মুক্তেশ্বরী নদীতে লাশ উদ্ধারের ঘটনায় দুই আসামি গ্রেপ্তার
সোমবার, ৯ নভেম্বর, ২০২৬ ১:৩৫ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
অসুস্থ স্ত্রীর চিকিৎসার খরচ জোগাতে জমি বিক্রি করেছিলেন যশোরের কেশবপুরের রঞ্জন মন্ডল (৬০)। তাঁর একমাত্র ছেলে থাকেন ভারতে। ছেলের বিয়ের জন্য ভালো পাত্রী পাওয়া গেছে—এমন কথা বলে পরিচিত পল্লী চিকিৎসকের চেম্বারে ডেকে নেওয়া হয় তাঁকে। পরে অসুস্থতার কথা বলে ইনজেকশন পুশ করে হত্যা করা হয়। এরপর স্বর্ণের চেইন ও আংটি ছিনিয়ে নিয়ে বস্তাবন্দি লাশ ফেলে দেওয়া হয় মুক্তেশ্বরী নদীতে। এ ঘটনায় অভিযুক্ত পল্লী চিকিৎসক মিঠুন ধরকে (৩২) ভারতে পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টাকালে আটক করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। তাঁকে পালাতে সহায়তার অভিযোগে আব্দুল হান্নান গাজী (৬৪) নামের আরও একজনকে আটক করা হয়েছে।
রোববার (৮ নভেম্বর) বিকেলে সাংবাদিকদের এসব তথ্য জানান সিআইডি যশোর জোনের বিশেষ পুলিশ সুপার মো. আনিচুর রহমান।
আটক মিঠুন ধর মনিরামপুর উপজেলার মহিষদিয়া মধ্যপাড়ার বিষ্ণুপদ ধরের ছেলে। অপর আটক আব্দুল হান্নান গাজী সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার দক্ষিণ ভাদিয়ালী গ্রামের মৃত আব্দুল জব্বার গাজীর ছেলে।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা সিআইডির উপপরিদর্শক (এসআই) দেলোয়ার হোসেন জানান, গত ৭ নভেম্বর সকালে মনিরামপুর উপজেলার মহিষদিয়া গ্রামের হেলারের ঘাট ব্রিজসংলগ্ন মুক্তেশ্বরী নদী থেকে বস্তাবন্দি অবস্থায় অজ্ঞাতপরিচয় এক ব্যক্তির লাশ উদ্ধার করেন স্থানীয় বাসিন্দারা। পরে স্বজনেরা লাশটি কেশবপুর উপজেলার কালিচরণপুর গ্রামের রঞ্জন মন্ডলের বলে শনাক্ত করেন। এ ঘটনায় নিহতের ভাইপো দেবাশীষ মন্ডল অজ্ঞাতনামা ব্যক্তিদের আসামি করে মনিরামপুর থানায় হত্যা মামলা করেন।
মামলার তদন্তে নেমে সিআইডি জানতে পারে, গত ৬ নভেম্বর সকালে পরিচিত পল্লী চিকিৎসক মিঠুন ধরের চেম্বারে যাওয়ার জন্য বাড়ি থেকে বের হয়েছিলেন রঞ্জন। ওই দিন দুপুরে কাটাখালী বাজারে মিঠুনের চেম্বারে প্রবেশের পর তাঁকে আর বের হতে দেখেননি কেউ। এরপর থেকে মিঠুনকেও খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। এতে হত্যাকাণ্ডে তাঁর সম্পৃক্ততার সন্দেহ তৈরি হয়।
তদন্তে পাওয়া তথ্যের বরাত দিয়ে এসআই দেলোয়ার হোসেন জানান, রঞ্জনের একমাত্র ছেলে অবিবাহিত এবং ভারতে থাকেন। তাঁর স্ত্রী গুরুতর অসুস্থ। স্ত্রীর চিকিৎসার ব্যয় মেটাতে রঞ্জন জমিও বিক্রি করেছিলেন। এই আর্থিক পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে অর্থনৈতিকভাবে লাভবান হওয়ার উদ্দেশ্যে তাঁকে হত্যার পরিকল্পনা করেন মিঠুন।
পরিকল্পনা অনুযায়ী, গত ৬ নভেম্বর সকাল ১০টার দিকে মুঠোফোনে রঞ্জনকে জানান, তাঁর ছেলের জন্য ভালো পাত্রী পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে কথা বলার জন্য তাঁকে নিজের চেম্বারে আসতে বলেন মিঠুন।
দুপুর ১২টার দিকে চেম্বারে পৌঁছালে অসুস্থতার কথা বলে রঞ্জনকে একটি ইনজেকশন পুশ করেন মিঠুন। এতে রঞ্জনের মৃত্যু হলে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন তিনি। এরপর লাশটি চেম্বারের ভেতরে রেখে বাইরে থেকে শাটার নামিয়ে দেন।
তদন্ত কর্মকর্তার ভাষ্য অনুযায়ী, শুক্রবার জুমার নামাজের পর বাজারে লোকজনের উপস্থিতি কমে গেলে মিঠুন চেম্বার থেকে লাশটি বের করেন। পরে বস্তাবন্দি করে নিজের মোটরসাইকেলে তুলে নিয়ে যাওয়ার সময় বস্তার মুখ খুলে যায়। এ সময় মোটরসাইকেল থামালে রঞ্জনের মুঠোফোনটি বাইরে পড়ে যায়। সেটি সেখানেই রেখে বস্তার মুখ আবার বেঁধে গন্তব্যের দিকে রওনা হন তিনি। পরে মহিষদিয়া গ্রামের হেলারের ঘাট ব্রিজসংলগ্ন একটি পরিত্যক্ত ঘরে লাশটি রেখে দেন।
এর আগে রঞ্জনের গলায় থাকা স্বর্ণের চেইন ও আঙুলের আংটি খুলে নিজের ওষুধের ব্যাগে রাখেন মিঠুন। রাতে লোকজনের চলাচল কমে গেলে পরিত্যক্ত ঘর থেকে লাশটি বের করে মুক্তেশ্বরী নদীতে ফেলে দেন। এরপর ভারতে পালিয়ে যাওয়ার উদ্দেশ্যে কলারোয়ার সীমান্তবর্তী দক্ষিণ ভাদিয়ালী গ্রামে আব্দুল হান্নান গাজীর বাড়িতে আশ্রয় নেন তিনি।
সিআইডি জানায়, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে রোববার সকাল ৬টার দিকে ওই বাড়িতে অভিযান চালিয়ে মিঠুন ধর ও আব্দুল হান্নান গাজীকে আটক করা হয়। পরে মিঠুনের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, তাঁর ওষুধের ব্যাগ থেকে রঞ্জনের স্বর্ণের চেইন ও আংটি উদ্ধার করা হয়। এ ছাড়া পথে পড়ে যাওয়া মুঠোফোন এবং লাশ বহনে ব্যবহৃত মোটরসাইকেলও উদ্ধার ও জব্দ করা হয়েছে।
এসআই দেলোয়ার হোসেন আরও জানান, হত্যাকাণ্ডের বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য মিঠুন ধরের পাঁচ দিনের রিমান্ড চেয়ে রোববার বিকেলে তাঁকে যশোরের আদালতে পাঠানো হয়েছে। অপর আটক আব্দুল হান্নান গাজীকেও আদালতের মাধ্যমে কারাগারে পাঠানো হয়েছে।
১১৪ বার পড়া হয়েছে