সর্বশেষ

সারাদেশ

তাজমিনের কক্সবাজার যাত্রা, হোটেলে অবস্থানসহ বিভিন্ন তথ্য সামনে

আহসান সুমন, কক্সবাজার 
আহসান সুমন, কক্সবাজার 

সোমবার, ১২ অক্টোবর, ২০২৬ ২:৪৮ পূর্বাহ্ন

শেয়ার করুন:
কুমিল্লায় ধর্ষণের পর হত্যার শিকার সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিন (১৫) মৃত্যুর আগে কক্সবাজারের কলাতলীর একটি আবাসিক হোটেলে অবস্থান করেছিলেন। গত ৬ অক্টোবর সন্ধ্যায় রিয়াজ উদ্দিন ওরফে রাজুর সঙ্গে হোটেলটির ৩০২ নম্বর কক্ষে ওঠেন তিনি। পরদিন কুমিল্লার উদ্দেশে রওনা হওয়ার পর সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক মো. সুমন মিয়ার হাতে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হন বলে পুলিশের ভাষ্য। এ ঘটনায় গ্রেপ্তার সুমন আদালতে হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দিয়েছেন। তাজমিনের কক্সবাজার যাত্রা, হোটেলে অবস্থান এবং বাড়ি ফেরার পথ ঘিরে তদন্তে বিভিন্ন তথ্য সামনে এসেছে।

কুমিল্লায় ধর্ষণের পর হত্যার শিকার সপ্তম শ্রেণির শিক্ষার্থী জান্নাতুল তাজমিনের (১৫) শেষ যাত্রাপথ ঘিরে নতুন তথ্য সামনে এসেছে। মৃত্যুর আগে তিনি কক্সবাজারের কলাতলীতে অবস্থিত মেঘলা রিসোর্ট নামের একটি আবাসিক হোটেলে অবস্থান করেছিলেন। হোটেলের নথিতে তাঁকে রিয়াজ উদ্দিন ওরফে রাজুর স্ত্রী পরিচয়ে তানজু আক্তার নামে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। সেখানে তাঁর বয়স লেখা হয়েছিল ১৮ বছর।

হোটেলের রেজিস্টার, সিসিটিভি ফুটেজ এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, গত ৬ অক্টোবর সন্ধ্যা ৭টা ২৫ মিনিটে তাজমিন ও রাজু হোটেলটির ৩০২ নম্বর কক্ষে ওঠেন। পরদিন ৭ অক্টোবর বেলা ১১টার দিকে তাঁরা হোটেল ছাড়েন। পরে রাজু তাজমিনকে কুমিল্লাগামী বাসে তুলে দেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে।

তবে কুমিল্লায় ফেরার পথে ধর্ষণ ও হত্যার শিকার হন তাজমিন। এ ঘটনায় করা মামলায় সিএনজিচালিত অটোরিকশাচালক মো. সুমন মিয়াকে (৩৫) চট্টগ্রাম থেকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তাজমিনের ব্যবহৃত মুঠোফোনও উদ্ধার করা হয়েছে।

হোটেলে অবস্থান ও বাসযাত্রা
কক্সবাজারের কলাতলীতে কুটুমবাড়ি সড়কের শেষ মাথায় অবস্থিত তিনতলা আবাসিক হোটেলটির রেজিস্টারের তথ্য অনুযায়ী, গত ৬ অক্টোবর সন্ধ্যায় রাজুর সঙ্গে সেখানে ওঠেন তাজমিন। হোটেলের নথিতে রাজুর পরিচয় বান্দরবানের লামা এলাকার মনির আহমদের ছেলে হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।

হোটেলটির এক কর্মচারী নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, এক রাত থাকার পর ৭ অক্টোবর বেলা ১১টার দিকে তাঁরা হোটেল ছেড়ে চলে যান। রেজিস্টারে রাজুর দুটি মুঠোফোন নম্বর ও একটি জাতীয় পরিচয়পত্রের নম্বরও লেখা রয়েছে।

কক্সবাজারের একটি ট্রাভেল এজেন্সির কর্মী আবদুল্লাহর দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, ৬ অক্টোবর রাত আটটার পর তাজমিন ও রাজু তাঁদের কাউন্টারে গিয়ে বাসের টিকিট কাটেন। রাজু পরদিনের জন্য আইকনিক এক্সপ্রেসের একটি টিকিট বুক করেন। তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, ৭ অক্টোবর দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে তাজমিনকে বাসে তুলে দেন তিনি। টিকিটের দাম ছিল ৯০০ টাকা।

রাজুর এক সহকর্মী জানান, তাজমিন হত্যাকাণ্ডের পর রাজু নিজেকে নির্দোষ দাবি করেন। এ ঘটনার সঙ্গে তাঁর কোনো সম্পৃক্ততা নেই বলেও দাবি করেন তিনি। ওই সহকর্মীর ভাষ্য অনুযায়ী, ফেসবুকের মাধ্যমে তাজমিনের সঙ্গে রাজুর পরিচয় হয়েছিল। তবে রাজুর ঘনিষ্ঠ আরেকটি সূত্রের দাবি, তাঁদের পরিচয় হয়েছিল প্রায় পাঁচ মাস আগে। পরিচয়ের সময়কাল নিয়ে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর বক্তব্যে ভিন্নতা রয়েছে।

কীভাবে ঘটে হত্যাকাণ্ড
সিসিটিভি ফুটেজের তথ্য অনুযায়ী, ৭ অক্টোবর রাত পৌনে ১২টার দিকে কক্সবাজার থেকে আসা আইকনিক এক্সপ্রেসের বাস থেকে কুমিল্লার পদুয়ারবাজার বিশ্বরোডের হোটেল নূরজাহানের সামনে নামেন তাজমিন। এরপর শহরের রেসকোর্স এলাকার বাসায় যাওয়ার জন্য একটি সিএনজিচালিত অটোরিকশা ভাড়া করেন তিনি।

পুলিশের ভাষ্য অনুযায়ী, অটোরিকশাচালক সুমন তাঁকে নির্জন স্থানে নিয়ে ধর্ষণ করেন এবং পরে গলায় গামছা পেঁচিয়ে হত্যা করেন। ৮ অক্টোবর সকালে কুমিল্লার লালমাই উপজেলার একটি ধানখেত থেকে তাঁর মরদেহ উদ্ধার করা হয়।

এ ঘটনায় করা হত্যা মামলায় সুমনকে গ্রেপ্তারের পর আদালতে হাজির করা হলে তিনি হত্যার দায় স্বীকার করে জবানবন্দি দেন বলে পুলিশ জানিয়েছে। তাঁর দেওয়া তথ্যের ভিত্তিতে তাজমিনের ব্যবহৃত আইফোন উদ্ধার করা হয়।

লালমাই থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মিজানুর রহমান জানান, মুঠোফোনের কলতালিকাসহ বিভিন্ন বিষয় খতিয়ে দেখা হচ্ছে। আসামি হত্যার কথা স্বীকার করেছেন। তদন্ত শেষ হলে ঘটনার অন্য বিষয়গুলো জানা যাবে।

বাড়ি ছাড়ার আগে কী ঘটেছিল
পরিবারের সূত্রে জানা গেছে, গত ৪ অক্টোবর এক বান্ধবীকে হাতঘড়ি দেওয়া নিয়ে মায়ের সঙ্গে তাজমিনের ঝগড়া হয়। এরপর তিনি বাড়ি থেকে বের হয়ে প্রথমে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় এক বান্ধবীর কাছে যান। পরে কুমিল্লায় ফিরে সেখান থেকে কক্সবাজারের উদ্দেশে রওনা হন বলে বিভিন্ন সূত্রে জানা গেছে।

বাড়ি ছাড়ার সময় তাজমিন মাকে জানিয়েছিলেন, তিনি এক বান্ধবীর বাসায় যাচ্ছেন। তবে বান্ধবীর নাম এবং তাঁর মা-বাবার পরিচয় জানতে চাইলে স্পষ্ট করে কিছু বলেননি।

তাজমিনের মা কেয়া খাতুন জানান, বৃহস্পতিবার বিকেলে মেয়ের সঙ্গে তাঁর শেষ কথা হয়েছিল। তখন তাজমিন বলেছিলেন, তিনি এক বান্ধবীর সঙ্গে আছেন। মেয়েকে বান্ধবীর বাড়ি থেকে নিয়ে আসার ইচ্ছা থাকলেও তিনি কোথায় আছেন, সে বিষয়ে নিশ্চিত হতে পারেননি।

রাজুর এক সহকর্মীর ভাষ্য অনুযায়ী, কক্সবাজার যাওয়ার জন্য তাজমিনকে বিকাশের মাধ্যমে ৫০০ টাকা পাঠিয়েছিলেন রাজু। কক্সবাজারে পৌঁছানোর পর তাঁদের হোটেলে অবস্থানের বিষয়টি রাজু স্বীকার করেছিলেন বলেও জানান ওই সহকর্মী।

শেষ মুহূর্তে যোগাযোগ ছিল রাজুর সঙ্গে
রাজুর সহকর্মীর দাবি, কুমিল্লায় ফেরার পথে অটোরিকশায় ওঠার পরও তাজমিনের সঙ্গে রাজুর মুঠোফোনে কথা হচ্ছিল। অটোরিকশাচালকের বিস্তারিত তথ্যও তাজমিন তাঁকে জানিয়েছিলেন বলে ওই সহকর্মী দাবি করেন।

তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, রাত দেড়টার দিকে তাজমিনের মুঠোফোনের সরাসরি অবস্থান জানা বন্ধ হয়ে যায়। এরপর তাঁর সঙ্গে আর যোগাযোগ করা সম্ভব হয়নি। পরদিন বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে তাজমিনের ধর্ষণ ও হত্যার খবর দেখে রাজু স্তম্ভিত হয়ে পড়েন বলে জানান ওই সহকর্মী।

রাজু গত তিন বছর ধরে কক্সবাজারের একটি আবাসিক হোটেলে কাজ করছেন বলেও জানান তাঁর সহকর্মী। তাজমিন হত্যাকাণ্ডের পর তিনি ছুটিতে রয়েছেন বলে জানা গেছে।

পরিবারের কাছে তাজমিনের স্মৃতি
তাজমিনের শিক্ষক সাদ বিন এরশাদ জানান, তাজমিন ছিলেন চঞ্চল স্বভাবের। মা অসুস্থ হলে দুই যমজ ছোট ভাইয়ের দেখাশোনা করতেন তিনি। তাঁর বাবা একটি ওষুধ কোম্পানিতে চাকরি করতেন এবং সকালে বাসা থেকে বের হয়ে রাতে ফিরতেন। বাবা মেয়েকে খুব আদর করতেন বলেও জানান শিক্ষক।

তাঁর ভাষ্য অনুযায়ী, রাগ হলে তাজমিন কখনো কখনো হুট করে বাড়ি থেকে বের হয়ে যেতেন।

তাজমিনের কক্সবাজার যাত্রা, রাজুর সঙ্গে যোগাযোগ এবং হত্যাকাণ্ডের আগে ও পরের ঘটনাগুলো নিয়ে তদন্ত করছে পুলিশ। মুঠোফোনের কলতালিকা, সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বক্তব্য ও অন্যান্য তথ্য যাচাইয়ের মাধ্যমে ঘটনার পূর্ণাঙ্গ চিত্র জানার চেষ্টা চলছে।

১৭৩ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০















সর্বশেষ সব খবর
সারাদেশ নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

২৫০ x ২৫০


বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০