বাঘায় দুই কোটি টাকার নকল ফুড সাপ্লিমেন্ট জব্দ, পুড়িয়ে ধ্বংস
শনিবার, ৭ নভেম্বর, ২০২৬ ৬:৩৪ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
রাজশাহীর বাঘা উপজেলায় বিদেশি নামী প্রতিষ্ঠানের ব্র্যান্ড নকল করে ভেজাল ফুড সাপ্লিমেন্ট তৈরির একটি কারখানার সন্ধান পেয়েছে প্রশাসন। দীর্ঘদিন ধরে একটি ভাড়া বাড়িতে গোপনে চলছিল এই অবৈধ উৎপাদন কার্যক্রম। অভিযানে প্রায় দুই কোটি টাকা মূল্যের নকল পণ্য ও সরঞ্জাম জব্দ করা হয়েছে। পরে প্রায় দুই ট্রাক পণ্য আগুনে পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয়। এ ঘটনায় চার শ্রমিককে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে মোট এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়েছে। তবে কারখানার মূল মালিক ও অর্থের জোগানদাতারা এখনো ধরাছোঁয়ার বাইরে। পাশাপাশি পুলিশের নাম ভাঙিয়ে ৫০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগও উঠেছে।
রাজশাহীর বাঘা উপজেলার বাউসা ইউনিয়নের চক বাউসা গ্রামে বাঘা-আড়ানী সড়কের পাশে বাঘা ফায়ার সার্ভিসের কাছাকাছি একটি ভাড়া বাড়িতে গড়ে তোলা হয়েছিল নকল ফুড সাপ্লিমেন্ট তৈরির কারখানা। বাড়িটি বাইরে থেকে তালাবদ্ধ থাকায় ভেতরে কী ধরনের কর্মকাণ্ড চলত, তা স্থানীয় বাসিন্দাদের পক্ষে বোঝা সম্ভব ছিল না। একই ইউনিয়নের হেদাতীপাড়া গ্রামে আরেকটি বাড়ি ভাড়া নিয়ে তৈরি পণ্য বাজারজাত করার কার্যক্রম চালানো হতো।
গত বৃহস্পতিবার (৫ নভেম্বর) সন্ধ্যার পর স্থানীয় প্রশাসন, ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর ও পুলিশের সমন্বয়ে কারখানাটিতে অভিযান চালানো হয়। এ সময় বিপুল পরিমাণ নকল পণ্য, উৎপাদনের যন্ত্রপাতি ও বিভিন্ন সরঞ্জাম জব্দ করা হয়। পরে প্রায় দুই ট্রাক পণ্য ঘটনাস্থলেই আগুনে পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয়।
বৃহস্পতিবার রাতে অভিযানের সময় বাঘা উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) নুসরাত জাহান অনন্যার নেতৃত্বে প্রশাসনের কর্মকর্তারা কারখানাটির তালা খুলে ভেতরে প্রবেশ করেন। অভিযানে রাজশাহী ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের জেলা তত্ত্বাবধায়ক মেহেদী আফজাল এবং বাঘা থানা-পুলিশের সদস্যরা অংশ নেন।
সহকারী কমিশনার (ভূমি) জানান, জব্দ করা পণ্য ও সরঞ্জামের আনুমানিক বাজারমূল্য প্রায় দুই কোটি টাকা। এর মধ্যে প্রায় দুই ট্রাক পণ্য ঘটনাস্থলেই পুড়িয়ে ধ্বংস করা হয়েছে।
ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের কর্মকর্তা মেহেদী আফজাল জানান, চক্রটি যুক্তরাজ্য, জাপান, যুক্তরাষ্ট্র, দক্ষিণ কোরিয়া ও মালয়েশিয়াসহ বিভিন্ন দেশের প্রতিষ্ঠিত প্রতিষ্ঠানের ব্র্যান্ডের নাম ব্যবহার করে নকল ফুড সাপ্লিমেন্ট তৈরি করছিল। প্রতিটি প্যাকেটের বিক্রয়মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছিল দুই থেকে তিন হাজার টাকা।
কারখানায় পাওয়া 'কারকুমা' নামের একটি প্যাকেটে ২ হাজার ১৭০ টাকা, কোরিয়ান প্রতিষ্ঠানের নাম ব্যবহার করা একটি পণ্যে ২ হাজার ৩৯৯ টাকা এবং মালয়েশিয়ার নাম ব্যবহার করা আরেকটি পণ্যে ২ হাজার ২৯০ টাকা মূল্য লেখা ছিল।
পণ্যগুলো মূলত অনলাইনে বিক্রি করা হতো। ক্রেতাদের কাছে পাঠানোর জন্য কুরিয়ার সার্ভিসের উপযোগী করে তৈরি করা প্যাকেটও অভিযানে জব্দ করা হয়েছে।
মেহেদী আফজাল বলেন, বিষয়টি ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তরের আওতাভুক্ত হওয়ায় ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তর সরাসরি এ বিষয়ে মামলা করতে পারে না। এ ছাড়া অতিরিক্ত ওজনের কারণে ট্যাবলেট তৈরির একটি যন্ত্র কারখানা থেকে সরিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি। পরে সেটি অকেজো করে দেওয়া হয়।
এর আগে গত বুধবার (৪ নভেম্বর) সন্ধ্যায় ঢাকার বনানী থানা-পুলিশের একটি দল স্থানীয় প্রশাসনের সহযোগিতায় কারখানাটিতে অভিযান চালায়। এ সময় সাতজনকে আটক করা হয়। 'কারকুমা' নামের একটি পণ্যসংক্রান্ত অভিযোগের সূত্র ধরে সেখানে যায় পুলিশ। কারখানায় পাওয়া ওই পণ্যের সব প্যাকেট জব্দ করে নিয়ে যাওয়া হয়। পরে অভিযুক্ত দুজনকে নিজেদের হেফাজতে নেয় বনানী থানা-পুলিশ।
বনানী থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সালাউদ্দিন বলেন, জুলাই মাসের একটি মামলায় গোপন তথ্যের ভিত্তিতে বাঘায় অভিযান চালিয়ে দুজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। সেখানে নকল ফুড সাপ্লিমেন্ট তৈরির কারখানার সন্ধান পাওয়া যায়। মামলার অন্যান্য আলামতও সেখান থেকে জব্দ করা হয়েছে।
তবে আটক দুজনের নাম স্থানীয় প্রশাসনের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা নিশ্চিত করতে পারেননি। স্থানীয়ভাবে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, তাঁদের একজনের নাম মজিবর এবং অন্যজনের নাম সুমন। তাঁদের বাড়ি নাটোর এলাকায়।
অন্যদিকে, আটক বাকি সাতজনের মধ্যে পাঁচজন অপ্রাপ্তবয়স্ক হওয়ায় মুচলেকা নিয়ে ছেড়ে দেওয়া হয়। অপর চারজনকে ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে মোট এক লাখ টাকা জরিমানা করা হয়। ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ আইন, ২০০৯-এর ৪১ ধারায় এ জরিমানা করা হয়েছে।
জরিমানার রশিদে স্বাক্ষর করেন চারঘাট উপজেলার ভায়ালক্ষ্মীপুর গ্রামের আবু সৈয়দ হোসেনের ছেলে খালিদ হাসান। সাক্ষী হিসেবে স্বাক্ষর করেন নাটোরের বড়াইগ্রাম উপজেলার লক্ষ্মীকুল গ্রামের দুই শ্রমিক দিলু মিয়া ও হাসমত।
ভ্রাম্যমাণ আদালতের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ও উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) নুসরাত জাহান অনন্যা জানান, কারখানার মূল মালিককে ঘটনাস্থলে পাওয়া যায়নি। এ কারণে তাঁর বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া সম্ভব হয়নি।
তবে জরিমানার এক লাখ টাকা কে পরিশোধ করেছেন, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। সংশ্লিষ্ট কেউ এ বিষয়ে স্পষ্ট তথ্য দিতে পারেননি।
কারখানার অন্য শ্রমিকদের মধ্যে শাহাপরান, হৃদয়, সাইফুল, শাহাজালাল, মিলন ও শফিকুলের নাম জানা গেছে। স্থানীয় সূত্রের দাবি, তাঁদের সবার বাড়ি নাটোর এলাকায়।
কারখানাটির অবৈধ ব্যবসার সঙ্গে কয়েকজন প্রভাবশালী ব্যক্তি জড়িত থাকতে পারেন বলে স্থানীয়ভাবে আলোচনা রয়েছে। এ ছাড়া অভিযান ঘিরে ঘটনা আড়াল করার চেষ্টা এবং পুলিশের নাম ব্যবহার করে অর্থ আদায়ের অভিযোগও উঠেছে।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে একজন জানান, বুধবার রাতে পুলিশের নাম ভাঙিয়ে ৫০ হাজার টাকা আদায় করা হয়েছে। অভিযোগকারীর পরিচয় জানা গেলেও তাঁর সঙ্গে যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। তবে এ-সংক্রান্ত তথ্য সংরক্ষিত রয়েছে বলে জানা গেছে।
এ বিষয়ে বাঘা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) সেরাজুল হক বলেন, পুলিশের নাম ভাঙিয়ে টাকা নেওয়ার বিষয়টি তিনি শুনেছেন। অভিযোগটি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির খোঁজ নেওয়া হচ্ছে। তবে কোনো পুলিশ সদস্য এ অর্থ আদায়ের সঙ্গে জড়িত নন বলে দাবি করেন তিনি। এ ঘটনায় কেউ ভুক্তভোগী হয়ে মামলা করতে চাইলে পুলিশ তা গ্রহণ করবে।
স্থানীয় বাসিন্দাদের ভাষ্য, বাড়িটি বাইরে থেকে প্রায় সব সময় তালাবদ্ধ থাকত। ফলে সেখানে কী ধরনের কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে, তা তাঁদের জানা ছিল না। ধারণা করা হচ্ছে, বাড়ির পেছনের একটি দরজা দিয়ে লোকজন যাতায়াত করতেন।
অভিযানের সময় বাড়ির ভেতরে শোয়ার খাট, খাবারের থালাবাসন ও পানির নলকূপসহ বিভিন্ন জিনিস পাওয়া যায়। এসব দেখে ধারণা করা হচ্ছে, পণ্য উৎপাদনের পাশাপাশি শ্রমিকদের থাকার ব্যবস্থাও ছিল সেখানে।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বাড়িটির মালিক হায়দার আলী চাকরির কারণে ঢাকায় থাকেন। তাঁর ভাই শামীম ও মা রিনা বেগম জানান, প্রায় ছয় মাস আগে নাটোর এলাকার রেজাউল করিম মাসিক আট হাজার টাকা ভাড়ায় বাড়িটি নেন।
বাড়ি ভাড়া নেওয়ার সময় রেজাউল করিম 'নাটোর ভেষজ মার্ট' নামের একটি প্রতিষ্ঠানের ট্রেড লাইসেন্সের ফটোকপি জমা দিয়েছিলেন। তবে ওই লাইসেন্সের মেয়াদ ছিল ২০২৫ সালের ৫ মে পর্যন্ত।
লাইসেন্সের তথ্য অনুযায়ী, রেজাউল করিমের বাড়ি নাটোর সদর উপজেলার ৪ নম্বর লক্ষ্মীপুর-খোসাবাড়িয়া ইউনিয়নের খোসাবাড়িয়া গ্রামে। লাইসেন্সে উল্লেখ করা মুঠোফোন নম্বরটি বন্ধ থাকায় তাঁর বক্তব্য নেওয়া সম্ভব হয়নি।
মাত্র ২০০ টাকা ফি দিয়ে নেওয়া একটি ট্রেড লাইসেন্সের কাগজ ব্যবহার করে কীভাবে কোটি টাকার অবৈধ ব্যবসা পরিচালিত হয়েছে, তা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।
এ ছাড়া একই উপজেলার বাউসা ইউনিয়নের হেদাতীপাড়া গ্রামে পণ্য বাজারজাত করার উদ্দেশ্যে আরেকটি বাড়ি ভাড়া নেওয়া হয়েছিল। বাড়ির মালিক রেজাউলের বোন রোজিনা বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন। তিনি জানান, তাঁর ভাই ঢাকায় থাকেন। তবে বাড়ি ভাড়ার কোনো লিখিত চুক্তি করা হয়নি। বিকাশের মাধ্যমে ভাড়ার টাকা পরিশোধ করা হতো।
প্রায় দুই কোটি টাকা মূল্যের নকল পণ্য জব্দ, চার শ্রমিককে এক লাখ টাকা জরিমানা এবং পুলিশের নাম ব্যবহার করে অর্থ আদায়ের অভিযোগ—সব মিলিয়ে বাঘার এই অভিযান ঘিরে নানা প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
কারখানার মূল মালিক কারা, কারা এতে অর্থ বিনিয়োগ করেছেন এবং কীভাবে দীর্ঘদিন ধরে মেয়াদোত্তীর্ণ ট্রেড লাইসেন্সের কাগজ ব্যবহার করে এমন ব্যবসা পরিচালিত হয়েছে, সেসব প্রশ্নের উত্তর এখনো পাওয়া যায়নি। একই সঙ্গে জরিমানার এক লাখ টাকা কে দিয়েছেন এবং পুলিশের নাম ভাঙিয়ে ৫০ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগের তদন্ত কীভাবে হবে, তা নিয়েও স্পষ্ট কোনো তথ্য নেই।
এলাকাবাসীর দাবি, শুধু শ্রমিকদের আটক, জরিমানা এবং পণ্য ধ্বংস করে এ ধরনের অপরাধ বন্ধ করা সম্ভব নয়। এর পেছনে থাকা মূল হোতা, অর্থের জোগানদাতা ও বাজারজাতকরণ চক্রকে শনাক্ত করে আইনের আওতায় আনতে হবে।
পাশাপাশি অনলাইনে এসব পণ্য কারা কিনেছেন এবং দেশের কোথায় কোথায় সেগুলো সরবরাহ করা হয়েছে, তা খতিয়ে দেখার প্রয়োজন রয়েছে। অন্যথায় চক্রটি নতুন নাম ও ঠিকানা ব্যবহার করে আবারও একই অবৈধ ব্যবসা শুরু করতে পারে।
১১৬ বার পড়া হয়েছে