সর্বশেষ

জাতীয়

এনআইডি সংশোধনে জালিয়াতি ঠেকাতে কঠোর ইসি

স্টাফ রিপোর্টার
স্টাফ রিপোর্টার

বুধবার, ৪ নভেম্বর, ২০২৬ ৭:১০ অপরাহ্ন

শেয়ার করুন:
জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) সংশোধনের সুযোগ কাজে লাগিয়ে সম্পত্তি বিক্রি, উত্তরাধিকার দাবি ও পাসপোর্ট পরিবর্তনসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে জালিয়াতির অভিযোগ পাওয়ায় কঠোর অবস্থান নিয়েছে নির্বাচন কমিশন (ইসি)। আবেদন যাচাইয়ে প্রয়োজনীয় তথ্য ও নথিপত্র নিশ্চিত না হওয়া পর্যন্ত সংশোধনের অনুমোদন দিচ্ছে না কমিশন। জালিয়াতিতে জড়িতদের বিরুদ্ধে মামলা, গ্রেপ্তার এবং কর্মকর্তাদের চাকরিচ্যুত করার ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছেন ইসির কর্মকর্তারা।

প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এ এম এম নাসির উদ্দিন বলেন, এনআইডি সংশোধনে অনিয়মের অভিযোগে অনেক কর্মকর্তাকে চাকরিচ্যুত করা হয়েছে। তাঁদের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা করা হয়েছে এবং গ্রেপ্তারের ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে।

তিনি বলেন, ‘এই অভিযোগে আমাদের অনেক কর্মকর্তা চাকরিচ্যুত হয়েছেন। অনেকের বিরুদ্ধে আমরা ফৌজদারি মামলা করেছি। তাদের গ্রেপ্তারের ব্যবস্থাও করেছি। সুতরাং আমরা ছাড় দিচ্ছি না।’

সিইসি জানান, এনআইডিতে নাম পরিবর্তন করে সম্পত্তি বিক্রি, উত্তরাধিকারী বা ওয়ারিশ হিসেবে পরিচয় প্রতিষ্ঠা এবং জালিয়াতির মাধ্যমে পাসপোর্টের তথ্য পরিবর্তনের চেষ্টা হয়েছে। এ কারণে প্রতিটি আবেদন যাচাই-বাছাই না করে তাৎক্ষণিকভাবে অনুমোদন দেওয়া সম্ভব নয়।

জালিয়াতির অভিযোগে দুই কর্মকর্তা সাময়িক বরখাস্ত

ইসির কর্মকর্তারা জানান, এনআইডি জালিয়াতির অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ায় সম্প্রতি ঝালকাঠির কাঠালিয়া উপজেলা নির্বাচন কর্মকর্তা মো. আ. ছত্তারকে সাময়িকভাবে বরখাস্ত করা হয়েছে। একই অভিযোগে পঞ্চগড় সদর উপজেলার অফিস সহকারী কামনা রানী সরকারকেও সাময়িক বরখাস্ত করেছে কমিশন।

আবেদনে নানা অসংগতি

কর্মকর্তাদের ভাষ্য, এনআইডি সংশোধনের বিভিন্ন আবেদনে তথ্যগত অসংগতি দেখা যাচ্ছে। কোনো কোনো ক্ষেত্রে পিতা ও ছেলের বয়সের ব্যবধান মাত্র তিন বছর। আবার মা ও মেয়ের বয়সের ব্যবধান দুই থেকে তিন বছর। অনেক আবেদনকারীর একাধিক জন্মনিবন্ধন ও শিক্ষাগত সনদও রয়েছে।

এসব তথ্য যথাযথভাবে যাচাই না করে সংশোধন করা হলে ভুয়া পরিচয়ে এনআইডি সংগ্রহের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

সিইসি বলেন, ‘এমনও শোনা যায়, বিদেশি নাগরিক, রোহিঙ্গারা আমাদের নাগরিক হয়ে এনআইডি তৈরি করে ফেলে। এজন্য এগুলো যাচাই-বাছাই, তদন্ত ও পর্যালোচনা করা প্রয়োজন হয়।’

ইসি সচিবালয়ের সিনিয়র সচিব আখতার আহমেদ জানান, অনেক আবেদনকারী আগের নিবন্ধনের তথ্যের সঙ্গে সাংঘর্ষিক জন্মতারিখ সংশোধন করতে চান।

উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, একজন ব্যক্তি ১৯৯৭ সালে জন্মগ্রহণ করেছেন এবং ২০১৫ সালে ১৮ বছর বয়সে ভোটার হয়েছেন। পরে তিনি জন্মসাল ২০০২ করতে আবেদন করেছেন। এতে ভোটার নিবন্ধনের সময় তাঁর বয়স দাঁড়ায় ১৩ বছর। এমন আবেদন গ্রহণ করা সম্ভব নয়।

আখতার আহমেদ বলেন, অনেকে বিদেশে যাওয়ার সমস্যা কিংবা ব্যক্তিগত অসুবিধার কথা তুলে ধরে মানবিক বিবেচনায় সংশোধনের আবেদন করেন। কিন্তু যথাযথ যাচাই ছাড়া অনুমোদন দিলে কমিশনকেই জটিলতার মুখে পড়তে হয়।

কোন নথিপত্র যাচাই করা হয়

ইসি কর্মকর্তারা জানান, অধিকাংশ এনআইডি সংশোধন উপজেলা পর্যায়ে সম্পন্ন করা সম্ভব। তবে নাম, বাবা-মায়ের নাম, জন্মতারিখসহ একাধিক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য একসঙ্গে সংশোধনের আবেদন জটিল হলে তা উচ্চপর্যায়ে পাঠানো হয়। সেখানে জন্মনিবন্ধন, শিক্ষাগত সনদসহ অন্যান্য প্রাসঙ্গিক নথি যাচাই করা হয়।

পিতার নাম পরিবর্তনের ক্ষেত্রে তাঁর এনআইডি এবং পরিবারের অন্য সদস্যদের পরিচয়পত্রের তথ্য মিলিয়ে দেখা হয়। শুধু হলফনামার ভিত্তিতে সংশোধনের অনুমোদন দেওয়া হয় না।

সিইসি বলেন, ‘আপনি যদি আপনার নাম ও বাবার নাম পরিবর্তন করতে চান, তাহলে আমরা বলতে পারি আপনার অন্যান্য ভাই-বোনের এনআইডি নিয়ে আসেন। তাদের এনআইডিতে বাবার নাম কী আছে।’

সংশোধনের যথার্থতা নিশ্চিত করতেই এসব নথি ও তথ্য চাওয়া হয় বলে জানান তিনি।

ছয় মাসেও সংশোধন হয়নি এক আবেদন

এনআইডি সংশোধন করতে ইসিতে আসা যশোরের কেশপুরের হরিদাশ কর্মকার (ছদ্মনাম) জানান, ছয় মাস আগে তিনি তাঁর স্ত্রীর নাম সংশোধনের আবেদন করেন। তখন জানানো হয়, স্ত্রীর নামে দুটি জন্মনিবন্ধন রয়েছে। একটি বাতিল করে এলে সংশোধন করা হবে।

পরে একটি জন্মনিবন্ধন বাতিল করে ইসিতে যাওয়ার পর সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা জানান, নাম সংশোধনের জন্য স্ত্রীর ভাই-বোনদের প্রত্যয়নপত্র দিতে হবে। পাশাপাশি বায়োমেট্রিক তথ্যও দিতে হবে। আরও কিছু নথি চাওয়া হয়েছে, যা এখনো সংগ্রহ করতে পারেননি তিনি।

১৩ লাখ ৫৫ হাজার আবেদন বাতিল

ইসির জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের তথ্য অনুযায়ী, এখন পর্যন্ত এনআইডি সংশোধনের জন্য ৬৫ লাখ ৭০ হাজার ৮৪২টি আবেদন জমা পড়েছে। এর মধ্যে ৬৪ লাখ ৪২ হাজার ৮৩২টি আবেদন নিষ্পত্তি হয়েছে। বাতিল হয়েছে ১৩ লাখ ৫৫ হাজার ১৫৭টি আবেদন।

আবেদন বাতিলের কারণ সম্পর্কে সিইসি বলেন, প্রয়োজনীয় তথ্য ও জন্মসনদ না থাকা অন্যতম কারণ। অনেকের একাধিক জন্মসনদ, এসএসসি বা স্নাতকের সনদ থাকায় কোন নথির ভিত্তিতে সংশোধন করা হবে, তা নির্ধারণ করাও কঠিন হয়ে পড়ে।

তিনি জানান, আবেদন বাতিল হলেও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র সংগ্রহ করে আবার আবেদন করা যায়। যথাযথ তদন্ত, তথ্য-প্রমাণ যাচাই ও নিশ্চিত না হয়ে কোনো আবেদন বাতিল করা হয় না।

আখতার আহমেদ বলেন, বাতিলের সংখ্যা মানেই এতজন পৃথক আবেদনকারী নন। একজন ব্যক্তি চার-পাঁচবার আবেদন করতে পারেন। একই আবেদনে একাধিক তথ্য সংশোধনের অনুরোধ থাকলে একটি তথ্য সংশোধন হলেও অন্যগুলো বাতিল হতে পারে।

তিনি আরও জানান, উপজেলা থেকে মহাপরিচালক পর্যায়ে আবেদন বাতিল হওয়ার পরও সচিব পর্যায়ে আপিলের সুযোগ রয়েছে। কোনো কোনো আবেদন ছয়-সাতবার পর্যন্ত বাতিল হয়েছে। তাই বাতিলের মোট সংখ্যা দিয়ে প্রকৃত আবেদনকারীর সংখ্যা নির্ধারণ করা যায় না।

প্রবাসীদের এনআইডি সেবা সহজ করার উদ্যোগ

প্রবাসীদের এনআইডি সংশোধন ও অন্যান্য সেবা সহজ এবং দ্রুত করার চেষ্টা চলছে বলে জানিয়েছেন ইসি কর্মকর্তারা। যাঁদের নথিপত্র সঠিক, তাঁদের আবেদন দ্রুত নিষ্পত্তির উদ্যোগ নেওয়া হবে।

সিইসি বলেন, ‘আমরা অনেকগুলো দূতাবাসে প্রবাসীদের ভোটার নিবন্ধন ও এনআইডি সেবা চালু করেছি।’

তিনি জানান, অনেক প্রবাসী সঠিক পাসপোর্ট নিয়ে বিদেশে যাননি কিংবা দালালের মাধ্যমে গিয়েছেন। এসব ক্ষেত্রে তথ্য যাচাই করা জরুরি। সৌদি আরবে অনেক রোহিঙ্গা বাংলাদেশি পাসপোর্ট নিয়ে কাজ করছেন বলেও প্রতিবেদন পাওয়া যাচ্ছে।

সিইসি আরও বলেন, ‘যদি সব তথ্য ঠিক থাকে, আমরা অবশ্যই দ্রুত সময়ে প্রবাসীদের বিষয়টি সমাধানের চেষ্টা করব। কারণ প্রবাসীরা দেশের লাইফলাইন বলতে পারেন। তাদের রেমিট্যান্সের ওপরই দেশের অর্থনীতি টিকে আছে। তাদেরকে ভিআইপি মর্যাদায় কাজটা করে দেওয়ার চেষ্টা করব।’

আখতার আহমেদ বলেন, অনেকে আগে এনআইডি করলেও পরে জন্মনিবন্ধন সনদ দিয়ে পাসপোর্ট তৈরি করেন। এতে তথ্যে অমিল দেখা দেয়। জন্মনিবন্ধন তৈরির সময় এনআইডির তথ্যের সঙ্গে মিল রাখলে এ ধরনের সমস্যা এড়ানো সম্ভব।

তিনি আরও বলেন, মধ্যপ্রাচ্যসহ বিভিন্ন দেশে কাজের ক্ষেত্রে বয়সের শর্ত থাকায় অনেকে জন্মতারিখ ও অন্যান্য তথ্য পরিবর্তন করেন। পরে জটিলতায় পড়ে বাবা বা মায়ের নাম সংশোধনের আবেদনও করেন।

কোন সংশোধন সহজ, কোনটি জটিল

ইসির লক্ষ্য, নাগরিকেরা ভোটার নিবন্ধনের সময় সঠিক তথ্য দেবেন, যাতে পরবর্তী সময়ে সংশোধনের প্রয়োজন না হয়। তবে স্থানান্তরের কারণে ঠিকানা পরিবর্তন, বিয়ে বা বিবাহবিচ্ছেদের ফলে বৈবাহিক অবস্থা সংশোধন এবং ধর্ম পরিবর্তনের ক্ষেত্রে নির্ধারিত পদ্ধতি অনুসরণ করে সংশোধনের সুযোগ রয়েছে।

জাতীয় পরিচয় নিবন্ধন অনুবিভাগের পরিচালক (অপারেশন্স) মো. সাইফুল ইসলাম বলেন, নাম, বাবা-মায়ের পরিচয় কিংবা জন্মতারিখের মতো মৌলিক তথ্য সংশোধনের ক্ষেত্রে প্রয়োজনীয় তথ্য-প্রমাণ যাচাই করা জরুরি।

১৩৫ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০















সর্বশেষ সব খবর
জাতীয় নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

২৫০ x ২৫০


বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০