সর্বশেষ

মতামত

আওয়ামী লীগ ও বিএনপি: মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ, নাকি পরিবর্তনের সম্ভাবনা?

এম এ মতিন
এম এ মতিন

বুধবার, ১৪ অক্টোবর, ২০২৬ ৮:২৬ অপরাহ্ন

শেয়ার করুন:
বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দীর্ঘদিন ধরে প্রধান দুই রাজনৈতিক শক্তি। দুই দলের শাসনামলে যেমন উন্নয়ন ও সাফল্যের দৃষ্টান্ত রয়েছে, তেমনি রয়েছে দুর্নীতি, রাজনৈতিক অধিকার ও জবাবদিহি নিয়ে নানা বিতর্ক। আওয়ামী লীগের দীর্ঘ ১৫ বছরের শাসনের সঙ্গে বিএনপির বর্তমান শাসনকাল তুলনা করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানোর আগে সময়ের পার্থক্য, শাসনপ্রক্রিয়া ও প্রাতিষ্ঠানিক পরিবর্তন বিবেচনায় নেওয়া জরুরি। প্রশ্ন হলো, বিএনপি কি আওয়ামী লীগের শাসনধারার পুনরাবৃত্তি করছে, নাকি রাষ্ট্র পরিচালনায় নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতি প্রতিষ্ঠার সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে?

বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি দীর্ঘদিন ধরে প্রধান দুই শক্তি। স্বাধীনতার পর দুই দলই রাষ্ট্র পরিচালনা করেছে। দুই দলেরই সাফল্য আছে। আছে ব্যর্থতাও। কিন্তু একটি প্রশ্ন এখন গুরুত্বপূর্ণ: বিএনপি কি আওয়ামী লীগের শাসনধারাই অনুসরণ করছে, নাকি দেশ পরিচালনায় নতুন কোনো পথ তৈরি করছে?

প্রশ্নটির উত্তর দিতে আবেগের চেয়ে তথ্য জরুরি। রাজনৈতিক পছন্দের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ শাসনের ধরন। আর কোনো দলের প্রতিশ্রুতির চেয়ে বড় বিষয় হলো, ক্ষমতায় গিয়ে দলটি কী করছে।

দুই দলের শাসনকাল এক নয়। আওয়ামী লীগ ২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত টানা পনেরো বছরের বেশি সময় ক্ষমতায় ছিল। এই দীর্ঘ সময়ে দলটির নীতি, প্রশাসনিক আচরণ, অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত এবং গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর প্রভাব মূল্যায়নের যথেষ্ট সুযোগ তৈরি হয়েছে। অন্যদিকে, বিএনপির বর্তমান শাসনকাল মাত্র সাত-আট মাসের হলে তার সঙ্গে আওয়ামী লীগের পনেরো বছরের শাসনের সরাসরি তুলনা করা কঠিন। সময়ের এই পার্থক্য উপেক্ষা করলে বিশ্লেষণ দুর্বল হবে।

তবে সময় কম বলে নতুন সরকার সমালোচনার ঊর্ধ্বে থাকবে, এমন নয়। বরং ক্ষমতায় আসার প্রথম কয়েক মাসেই বোঝা যায়, সরকার কোন পথে হাঁটতে চায়। প্রশাসনকে দলীয় প্রভাবমুক্ত করার উদ্যোগ আছে কি না, বিরোধী মতের প্রতি আচরণ কেমন, দুর্নীতির বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে কি না এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে কতটা স্বাধীনভাবে কাজ করতে দেওয়া হচ্ছে—এসব প্রশ্নের উত্তর শুরুতেই খোঁজা যায়। চূড়ান্ত সিদ্ধান্তের জন্য সময় প্রয়োজন। কিন্তু প্রাথমিক মূল্যায়নের জন্য পনেরো বছর অপেক্ষা করতে হয় না।

আওয়ামী লীগের দীর্ঘ শাসনামলে অবকাঠামো উন্নয়নের বেশ কিছু দৃশ্যমান উদাহরণ তৈরি হয়েছে। পদ্মা সেতু, মেট্রোরেল এবং বড় বড় প্রকল্প তার উল্লেখযোগ্য দৃষ্টান্ত। কিন্তু উন্নয়ন শুধু সেতু, সড়ক কিংবা বিদ্যুৎকেন্দ্রের হিসাব নয়। উন্নয়নের আরেকটি মাপকাঠি হলো মানুষের ভোটাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, আইনের শাসন এবং অর্থনৈতিক নিরাপত্তা।

২০০৯ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত আওয়ামী লীগ সরকারের বিরুদ্ধে নির্বাচনব্যবস্থার বিশ্বাসযোগ্যতা নষ্ট করা, বিরোধী রাজনীতি দমন, গুম, বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ড, গণমাধ্যমের স্বাধীনতা সংকুচিত করা, ব্যাংকিং খাতে অনিয়ম এবং অর্থ পাচারের গুরুতর অভিযোগ উঠেছে। ২০১৪, ২০১৮ ও ২০২৪ সালের নির্বাচন নিয়ে বিতর্কও এই প্রশ্নকে সামনে এনেছে। ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে সরকারের পতন ঘটে। ফলে আওয়ামী লীগের শাসন মূল্যায়নের সময় অবকাঠামোগত উন্নয়নের পাশাপাশি গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোর ক্ষয়ও বিবেচনায় নিতে হবে।

বিএনপির অতীতও সমালোচনার বাইরে নয়। ২০০১ থেকে ২০০৬ সালের শাসনামলে দুর্নীতি, রাজনৈতিক সহিংসতা এবং উগ্র জঙ্গিবাদের উত্থান নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছিল। হাওয়া ভবনকেন্দ্রিক প্রভাব বিস্তারের অভিযোগ তখন রাজনৈতিক আলোচনার বড় বিষয় ছিল। ২০০৪ সালের ২১ আগস্টের গ্রেনেড হামলা এবং ২০০৬ সালে ক্ষমতা হস্তান্তর ঘিরে সংকটও বিএনপির রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের অংশ। এসব ঘটনা মনে করিয়ে দেয়, আওয়ামী লীগের ব্যর্থতার সমালোচনা করলেই বিএনপির অতীত মুছে যায় না।

দুই দলের আদর্শিক পরিচয়ে পার্থক্য আছে। আওয়ামী লীগ ঐতিহাসিকভাবে বাঙালি জাতীয়তাবাদ ও ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বলেছে। বিএনপি বাংলাদেশি জাতীয়তাবাদ, ধর্মীয় মূল্যবোধ এবং মুক্তবাজার অর্থনীতির ওপর জোর দিয়েছে। অর্থনৈতিক নীতিতেও দুই দলের অগ্রাধিকারে কিছু পার্থক্য দেখা গেছে। আওয়ামী লীগ বড় অবকাঠামো ও রাষ্ট্রীয় বিনিয়োগকে গুরুত্ব দিয়েছে। বিএনপি বেসরকারি খাত, বাজারভিত্তিক অর্থনীতি এবং গ্রামীণ উন্নয়নের কথা বলেছে।

কিন্তু আদর্শের পার্থক্য আর শাসনের পার্থক্য এক বিষয় নয়। কোনো দল ধর্মনিরপেক্ষতার কথা বললেই তার শাসন স্বয়ংক্রিয়ভাবে গণতান্ত্রিক হয় না। একইভাবে জাতীয়তাবাদ কিংবা মুক্তবাজার অর্থনীতির কথা বললেই কোনো সরকার জবাবদিহিমূলক হয়ে ওঠে না। শেষ পর্যন্ত বিচার করতে হবে ক্ষমতার ব্যবহার দিয়ে। সরকার সমালোচনা সহ্য করছে কি না, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে রাজনৈতিক কাজে ব্যবহার করা হচ্ছে কি না, দুর্নীতির বিচার দলীয় পরিচয় ছাড়াই হচ্ছে কি না—এসব প্রশ্নই আসল।

এখানেই বিএনপির জন্য বড় পরীক্ষা। আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে যেসব অভিযোগ ছিল, সেগুলোর পুনরাবৃত্তি না করাই যথেষ্ট নয়। বিএনপিকে দেখাতে হবে, তারা ভিন্নভাবে রাষ্ট্র পরিচালনা করতে পারে। প্রশাসনে দলীয় নিয়োগ ও প্রভাব কমাতে হবে। বিরোধী দলের রাজনৈতিক অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। দুর্নীতির অভিযোগে নিজের দলের নেতাদের বিরুদ্ধেও নিরপেক্ষ ব্যবস্থা নিতে হবে। বিচার বিভাগ, নির্বাচনব্যবস্থা এবং গণমাধ্যমকে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ দিতে হবে।

দ্রব্যমূল্য নিয়ন্ত্রণ, কর্মসংস্থান সৃষ্টি, বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং আইনশৃঙ্খলার উন্নতি অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ। সাধারণ মানুষ এসব ফলাফল দ্রুত দেখতে চায়। কিন্তু অর্থনৈতিক সমস্যার সব দায় নতুন সরকারের ওপর চাপানো যেমন ঠিক নয়, তেমনি আগের সরকারের উত্তরাধিকার দেখিয়ে সব ব্যর্থতার দায় এড়ানোও গ্রহণযোগ্য নয়। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, ব্যাংকিং খাতের দুর্বলতা, বৈদেশিক মুদ্রার চাপ এবং প্রশাসনিক জটিলতা কাটাতে সময় লাগতে পারে। তবু সরকারকে জানাতে হবে, সমস্যাগুলো সমাধানে কী পদক্ষেপ নেওয়া হচ্ছে এবং তার ফল কতটা পাওয়া যাচ্ছে।

এ ক্ষেত্রে সরকারের বক্তব্যের পাশাপাশি স্বাধীন মূল্যায়ন জরুরি। সরকারি পরিসংখ্যান, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, গণমাধ্যম, নিরীক্ষা প্রতিবেদন এবং বিচারিক অনুসন্ধান থেকে তথ্য নিয়ে শাসনের ফলাফল বিচার করতে হবে। শুধু বিরোধী দলের অভিযোগ কিংবা সরকারি দলের আত্মপ্রশংসা দিয়ে কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছানো যায় না। একই সূচকে দুই সরকারের কার্যক্রম তুলনা করতে হবে। নির্বাচনের বিশ্বাসযোগ্যতা, মানবাধিকার, দুর্নীতি, মূল্যস্ফীতি, কর্মসংস্থান, বিনিয়োগ এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বাধীনতা—প্রতিটি ক্ষেত্রের আলাদা হিসাব থাকা দরকার।

তবে একটি বিষয় মনে রাখা প্রয়োজন। সরকার বদলালেই রাষ্ট্রের চরিত্র বদলে যায় না। দীর্ঘদিন ধরে গড়ে ওঠা প্রশাসনিক সংস্কৃতি, রাজনৈতিক পৃষ্ঠপোষকতা, দুর্নীতির নেটওয়ার্ক এবং ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করার প্রবণতা নতুন সরকারের মধ্যেও কাজ করতে পারে। কোনো দল বিরোধী দলে থাকাকালে যে সংস্কারের কথা বলে, ক্ষমতায় গিয়ে সেই সংস্কার বাস্তবায়ন করাই তার রাজনৈতিক সততার পরীক্ষা।

তাহলে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি কি মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ? এখনই চূড়ান্ত রায় দেওয়া ঠিক হবে না। দুই দলের ইতিহাসে আদর্শিক ও নীতিগত পার্থক্য আছে। আবার ক্ষমতা পরিচালনায় কিছু উদ্বেগজনক মিলও দেখা গেছে। বিশেষ করে দলীয় প্রভাব, রাজনৈতিক প্রতিপক্ষের সঙ্গে আচরণ এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠার প্রবণতা দুই দলকেই প্রশ্নের মুখে ফেলেছে। এই মিলগুলো উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। আবার সময় ও তথ্যের পার্থক্য উপেক্ষা করে দুই শাসনকালকে পুরোপুরি এক বলাও যুক্তিসংগত নয়।

বাংলাদেশের মানুষ শুধু একটি দলের বদলে আরেকটি দলকে ক্ষমতায় দেখতে চায় না। তারা চায় রাষ্ট্র পরিচালনার ধরনে পরিবর্তন। তারা এমন সরকার চায়, যে সরকারকে প্রশ্ন করা যাবে; যে সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ উঠলে তদন্ত হবে; যে সরকার নির্বাচনে জিতলেও রাষ্ট্রকে দলের সম্পত্তি মনে করবে না। এই প্রত্যাশা আওয়ামী লীগ ও বিএনপি—দুই দলের ক্ষেত্রেই সমানভাবে প্রযোজ্য।

বিএনপির সামনে এখন সুযোগ আছে। তারা চাইলে অতীতের ভুল থেকে শিক্ষা নিয়ে নতুন রাজনৈতিক সংস্কৃতির সূচনা করতে পারে। আর যদি ক্ষমতাকে দলীয় স্বার্থে ব্যবহার করে, বিরোধী মতকে দুর্বল করে এবং জবাবদিহি এড়িয়ে চলে, তাহলে তাদের পরিবর্তনের প্রতিশ্রুতিও প্রশ্নবিদ্ধ হবে।

শেষ পর্যন্ত ইতিহাস কোনো দলের ঘোষণাপত্র দিয়ে রায় দেয় না। রায় দেয় তার কাজ, সিদ্ধান্ত এবং মানুষের জীবনে তার প্রভাব দেখে। আওয়ামী লীগ কী করেছে, তার বিচার হবে দীর্ঘ শাসনের রেকর্ডে। বিএনপি কী করছে, তার বিচার হবে বর্তমান কাজের পাশাপাশি ভবিষ্যৎ রেকর্ডে। কিন্তু উভয় দলের জন্য মাপকাঠি একই হওয়া উচিত—গণতন্ত্র, সুশাসন, জবাবদিহি এবং জনগণের কল্যাণ।

কারণ বাংলাদেশের মানুষের প্রয়োজন শুধু ক্ষমতার পালাবদল নয়; প্রয়োজন শাসনব্যবস্থার পরিবর্তন। সেই পরিবর্তন যদি না আসে, তাহলে দলের নাম বদলাবে, ক্ষমতার মুখ বদলাবে, কিন্তু রাষ্ট্রের পুরোনো সমস্যাগুলো থেকেই যাবে।

পরিশেষে বলি, যারা বলছেন, “বিএনপি আওয়ামী লীগের মতোই দেশ শাসন করছে”—এটি একটি তথাকথিত রাজনৈতিক মতামত, প্রতিষ্ঠিত সত্য নয়। কিছু বিশ্লেষক ও বিরোধী দল এমন অভিযোগ করেন, আবার সরকার-সমর্থকেরা বলেন, বিএনপির বর্তমান নীতিগুলো ভিন্ন এবং সংস্কারমুখী। তাই এটিকে তথ্য হিসেবে নয়, বরং বিতর্কিত রাজনৈতিক মূল্যায়ন হিসেবে দেখা উচিত।

১৫ বছরের একটি সরকারের সঙ্গে ৭–৮ মাসের সরকারের চূড়ান্ত রায় দেওয়া তাত্ত্বিক ও গবেষণাগতভাবে যথাযথ নয়। তুলনা করা যায়, কিন্তু “একই” বা “ভিন্ন”—এই সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে দীর্ঘমেয়াদি তথ্য, স্বাধীন গবেষণা ও বিচারিক/প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যায়ন প্রয়োজন।

লেখক: উপদেষ্টা- গ্রন্থাগার ও তথ্যবিজ্ঞান বিভাগ, এশিয়ান ইউনিভার্সিটি অব বাংলাদেশ, আশুলিয়া, সাভার, ঢাকা–১৩৪১ এবং প্রাক্তন পরিচালক- বাংলাদেশ লোক-প্রশাসন প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (বিপিএটিসি), সাভার, ঢাকা।

ই-মেইল: amat​in@aub.ac.bd

১২৯ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০















সর্বশেষ সব খবর
মতামত নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

২৫০ x ২৫০


বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০