সর্বশেষ

সারাদেশ

৫০ বছর পর ফিরে এলো চক্রের কবলে পড়ে হারিয়ে যাওয়া পরী

আবিদ জামান, ফরিদপুর
আবিদ জামান, ফরিদপুর

বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬ ৮:০৫ অপরাহ্ন

শেয়ার করুন:
মাত্র ১০ বছর বয়সে পরিবারের কাছ থেকে হারিয়ে গিয়েছিলেন পরী বেগম। মানব পাচারকারী চক্রের কবলে পড়ে ভারত হয়ে পৌঁছেছিলেন পাকিস্তানে। সেখানে কেটে গেছে জীবনের দীর্ঘ ৫০ বছর। গড়ে উঠেছে সংসার, জন্ম হয়েছে এক ছেলে ও এক মেয়ের। তবু শৈশবে ফেলে আসা পরিবার ও জন্মভূমির স্মৃতি ভোলেননি তিনি। অবশেষে ৬০ বছর বয়সে পাকিস্তান থেকে বাংলাদেশে ফিরে ফরিদপুরের নগরকান্দায় ভাইদের সঙ্গে পুনর্মিলিত হয়েছেন পরী বেগম। দীর্ঘদিন উর্দুভাষী পরিবেশে থাকায় এখন আর সাবলীলভাবে বাংলা বলতে পারেন না তিনি। তবে ভাষার ব্যবধান ছাপিয়ে স্বজনদের ফিরে পাওয়ার আনন্দে আবেগাপ্লুত পুরো পরিবার।

মাত্র ১০ বছর বয়সে পরিবারের কাছ থেকে হারিয়ে গিয়েছিলেন পরী বেগম। এরপর মানব পাচারকারী চক্রের মাধ্যমে ভারত হয়ে চলে যান পাকিস্তানে। সেখানেই কেটে যায় জীবনের পাঁচ দশক। নতুন দেশে গড়ে ওঠে সংসার, জন্ম হয় দুই সন্তানের। কিন্তু দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও শৈশবের স্মৃতি আর জন্মভূমিতে ফেলে আসা স্বজনদের ভুলতে পারেননি তিনি। অবশেষে ৫০ বছর পর পরিবারের সন্ধান পেয়ে ৬০ বছর বয়সে বাংলাদেশে ফিরেছেন পরী বেগম। ফিরে পেয়েছেন ভাইদের।

পরী বেগমের পৈতৃক বাড়ি ফরিদপুরের নগরকান্দা পৌরসভার ২ নম্বর ওয়ার্ডে। তাঁর বাবার নাম মমিন মাতুব্বর। পরিবারের সদস্যদের ভাষ্য অনুযায়ী, প্রায় ৫০ বছর আগে মাত্র ১০ বছর বয়সে নিখোঁজ হন পরী। পরে মানব পাচারকারী চক্রের মাধ্যমে তাঁকে প্রথমে ভারতে এবং সেখান থেকে পাকিস্তানে নিয়ে যাওয়া হয়।

পরিবারের সদস্যরা জানান, পাকিস্তানে কয়েক দফা হাতবদলের পর নিঃসন্তান এক দম্পতির আশ্রয়ে যান পরী। ওই দম্পতি তাঁকে নিজেদের সন্তানের মতো করে বড় করেন। পরবর্তী সময়ে পাকিস্তানের এক নাগরিকের সঙ্গে তাঁর বিয়ে হয়। তাঁদের সংসারে এক ছেলে ও এক মেয়ের জন্ম হয়।

এভাবেই নতুন দেশ, নতুন পরিবার ও সংসারের ব্যস্ততায় কেটে যায় দীর্ঘ পাঁচ দশক। কিন্তু বাবা-মা ও ভাইদের স্মৃতি মনের মধ্যে ধরে রেখেছিলেন পরী। দীর্ঘদিন ধরে বিচ্ছিন্ন থাকায় একসময় পরিবারের সদস্যরাও হয়তো তাঁকে আর ফিরে পাবেন না বলে ধরে নিয়েছিলেন।

পরী বেগমের পরিবারের সন্ধান পাওয়ার পেছনে ভূমিকা রেখেছেন পাকিস্তানে পড়তে যাওয়া বাংলাদেশের দুই যুবক। তাঁদের বাড়ি রাজশাহীতে। পরিবারের সদস্যদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, পাকিস্তানের একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়নরত ওই দুই যুবকের সঙ্গে পরিচয় হয় পরীর নাতির। কথোপকথনের একপর্যায়ে তিনি তাঁর দাদির বাংলাদেশে হারিয়ে যাওয়া পরিবারের কথা জানান।

বিষয়টি জানার পর ওই দুই যুবক পরী বেগমের সঙ্গে দেখা করেন। তাঁর কাছ থেকে বাংলাদেশের বাড়ির ঠিকানা ও পরিবারের পরিচয় জানার চেষ্টা করেন তাঁরা।

পরী বেগম জানান, তাঁর বাড়ি ফরিদপুরের নগরকান্দায়। বাবার নাম মমিন মাতুব্বর। তাঁর বড় ভাই নওশের আলী মাতুব্বর, মেজ ভাই সাইফুল মাতুব্বর এবং ছোট ভাই সোলেমান মাতুব্বর।

এই নাম ও ঠিকানার সূত্র ধরে বাংলাদেশে তাঁর স্বজনদের খুঁজতে শুরু করেন ওই দুই যুবক। একপর্যায়ে নগরকান্দায় পরী বেগমের পরিবারের সন্ধান পান তাঁরা। এরপর দীর্ঘ ৫০ বছর বিচ্ছিন্ন থাকার পর মোবাইল ফোনে যোগাযোগ হয় ভাই-বোনের।

ফোনে পরিচয় নিশ্চিত হওয়ার পর শুরু হয় সরাসরি দেখা করার অপেক্ষা। অবশেষে পাকিস্তানি পাসপোর্ট নিয়ে বাংলাদেশে আসেন পরী বেগম। দীর্ঘ পাঁচ দশক পর ভাইদের সঙ্গে তাঁর দেখা হয়।

পাকিস্তানে দীর্ঘদিন বসবাস করার কারণে বাংলা ভাষায় কথা বলার অভ্যাস প্রায় হারিয়ে ফেলেছেন পরী বেগম। নিজের ভাইদের সামনে বসেও বাংলায় মনের কথা প্রকাশ করতে পারছেন না। কথা বলছেন উর্দুতে। দেশে ফিরে গণমাধ্যমের কাছেও উর্দু ভাষায় নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা ও স্বজনদের ফিরে পাওয়ার অনুভূতি তুলে ধরেছেন তিনি।

ভাইয়েরা তাঁর সব কথা বুঝতে না পারলেও আবেগের ভাষা বুঝতে পারছেন। দীর্ঘদিন পর হারিয়ে যাওয়া বোনকে কাছে পেয়ে আনন্দে আত্মহারা পরিবারের সদস্যরা। তাঁদের কাছে এটি যেন অবিশ্বাস্য এক প্রাপ্তি।

সময়ের ব্যবধানে বদলে গেছে সবার চেহারা। বয়সের ছাপ পড়েছে মুখে, বদলে গেছে পরিচিত পরিবেশও। তবু ভাই-বোনের সম্পর্কের টান আর ভালোবাসা রয়ে গেছে আগের মতোই। ভাষার পার্থক্য তাঁদের পুনর্মিলনের আনন্দকে ম্লান করতে পারেনি।

পরী বেগমের ফিরে আসার খবরে নগরকান্দায় তাঁর পৈতৃক বাড়িতে আনন্দের পরিবেশ তৈরি হয়েছে। আত্মীয়স্বজনের পাশাপাশি প্রতিবেশীরাও তাঁকে একনজর দেখতে বাড়িতে ভিড় করছেন। কেউ জানতে চাইছেন কীভাবে হারিয়ে গিয়েছিলেন তিনি, কেউ শুনছেন পাকিস্তানে কাটানো জীবনের গল্প।

পরিবারের সদস্যরা জানান, দীর্ঘদিন পর পরী বেগমকে ফিরে পাওয়ার আনন্দে মসজিদে দোয়া মাহফিলের আয়োজন করা হয়েছে। হারিয়ে যাওয়া বোনকে ফিরে পেয়ে পুরো পরিবারে এখন উৎসবের আমেজ।

পরীর ভাই সাইফুল ইসলাম বলেন, ‘পরী আপা হারিয়ে গেছিল। ৫০ বছর পর তাকে ফিরে পেয়ে আমরা অত্যন্ত খুশি।’

মাত্র ১০ বছর বয়সে যে মেয়েটি পরিবারের কাছ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে অচেনা দেশে চলে গিয়েছিলেন, জীবনের ৫০ বছর পর সেই পরী বেগম ফিরে এসেছেন নিজের শেকড়ে। এর মধ্যে বদলে গেছে তাঁর জীবন, ভাষা ও চারপাশের পরিবেশ। কিন্তু মুছে যায়নি জন্মভূমি ও স্বজনদের স্মৃতি।

পরী বেগমের এই ফিরে আসা শুধু একটি পরিবারের পুনর্মিলন নয়; এটি শেকড়ের প্রতি টান, স্বজনদের প্রতি ভালোবাসা এবং দীর্ঘ বিচ্ছেদের পর হারিয়ে যাওয়া সম্পর্ক ফিরে পাওয়ার এক আবেগঘন ঘটনা।

১২৬ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০















সর্বশেষ সব খবর
সারাদেশ নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

২৫০ x ২৫০


বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০