘রাইফেল রোটি আওরাত’ উপন্যাসের কথা। ১৯৭১-এর সেই অবরুদ্ধ দিনগুলোয়, যখন ঢাকা শহর এক জীবন্ত কবরস্থানে পরিণত হয়েছিল, যখন দরজার ওপাশে বুটের শব্দ মানেই ছিল অবধারিত মৃত্যু, তখন কোনো এক নিভৃত কোণে বসে এক মানুষ কলম চালিয়ে যাচ্ছিলেন। কী আশ্চর্য সেই সাহস! মৃত্যুর সাথে যার নিত্য বসবাস, সে কীভাবে শিল্পের এমন এক মিনার তৈরি করতে পারে? এই উপন্যাসটি কেবল যুদ্ধের দলিল নয়, এটি এক দগ্ধ মানুষের আর্তি এবং একই সাথে এক অদম্য যোদ্ধার হুংকার। উপন্যাসের কেন্দ্রীয় চরিত্র সুদীপ্ত শাহীন কি কেবলই একজন কাল্পনিক চরিত্র? না, সুদীপ্ত শাহীন আসলে আনোয়ার পাশারই সেই সত্তা, যা সংকটে বিচলিত হয় কিন্তু আদর্শে অটল থাকে।
মানুষ যখন চরম বিপদের মুখে দাঁড়ায়, তখন তার ভেতরের আসল রূপটি বেরিয়ে আসে। আনোয়ার পাশার লেখনীতে সেই সময়কার ঢাকা শহরের যে বর্ণনা পাওয়া যায়, তা যেন কোনো এক নিপুণ চিত্রশিল্পীর আঁকা বিষণ্ণ ক্যানভাস। সেখানে রাজপথে রক্তের দাগ আছে, বাতাসে বারুদের গন্ধ আছে, আবার আছে এক অনিশ্চিত ভোরের প্রতীক্ষা। রাইফেল, রুটি আর নারী—এই তিনটি শব্দের মোড়কে তিনি যুদ্ধের যে করাল গ্রাসকে তুলে ধরেছেন, তা বিশ্বসাহিত্যের যেকোনো ধ্রুপদী রচনার সমতুল্য। পাঠক যখন সেই উপন্যাসের পাতা ওল্টান, তখন তিনি কেবল শব্দ পড়েন না, তিনি অনুভব করেন এক পরাধীন জাতির হৃদস্পন্দন।
কিন্তু আনোয়ার পাশা কি কেবল যুদ্ধের লেখক ছিলেন? তাঁর রবীন্দ্র-গবেষণা বা তাঁর প্রবন্ধগুলোর দিকে তাকালে এক অন্য মানুষের দেখা মেলে। তিনি ছিলেন একজন তীক্ষ্ণধী বিশ্লেষক। রবীন্দ্রনাথের ছোটগল্পের গভীরে প্রবেশ করে তিনি যেভাবে মানুষের মনস্তত্ত্বকে ব্যবচ্ছেদ করেছেন, তা আজও আমাদের বিস্মিত করে। তাঁর দৃষ্টি ছিল স্বচ্ছ, আর বিচারবুদ্ধি ছিল শাণিত। তিনি জানতেন, একটি জাতির রাজনৈতিক মুক্তির আগে তার সাংস্কৃতিক মুক্তি প্রয়োজন। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের সেই বারান্দাগুলো আজও হয়তো তাঁর গম্ভীর কিন্তু স্নেহমাখা কণ্ঠস্বরের প্রতিধ্বনি বহন করে।
মাঝে মাঝে প্রশ্ন জাগে, একজন মানুষের ভেতরে কতটা কোমলতা থাকলে তিনি একই সাথে ‘রাইফেল রোটি আওরাত’-এর মতো কঠিন বাস্তবধর্মী গদ্য এবং ‘চৈত্র দিনের কবিতা’-র মতো স্নিগ্ধ পদ্য লিখতে পারেন? কবির সত্তা আর গদ্যকারের সত্তা তাঁর ভেতরে মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছিল। তাঁর কবিতায় নদী আসে এক শাশ্বত প্রবহমানতা নিয়ে। বাংলার নদীগুলো যেন তাঁর কাছে কেবল জলধারা ছিল না, সেগুলো ছিল একেকটি জীবন্ত সত্তা। নদী যখন নিঃশেষিত হয়, তখন মানুষের সভ্যতাও যে শুকিয়ে যায়, এই গভীর জীবনদর্শন তিনি উপলব্ধি করেছিলেন অনেক আগেই। তাঁর কবিতায় যে প্রকৃতির ছোঁয়া পাওয়া যায়, তাতে কোনো মেকি আবেগ ছিল না, ছিল মাটির কাছাকাছি থাকা মানুষের এক নিবিড় ভালোবাসা।
আনোয়ার পাশার অসাম্প্রদায়িক চেতনা ছিল তাঁর চরিত্রের মেরুদণ্ড। তিনি এমন এক সময়ে বড় হয়েছিলেন এবং কর্মজীবন অতিবাহিত করেছিলেন, যখন ধর্মকে ব্যবহার করে রাজনীতি ছিল এক সাধারণ প্রপঞ্চ। কিন্তু তিনি কখনো সেই স্রোতে গা ভাসাননি। এই বিশ্বাসের কারণেই তিনি তৎকালীন শাসকগোষ্ঠীর চক্ষুশূল হয়েছিলেন। তিনি কোনো দিন আপস করেননি, কোনো দিন অন্যায়ের সামনে মাথা নত করেননি। তাঁর এই নির্ভীকতাই তাঁকে সাধারণ থেকে অসাধারণ করে তুলেছিল।
তারপর এল সেই অভিশপ্ত ১৯৭১-এর ডিসেম্বর। বিজয়ের আলো যখন দিগন্তে উঁকি দিচ্ছে, ঠিক তখনই নেমে এল নিকষ কালো অন্ধকার। ১৪ ডিসেম্বরের সেই ভোরটি ছিল অন্য সব ভোরের চেয়ে আলাদা। এক দল নরপশু মেধার সূর্যকে নিভিয়ে দেওয়ার জন্য হানা দিল তাঁর ঘরে। কেন তারা আনোয়ার পাশাকে বেছে নিয়েছিল? কারণ তারা জানত, বন্দুকের গুলির চেয়েও তাঁর কলমের কালি অনেক বেশি শক্তিশালী। তারা জানত, এই মানুষটি বেঁচে থাকলে নবজাতক বাংলাদেশ যে বুদ্ধিবৃত্তিক রসদ পেত, তা তাদের পরাজয়কে আরও বেশি নিশ্চিত করত। রায়েরবাজারের সেই কাদা আর রক্তের প্রলেপ মাখা বধ্যভূমিতে যখন তাঁর প্রাণহীন দেহটি পড়ে ছিল, তখন হয়তো আকাশের কোনো এক কোণে একটি নক্ষত্র খসে পড়েছিল।
কিন্তু ঘাতকেরা কি পেরেছিল তাঁকে স্তব্ধ করতে? শরীর মরণশীল, কিন্তু চেতনা কি মরে? আজ ২০২৬ সালে এসেও আমরা যখন তাঁর কথা আলোচনা করছি, তখন মনে হয় তিনি তো আমাদের মধ্যেই আছেন। তাঁর লেখা প্রতিটি শব্দ, তাঁর প্রতিটি চিন্তা আজ কোটি বাঙালির মনে বেঁচে আছে। একটি দেশ কেবল মানচিত্র দিয়ে তৈরি হয় না, একটি দেশ তৈরি হয় তার মানুষের চিন্তা ও সংস্কৃতি দিয়ে। আনোয়ার পাশা সেই চিন্তার কারিগর ছিলেন।
আজকের এই দ্রুত বদলে যাওয়া পৃথিবীতে, যেখানে প্রযুক্তির দাপটে মানুষের মানবিকতা ফিকে হয়ে আসছে, যেখানে আত্মপরিচয়ের সংকট প্রকট হয়ে উঠছে, সেখানে আনোয়ার পাশার প্রাসঙ্গিকতা কমেছে না কি বেড়েছে? উত্তরটি হয়তো আমাদের নিজেদের কাছেই আছে। আমরা যখন সংকটে পড়ি, যখন আমাদের শিকড় আলগা হয়ে যেতে চায়, তখন আমরা আবার সেই ‘সুদীপ্ত শাহীন’-এর কাছেই ফিরে যাই। তাঁর জীবন আমাদের শেখায় কীভাবে প্রতিকূলতার মাঝেও মাথা উঁচু করে বাঁচতে হয়।
তবে একটি আক্ষেপ থেকেই যায়। আমরা কি পেরেছি তাঁর কাজগুলোকে বিশ্বদরবারে সঠিকভাবে পৌঁছে দিতে? ‘রাইফেল রোটি আওরাত’-এর মতো কালজয়ী উপন্যাস কি বিশ্বের সব ভাষায় অনূদিত হয়েছে? বিশ্বসাহিত্য যখন যুদ্ধের ভয়াবহতা আর মানবিকতার কথা বলে, তখন সেখানে কি আনোয়ার পাশার নাম সগৌরবে উচ্চারিত হয়? হয়তো হয় না। আর এখানেই আমাদের ব্যর্থতা। তাঁর মতো একজন লেখককে কেবল একটা নির্দিষ্ট ভৌগোলিক সীমায় আটকে রাখা ঠিক নয়। তাঁর চিন্তা ছিল সর্বজনীন, তাঁর লড়াই ছিল মানবতার পক্ষে।
বিকেলের এই আলোটুকু এখন ম্লান হয়ে আসছে। আকাশের কোণে লাল আভাটুকু যেন সেই রক্তের কথা মনে করিয়ে দেয়, যা দিয়ে আমাদের স্বাধীনতা কেনা। আনোয়ার পাশা সেই রক্তের দামে কেনা এক উজ্জ্বল রত্ন। তিনি ছিলেন কালান্তরের সেই ধূমকেতু, যা ক্ষণিকের জন্য দেখা দিলেও আকাশের অন্ধকার দূর করে দিয়ে যায়। আজ তাঁর জন্মদিনে তাঁকে স্মরণ করা মানে কেবল আনুষ্ঠানিকতা নয়, বরং নিজের ভেতরের বাঙালি সত্তাকে আবার নতুন করে চেনা।
ইতিহাসের চাকা ঘুরতেই থাকবে। ২০২৬ পেরিয়ে হয়তো একদিন ২০৭৬ সাল আসবে। সেদিনও কি কেউ এই বিকেলে বসে আনোয়ার পাশার কথা ভাববে? হয়তো ভাববে। কারণ যতক্ষণ পর্যন্ত এই বাংলায় নদী থাকবে, যতক্ষণ পর্যন্ত চৈত্র শেষে বৈশাখ আসবে, ততক্ষণ পর্যন্ত আনোয়ার পাশার নাম মুছে যাওয়ার কোনো কারণ নেই। তিনি তো কেবল এক ব্যক্তি নন, তিনি এক অবিনাশী আদর্শ।
শেষ পর্যন্ত জীবন তো এক বহমান নদী। কেউ পাড়ে দাঁড়িয়ে সেই প্রবাহ দেখে, আর কেউ বুক চিরে সেই নদীতে সাঁতার কাটে। আনোয়ার পাশা ছিলেন সেই দুঃসাহসী সাঁতারু, যিনি উত্তাল তরঙ্গের মাঝেও ধ্রুবতারাকে হারাননি। তিনি মিশে আছেন আমাদের বর্ণমালায়, আমাদের হাসিতে, আমাদের গানে আর আমাদের স্বাধীনতার প্রতিটি নিশ্বাসে। আজকের এই বিকেলটি তাঁর স্মৃতির প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধায় অবনত হোক। মহাকালের বিশাল ক্যানভাসে তিনি যে আলপনা এঁকে দিয়ে গেছেন, তার উজ্জ্বলতা যেন আমাদের আগামীর পথকে চিরকাল আলোকিত রাখে।
মানুষ হয়তো চলে যায়, কিন্তু তার রেখে যাওয়া ছায়াটি রয়ে যায় অনেকক্ষণ। আনোয়ার পাশার সেই দীর্ঘ ছায়া আজ সমগ্র বাংলাদেশের ওপর প্রসারিত। সেই ছায়াতলে দাঁড়িয়েই আমরা স্বপ্ন দেখি এক সুন্দর, অসাম্প্রদায়িক ও উন্নত পৃথিবীর। যেখানে কলম কখনো থামবে না, যেখানে সত্যের জয় হবেই। এটাই বোধহয় তাঁর প্রতি আমাদের সবচেয়ে বড় শ্রদ্ধাঞ্জলি।
সূর্যটা এখন দিগন্তের নিচে তলিয়ে গেল। অন্ধকার নামছে চারদিকে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই অন্ধকারের মাঝেও মনের কোণে একটা মৃদু আলো জ্বলছে। সেই আলোটির নাম—আনোয়ার পাশা। তিনি জানতেন, অন্ধকার চিরস্থায়ী নয়। তিনি বিশ্বাস করতেন, ভোরের সূর্য আসবেই। সেই বিশ্বাসের অমর উত্তরাধিকারী হয়ে আমরা আজও এগিয়ে চলেছি সম্মুখ পানে। তাঁর সেই বিশ্বাসের জয় হোক, তাঁর সৃজন-বেদনা সার্থক হোক আমাদের প্রতিদিনের পথচলায়। চৈত্র দিনের খরতাপ শেষে বৃষ্টির যে স্নিগ্ধতা আসে, আনোয়ার পাশার জীবন ও কর্মও যেন আমাদের জাতীয় জীবনে সেই স্নিগ্ধতার পরশ হয়ে থাকে চিরকাল।
লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক।
১৩৩ বার পড়া হয়েছে