উৎপাদনে রেকর্ড, বিক্রির অভাবে মধ্যপাড়ায় জমেছে ১৫ লাখ টন পাথর
শনিবার, ৭ নভেম্বর, ২০২৬ ৭:৩৩ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
দিনাজপুরের পার্বতীপুরে দেশের একমাত্র ভূগর্ভস্থ কঠিন শিলা খনি মধ্যপাড়ায় পাথর উত্তোলনে একের পর এক রেকর্ড তৈরি হচ্ছে। প্রতিদিন প্রায় ৬ হাজার মেট্রিক টন এবং মাসে দেড় লাখ মেট্রিক টন পাথর উৎপাদনের সক্ষমতা অর্জন করেছে খনিটি। তবে উৎপাদন বাড়লেও বাড়ছে না বিক্রি। চাহিদার অভাবে খনির ইয়ার্ডে জমেছে প্রায় সাড়ে ১৫ লাখ মেট্রিক টন অবিক্রীত পাথর। এ পরিস্থিতিতে উৎপাদন কার্যক্রম বন্ধ হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। ঝুঁকিতে পড়তে পারে খনিতে কর্মরত প্রায় দুই হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থান।
দিনাজপুরের পার্বতীপুর উপজেলার মধ্যপাড়া কঠিন শিলা খনিতে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়লেও বিপণন সংকট কাটছে না। প্রতিদিন গড়ে সাড়ে ৫ থেকে ৬ হাজার মেট্রিক টন পাথর উত্তোলন করা হচ্ছে। মাসিক উৎপাদন পৌঁছেছে প্রায় দেড় লাখ মেট্রিক টনে। অথচ বাজারে পর্যাপ্ত চাহিদা না থাকায় উৎপাদিত পাথরের বড় অংশ অবিক্রীত থেকে যাচ্ছে। এতে খনির বিভিন্ন সংরক্ষণ ইয়ার্ডে পাথরের মজুদ ক্রমেই বাড়ছে।
১৯৭৩-৭৪ সালে বাংলাদেশ ভূতাত্ত্বিক জরিপ অধিদপ্তরের অনুসন্ধানে মধ্যপাড়া কঠিন শিলা খনির সন্ধান পাওয়া যায়। ১৯৯৪ সালের ২০ অক্টোবর পরীক্ষামূলকভাবে পাথর উত্তোলন শুরু হয়। এরপর ২০০৭ সালের ২৫ মে আনুষ্ঠানিকভাবে বাণিজ্যিক উৎপাদনে যায় খনিটি।
প্রথমদিকে কোরীয় প্রতিষ্ঠান নামনাম এবং পরবর্তী সময়ে নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় খনির কার্যক্রম পরিচালিত হয়। ২০১৪ সাল থেকে দীর্ঘমেয়াদি চুক্তির আওতায় জার্মান ও দেশীয় প্রতিষ্ঠানের যৌথ কনসোর্টিয়াম জার্মানিয়া-ট্রাস্ট কনসোর্টিয়াম (জিটিসি) খনি পরিচালনা ও পাথর উত্তোলনের দায়িত্ব পালন করছে।
জিটিসির ব্যবস্থাপনায় সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পাথর উত্তোলনে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি হয়েছে। আগে প্রতিদিন গড়ে ৩ থেকে সাড়ে ৩ হাজার মেট্রিক টন পাথর উত্তোলন করা হতো। বর্তমানে সেই পরিমাণ বেড়ে প্রায় ৬ হাজার মেট্রিক টনে পৌঁছেছে। কিন্তু উৎপাদনের সঙ্গে বিক্রির সামঞ্জস্য না থাকায় খনির ইয়ার্ডে জমেছে প্রায় সাড়ে ১৫ লাখ মেট্রিক টন পাথর।
খনির সংরক্ষণাগারগুলোতে স্টোন ডাস্ট, স্টোন চিপস, মিডিয়াম চিপস, রেলওয়ে ব্যালাস্ট ও বোল্ডারসহ বিভিন্ন ধরনের পাথরের বিশাল স্তূপ তৈরি হয়েছে। এর মধ্যে শুধু রেলওয়ে ব্যালাস্ট ও বোল্ডার শ্রেণির পাথরই জমে আছে প্রায় ১০ লাখ মেট্রিক টন।
সংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা বলছেন, দেশীয় বাজারে চাহিদার ঘাটতি, আমদানি করা পাথরের উপস্থিতি এবং বিপণনসংক্রান্ত জটিলতার কারণে মধ্যপাড়ার পাথর প্রত্যাশিত বাজার পাচ্ছে না। ফলে উৎপাদন সক্ষমতা বাড়লেও আর্থিক ও পরিচালনাগত চাপ বাড়ছে খনি কর্তৃপক্ষের ওপর।
শ্রমিক নেতা তৌহিদ হোসেন বলেন, আগে দৈনিক ৩ থেকে সাড়ে ৩ হাজার মেট্রিক টন পাথর উত্তোলন করা হলেও বর্তমানে তা বেড়ে প্রায় সাড়ে ৫ হাজার মেট্রিক টনে দাঁড়িয়েছে। উৎপাদন বাড়লে প্রতি টন পাথর উত্তোলনের খরচ কমে আসে। কিন্তু বিক্রি প্রত্যাশা অনুযায়ী না হওয়ায় পাথর ইয়ার্ডে জমে থাকছে। এতে সংরক্ষণের চাপ বাড়ার পাশাপাশি শ্রমিকদের ভবিষ্যৎ নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
চিশতিয়া এন্টারপ্রাইজের স্বত্বাধিকারী ও পাথর ব্যবসায়ী আবু বকর সিদ্দিক বলেন, উৎপাদন সক্ষমতা বাড়লেও বাজারে মধ্যপাড়ার পাথরের চাহিদা এবং বিক্রির গতি প্রত্যাশিত পর্যায়ে নেই। তবে হিলি স্থলবন্দরকেন্দ্রিক পাথর আমদানি ও ব্যবসার পরিস্থিতি নিয়ে সংশ্লিষ্টদের মধ্যে আশাবাদ রয়েছে।
দিনাজপুরের হিলি স্থলবন্দর সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি শাহিনুর ইসলাম বলেন, অন্যান্য স্থলবন্দরের তুলনায় হিলি বন্দর দিয়ে পাথর আমদানি অনেক বেশি ব্যয়বহুল। অতীতে এ বন্দর দিয়ে ভারত থেকে পাথর আমদানি করা হলেও বর্তমানে তা সম্পূর্ণ বন্ধ রয়েছে।
তিনি আরও বলেন, বর্তমান সরকারের নেওয়া কিছু পদক্ষেপের কারণে মধ্যপাড়ার পাথর বিক্রি কিছুটা বেড়েছে। আগামী দিনে বিক্রি আরও বাড়বে বলে তাঁরা আশাবাদী। কারণ, মধ্যপাড়া কঠিন শিলা প্রকল্পের পাথরের গুণগত মান ভারত থেকে আমদানি করা পাথরের চেয়েও উন্নত।
এদিকে খনি কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, চুক্তি অনুযায়ী উত্তোলনকারী ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে বছরে ১৫ লাখ মেট্রিক টন পাথর উত্তোলন করতে হয়। এ কারণে বাজারে বিক্রি কম হলেও উৎপাদন কার্যক্রম চালু রাখতে হচ্ছে। ফলে অবিক্রীত পাথরের মজুদ বাড়ছে।
খনি কর্তৃপক্ষের আশঙ্কা, এভাবে মজুদ বাড়তে থাকলে একপর্যায়ে পাথর উত্তোলন কার্যক্রম বন্ধ রাখার পরিস্থিতি তৈরি হতে পারে। এতে খনির উৎপাদন কার্যক্রমের পাশাপাশি কর্মরত প্রায় দুই হাজার শ্রমিকের কর্মসংস্থানও অনিশ্চয়তার মুখে পড়বে।
মধ্যপাড়া গ্রানাইট মাইনিং কোম্পানি লিমিটেডের মহাব্যবস্থাপক (প্রশাসন ও সেবা) সৈয়দ রফিজুল ইসলাম বলেন, চুক্তি অনুযায়ী নির্ধারিত পরিমাণ পাথর উত্তোলনের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু উৎপাদিত পাথর যথাসময়ে বিক্রি করা না গেলে মজুদের পরিমাণ বাড়তেই থাকবে। এ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে খনির উৎপাদন কার্যক্রম পরিচালনায় জটিলতা দেখা দিতে পারে।
সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা মনে করছেন, মধ্যপাড়ার পাথরের বাজার সম্প্রসারণে সরকারের সমন্বিত উদ্যোগ প্রয়োজন। দেশের বড় অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প, সড়ক নির্মাণ, রেলপথ উন্নয়ন এবং বিভিন্ন সরকারি নির্মাণকাজে এই পাথরের ব্যবহার বাড়ানো যেতে পারে।
পাশাপাশি সরকারি ক্রয়প্রক্রিয়ায় দেশীয় পাথরকে অগ্রাধিকার দেওয়া, প্রতিযোগিতামূলক দাম নির্ধারণ এবং কার্যকর বিপণনব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর গুরুত্ব দিচ্ছেন তাঁরা। পাথরের গুণগত মান ও ব্যবহারিক উপযোগিতা সম্পর্কে ক্রেতাদের ধারণা বাড়াতে প্রচার-প্রচারণার উদ্যোগ নেওয়ার কথাও বলছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
তাঁদের মতে, এসব উদ্যোগ বাস্তবায়ন করা গেলে একদিকে অবিক্রীত পাথরের মজুদ কমবে, অন্যদিকে বিদেশ থেকে পাথর আমদানির ওপর নির্ভরশীলতা কমিয়ে দেশের অর্থ দেশেই রাখা সম্ভব হবে।
সব মিলিয়ে মধ্যপাড়া কঠিন শিলা খনিতে উৎপাদনের সাফল্য এখন বিক্রির স্থবিরতায় বাধাগ্রস্ত হচ্ছে। ইয়ার্ডে জমে থাকা সাড়ে ১৫ লাখ মেট্রিক টন পাথর শুধু বিপণন সমস্যার চিত্র নয়, দেশের নিজস্ব প্রাকৃতিক সম্পদের যথাযথ ব্যবহারের ক্ষেত্রেও বড় চ্যালেঞ্জ। দ্রুত কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া না হলে উৎপাদন সক্ষমতা থাকা সত্ত্বেও খনির কার্যক্রম সংকটে পড়তে পারে। একই সঙ্গে অনিশ্চয়তা বাড়বে প্রায় দুই হাজার শ্রমিকের জীবন-জীবিকা নিয়ে।
১৫৬ বার পড়া হয়েছে