সর্বশেষ

সারাদেশ

জাফলংয়ে কুদ্দুস–রুকন সিন্ডিকেটের দৌরাত্ম্য, জমি দখল ও চাঁদাবাজির অভিযোগ

স্টাফ রিপোর্টার, সিলেট
স্টাফ রিপোর্টার, সিলেট

সোমবার, ৯ মার্চ, ২০২৬ ৬:১৫ পূর্বাহ্ন

শেয়ার করুন:
প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্য বিখ্যাত সিলেটের জাফলং এখন একটি প্রভাবশালী সিন্ডিকেটের দখলে চলে যাওয়ার অভিযোগ উঠেছে।

পর্যটন কেন্দ্রের গুচ্ছগ্রাম বিজিবি ক্যাম্প সংলগ্ন এলাকায় মাওলানা কুদ্দুস নামে এক ব্যক্তির নেতৃত্বে গড়ে ওঠা একটি চক্র সরকারি খাস জমি দখল, পরিবহন স্ট্যান্ডে চাঁদাবাজি এবং এসবের বিরুদ্ধে প্রতিবাদকারীদের হুমকি দিয়ে আসছে বলে অভিযোগ স্থানীয়দের। এমনকি এসব অনিয়ম নিয়ে সংবাদ প্রকাশ করায় এক সাংবাদিককে প্রাণনাশের হুমকিও দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের দাবি, ভূমি অফিসের কিছু অসাধু কর্মচারী ও রাজনৈতিক পরিচয়ধারী লাঠিয়াল বাহিনীর সহযোগিতায় এই সিন্ডিকেট আরও শক্তিশালী হয়ে উঠেছে, ফলে জনমনে তীব্র ক্ষোভ ও আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, জাফলংয়ের নলজুরি মাদরাসার নাম ব্যবহার করে গুচ্ছগ্রাম বিজিবি ক্যাম্প সংলগ্ন স্ট্যান্ড থেকে প্রতিদিন লেগুনা, সিএনজি ও অটোরিকশাসহ বিভিন্ন যানবাহন থেকে গাড়িপ্রতি ২০০ থেকে ৩০০ টাকা করে চাঁদা আদায় করেন মাওলানা কুদ্দুস। অভিযোগ রয়েছে, মাদরাসার নামে এই অর্থ সংগ্রহ করা হলেও তার কোনো অংশই মাদরাসার তহবিলে জমা হয় না। বরং সংগৃহীত অর্থ কুদ্দুস ও তার সহযোগীরা আত্মসাৎ করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয়দের দাবি, সিলেটের কয়েকজন শীর্ষস্থানীয় আলেমের নাম ব্যবহার করেও বিভিন্ন জায়গা থেকে অর্থ সংগ্রহ করছেন তিনি।

এদিকে সরকারি খাস খতিয়ানের ৫৬ নম্বর দাগের মূল্যবান জমি একের পর এক দখল করছে কুদ্দুস বাহিনী বলে অভিযোগ উঠেছে। এ ঘটনায় উপজেলা ভূমি অফিসের কর্মচারী বদরুল ইসলাম শামীমের নামও সামনে এসেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, তার সঙ্গে বড় অঙ্কের আর্থিক লেনদেনের মাধ্যমে সেখানে অবৈধভাবে দোকান ও স্থায়ী স্থাপনা নির্মাণ করা হয়েছে। জানা গেছে, জাফলং ভিউ হোটেলের পাশের অবৈধ স্থাপনা উচ্ছেদের জন্য সাবেক উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. তৌহিদুল ইসলামের নির্দেশ থাকলেও বদরুলের রহস্যজনক মধ্যস্থতায় সেই উচ্ছেদ অভিযান থেমে যায়। এর আগে দুর্নীতির অভিযোগে বদরুল ইসলাম শামীমকে শাস্তিমূলক বদলি করা হলেও ‘উপর মহলের’ তদবিরে তিনি আবার গোয়াইনঘাট ভূমি অফিসে ফিরে আসেন বলে অভিযোগ রয়েছে। স্থানীয়দের মতে, তার ফিরে আসার পর থেকেই সিন্ডিকেটটি আরও বেপরোয়া হয়ে উঠেছে।

মাওলানা কুদ্দুসের এসব কর্মকাণ্ডে প্রধান সহযোগী হিসেবে কাজ করছেন বহরা গ্রামের বিদেশ ফেরত রুকন খান। তিনি নিজেকে ছাত্রদল নেতা হিসেবে পরিচয় দেন বলে জানা গেছে। স্থানীয়দের অভিযোগ, রুকন খান মাদক কারবার, চোরাচালান এবং নিরীহ মানুষকে মিথ্যা মামলায় জড়িয়ে হয়রানি করার সঙ্গে জড়িত। কুদ্দুসের দখলদারি ও চাঁদাবাজির বিরুদ্ধে কেউ প্রতিবাদ করলে রুকন ও তার সহযোগীরা সশস্ত্র হামলা, মামলা ও নির্যাতনের ভয় দেখান বলে অভিযোগ উঠেছে।

সম্প্রতি এই সিন্ডিকেটের কার্যক্রম নিয়ে ‘এইমাত্র’ পত্রিকায় একটি সংবাদ প্রকাশিত হলে কুদ্দুস-রুকন বাহিনী ক্ষিপ্ত হয়ে ওঠে। এরপর ওই প্রতিবেদক ও তার পরিবারের সদস্যদের বিভিন্ন মাধ্যমে হত্যার হুমকি দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। পাশাপাশি সাংবাদিককে চাঁদাবাজির মামলায় ফাঁসানোর ষড়যন্ত্রও চলছে বলে জানা গেছে।

অভিযোগের বিষয়ে জানতে মাওলানা কুদ্দুসের মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে সুলেমান শাহ নামের এক ব্যক্তি ফোন রিসিভ করেন। তিনি জানান, কুদ্দুস গত কয়েকদিন ধরে খুব পেরেশানির মধ্যে আছেন।

অন্যদিকে অভিযুক্ত ভূমি কর্মচারী বদরুল ইসলাম শামীম দাবি করেছেন, তিনি পুরো ভূমি অফিসের দায়িত্বে আছেন। তিনি মাওলানা কুদ্দুসকে চেনেন না বললেও পরে জানান, তিনি প্রায় দেড় বছর ধরে গোয়াইনঘাট ভূমি অফিসে কর্মরত। দুদকের কোনো অভিযান হয়নি বলেও তিনি দাবি করেন। তবে অনুসন্ধানে জানা গেছে, গত বছরের এপ্রিল মাসে ওই ভূমি অফিসে দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) একটি অভিযান পরিচালিত হয়েছিল।

জাফলং বাজার পর্যটন ব্যবসায়ী সমিতির নির্বাচিত সভাপতি হোসেন মিয়া অভিযোগ করেছেন, মাওলানা কুদ্দুস নামে এক ব্যক্তি নিজেকে ভুয়া সভাপতি পরিচয় দিয়ে পর্যটন স্পটে প্রভাব বিস্তার করছেন। তার দাবি, কুদ্দুস সরকারি (এনিমি) জমি দখল করে সেখানে অবৈধভাবে স্থাপনা নির্মাণ করেছেন।

হোসেন মিয়া আরও বলেন, সাবেক ইউএনও তৌহিদুল ইসলাম জাফলং ভিউ হোটেলের পাশের অবৈধ স্থাপনা ভাঙার নির্দেশ দিলেও কুদ্দুস তা মানেননি। পাশাপাশি তিনি মাদরাসার নাম ব্যবহার করে সিএনজি ও লেগুনাসহ বিভিন্ন যানবাহন থেকে টাকা তুলছেন, যা অত্যন্ত উদ্বেগজনক বলে মন্তব্য করেন তিনি। এ বিষয়ে প্রশাসনের তদন্ত দাবি করেছেন তিনি।

এদিকে সিলেট জেলা ছাত্রদলের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, ছাত্রদলের নাম ব্যবহার করে কেউ অপরাধ করলে প্রশাসন যেন কঠোর ব্যবস্থা নেয়। তারা স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, রুকন খান সংগঠনের কেউ নন।

এ বিষয়ে গোয়াইনঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মনিরুজ্জামান বলেন, সাংবাদিককে হত্যার হুমকির বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখা হচ্ছে। লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেলে দ্রুত আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রতন কুমার অধিকারী বলেন, সরকারি জমি দখল ও অবৈধ চাঁদাবাজির বিষয়ে প্রশাসন ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অনুসরণ করছে। আব্দুল কুদ্দুসের বিরুদ্ধে দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে বলেও তিনি জানান।

জাফলংয়ের শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং সরকারি সম্পদ রক্ষার জন্য জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর বিশেষ অভিযান দাবি করেছেন সচেতন মহল। তাদের মতে, পর্যটন কেন্দ্রটিকে কুদ্দুস–বদরুল–রুকন সিন্ডিকেটের হাত থেকে মুক্ত করাই এখন সাধারণ মানুষের প্রধান দাবি।

১৬২ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন
এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন














সর্বশেষ সব খবর
সারাদেশ নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন