ভরা মৌসুমেও পদ্মায় ইলিশের দেখা কম
বুধবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ৩:৩০ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
ইলিশের ভরা মৌসুমেও রাজবাড়ীর পদ্মা নদীতে কাঙ্ক্ষিত মাছ পাচ্ছেন না জেলেরা। দিনের পর দিন জাল ফেলেও কেউ ফিরছেন সামান্য ইলিশ নিয়ে, আবার কারও জাল উঠছে প্রায় খালি। এতে নৌকা, জাল, জ্বালানি ও শ্রমিকের খরচ তুলতে না পেরে ঋণের কিস্তি ও দাদনের টাকা পরিশোধ নিয়ে দুশ্চিন্তায় পড়েছেন পদ্মাপাড়ের জেলেরা।
রাজবাড়ীর গোয়ালন্দ, পাংশা, কালুখালী ও সদর উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকার বহু মানুষের জীবন-জীবিকা পদ্মা নদীকে ঘিরে। বিশেষ করে মাছ ধরা ও মাছ বিক্রির সঙ্গে জড়িত পরিবারগুলোর আয়ের বড় উৎস ইলিশ। সাধারণত ইলিশের মৌসুমে নদীতে জেলেদের ব্যস্ততা বাড়ে। ভোর থেকে গভীর রাত পর্যন্ত পদ্মায় জাল ফেলেন তাঁরা। তবে এবার সেই ব্যস্ততার তুলনায় ইলিশের উপস্থিতি অনেক কম।
সম্প্রতি গোয়ালন্দের দৌলতদিয়া ৭ নম্বর ফেরিঘাটসংলগ্ন সাত্তার মেম্বারপাড়া এলাকায় ঘুরে দেখা যায়, নদীতে জাল ফেলেও অনেক জেলেকে সামান্য মাছ নিয়ে ফিরতে হচ্ছে। কারও জালে দুই-চারটি ইলিশ উঠছে, আবার কারও জাল প্রায় খালিই থাকছে।
জেলেরা জানান, ইলিশ ধরার মৌসুম সামনে রেখে তাঁরা আগে থেকেই জাল-দড়ি মেরামত, নৌকা প্রস্তুত ও জ্বালানি কেনার জন্য টাকা খরচ করেছেন। অনেকেই এসব খরচ মেটাতে ঋণ বা দাদনের টাকা নিয়েছেন। কিন্তু প্রত্যাশিত মাছ না পাওয়ায় আয় হচ্ছে কম, অথচ নদীতে নামার খরচ কমেনি। ফলে সংসারের খরচ চালানোর পাশাপাশি ঋণের কিস্তি পরিশোধ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।
গোয়ালন্দের জেলে গোপাল হলদার বলেন, নদীতে পানি কম থাকায় ইলিশ তেমন পাওয়া যাচ্ছে না। জাল-দড়ি ঠিক করা ও নৌকা চালানোর জন্য ঋণ করেছেন তাঁরা। কিন্তু মাছ কম হওয়ায় নৌকার খরচও উঠছে না।
তিনি বলেন, ৮ থেকে ১০ জন লোক নিয়ে নৌকা চালাতে হয়। অথচ মাছ এত কম যে নৌকার খরচ মেটানোই কঠিন। যা মাছ পাওয়া যায়, তা বিক্রি করেই কোনোভাবে সংসার চালাতে হচ্ছে।
আরেক জেলে লাল চাঁদ বলেন, ভরা মৌসুমেও জালে কাঙ্ক্ষিত মাছ উঠছে না। একবার জাল ফেললে কখনো চার-পাঁচটি, আবার কখনো দু-একটি মাছ পাওয়া যাচ্ছে। মাছ কম হওয়ায় বাড়িতে টাকা পাঠানোর মতো আয়ও হচ্ছে না।
লাল চাঁদের ভাষ্য, মাছ ধরার নিষেধাজ্ঞার সময় জেলেদের বিষয়টি মানবিকভাবে বিবেচনা করা দরকার। কারণ মাছ না থাকলে তাঁদের আয়ও থাকে না। কোনো দিন ভালো মাছ পেলে এক-দুই হাজার টাকা বাড়িতে পাঠাতে পারেন। অন্য সময় ধারদেনা করে সংসার চালাতে হচ্ছে।
ইলিশ বিক্রেতা মিলন বলেন, গত বছরের তুলনায় এবার পদ্মায় ইলিশের পরিমাণ অনেক কম। বর্তমানে এক কেজি ওজনের পদ্মার ইলিশ ২ হাজার ৮০০ থেকে ৩ হাজার টাকা পর্যন্ত বিক্রি হচ্ছে। দেড় কেজি ওজনের ইলিশের দাম উঠছে প্রায় ৪ হাজার টাকা। মাছ কম থাকায় ব্যবসায়ীরাও পর্যাপ্ত মাছ কিনতে পারছেন না।
আরেক ইলিশ বিক্রেতা সাইদ নদীতে বিষ প্রয়োগ ও বৈদ্যুতিক শক দিয়ে মাছ ধরার অভিযোগ করেন। তাঁর দাবি, এ ধরনের অবৈধ পদ্ধতিতে বড় মাছের পাশাপাশি মাছের ডিম, পোনা ও অন্যান্য জলজ প্রাণীও ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে। এতে নদীর মাছের উৎপাদন ও জীববৈচিত্র্যের ওপর নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।
রাজবাড়ী জেলা মৎস্য কর্মকর্তা মো. মাহবুব উল হক বলেন, ইলিশ কম পাওয়ার পেছনে একক কোনো কারণকে দায়ী করা যায় না। প্রাকৃতিক ও মানবসৃষ্ট বিভিন্ন কারণ এর সঙ্গে জড়িত থাকতে পারে। শুধু রাজবাড়ী নয়, গত এক-দুই বছর ধরে সারা দেশেই ইলিশের উৎপাদন ও আহরণের প্রবণতা নিম্নমুখী।
তিনি বলেন, জাটকা নিধন, অবৈধ জালের ব্যবহার এবং মা ইলিশের প্রজনন মৌসুমে নিষেধাজ্ঞা অমান্য করে মাছ ধরার মতো মানবসৃষ্ট কর্মকাণ্ড ইলিশের উৎপাদন ও বিচরণে প্রভাব ফেলতে পারে। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন, নদীর পানির প্রবাহ কমে যাওয়া, ডুবোচর জেগে ওঠা এবং নদীর ওপর বিভিন্ন অবকাঠামো নির্মাণের মতো বিষয়ও ইলিশের বিচরণ ও প্রজননে প্রভাব ফেলতে পারে।
জেলা মৎস্য কর্মকর্তা আরও বলেন, জাটকা নিধন, অবৈধ জালের ব্যবহার এবং মা ইলিশের নিষিদ্ধ সময়ে মাছ ধরা বন্ধে মৎস্য বিভাগ কাজ করছে।
পদ্মার জেলেদের প্রত্যাশা, নদীতে আবারও ইলিশের প্রাচুর্য ফিরবে। তবে এ জন্য নদীর স্বাভাবিক পানিপ্রবাহ ও নাব্যতা রক্ষা, ইলিশের প্রজনন ও বিচরণক্ষেত্র সংরক্ষণ এবং অবৈধভাবে মাছ ধরা বন্ধে কার্যকর নজরদারি প্রয়োজন বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।
১০৯ বার পড়া হয়েছে