সর্বশেষ

সারাদেশ

তথ্য উন্মুক্ত হলে সরকারি প্রকল্পে অনিয়ম কমানোর সুযোগ বাড়বে

মোহাম্মদ মাহতাব উদ্দিন তালুকদার
মোহাম্মদ মাহতাব উদ্দিন তালুকদার

বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ৪:৪৭ পূর্বাহ্ন

শেয়ার করুন:
সরকারি অর্থে বাস্তবায়িত প্রকল্প ও উন্নয়ন কর্মকাণ্ডের তথ্য জনগণের জন্য সহজলভ্য করা গেলে প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি বাড়ানোর সুযোগ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে কোনো প্রকল্পে কত টাকা বরাদ্দ, কত টাকা ব্যয় হয়েছে, কাজের অগ্রগতি কতটুকু, ঠিকাদার বা বাস্তবায়নকারী প্রতিষ্ঠানের পরিচয় এবং নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কাজ শেষ হচ্ছে কি না—এসব তথ্য নিয়মিত প্রকাশের মাধ্যমে সরকারি অর্থ ব্যবহারের ওপর নাগরিক নজরদারি বাড়ানো সম্ভব বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

তথ্য অধিকার আইন, ২০০৯-এ নাগরিকের তথ্য পাওয়ার অধিকার নিশ্চিত করার পাশাপাশি বিভিন্ন ক্ষেত্রে স্বপ্রণোদিত তথ্য প্রকাশের সুযোগ রাখা হয়েছে। আইনের ৬ ধারায় প্রত্যেক কর্তৃপক্ষকে তাদের গৃহীত সিদ্ধান্ত, কার্যক্রম এবং সম্পাদিত বা প্রস্তাবিত কর্মকাণ্ডের তথ্য নাগরিকদের সহজলভ্য করার জন্য প্রকাশ ও প্রচারের ব্যবস্থা করার কথা বলা হয়েছে।

তবে বাস্তবে সরকারি প্রকল্প বা দপ্তরের গুরুত্বপূর্ণ তথ্য জানতে অনেক সময় নাগরিককে সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ে যোগাযোগ করতে হয় কিংবা তথ্য অধিকার আইনে আবেদন করতে হয়। ফলে তথ্য প্রকাশের বিদ্যমান ব্যবস্থাকে আরও কার্যকর ও নাগরিকবান্ধব করার প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে করছেন তথ্য অধিকার ও সুশাসন নিয়ে কাজ করা ব্যক্তিরা।

সরকারি দপ্তরগুলোর ওয়েবসাইটে সাধারণত কর্মকর্তাদের নাম, ফোন নম্বর, নোটিশ, অফিস আদেশসহ বিভিন্ন প্রশাসনিক তথ্য পাওয়া যায়। কিন্তু জনগণের অর্থে বাস্তবায়িত প্রকল্পের আর্থিক ও বাস্তব অগ্রগতির তথ্য অনেক ক্ষেত্রেই একইভাবে সহজে পাওয়া যায় না।

এ অবস্থায় সরকারি দপ্তরগুলোর ওয়েবসাইটে প্রকল্পের নাম, মোট বরাদ্দ, মেয়াদ, বাস্তবায়নকারী সংস্থা, দরপত্র ও কার্যাদেশ, নির্বাচিত ঠিকাদার বা সেবা প্রদানকারী, ভৌত অগ্রগতি, আর্থিক অগ্রগতি, প্রকল্পের ছবি ও অবস্থান, কাজের সমাপ্তি এবং গ্রহণযোগ্যতার তথ্য প্রকাশ করা যেতে পারে।

একই সঙ্গে নাগরিক অভিযোগের সংখ্যা, অভিযোগ নিষ্পত্তির অগ্রগতি এবং সংশ্লিষ্ট তথ্য অধিকার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার নাম ও যোগাযোগের তথ্যও দৃশ্যমান রাখা হলে নাগরিকদের তথ্য পাওয়ার সুযোগ আরও বাড়বে।

প্রকাশিত তথ্যের সঙ্গে ‘সর্বশেষ হালনাগাদের তারিখ’ উল্লেখ থাকলে কোনো তথ্য কতটা সাম্প্রতিক, তা বোঝাও সহজ হবে।

সরকারি দপ্তরগুলোর ওয়েবসাইটে তথ্য প্রকাশ ও হালনাগাদের অবস্থা নিয়মিত পর্যবেক্ষণের জন্য জেলা পর্যায়ে পাক্ষিক মনিটরিং ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাবও রয়েছে।

এ ক্ষেত্রে প্রতিটি সরকারি দপ্তরের ওয়েবসাইটকে তিনটি সূচকে পর্যবেক্ষণ করা যেতে পারে—তথ্য হালনাগাদ হয়েছে, আংশিক হালনাগাদ হয়েছে এবং নির্ধারিত সময়ে হালনাগাদ হয়নি।

মাসিক বা ত্রৈমাসিক ভিত্তিতে এসব পর্যবেক্ষণের প্রতিবেদন সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়, বিভাগ বা নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের কাছে পাঠানো হলে ওয়েবসাইট শুধু তথ্য সংরক্ষণের মাধ্যম না থেকে প্রশাসনিক জবাবদিহির অংশ হিসেবে ব্যবহার করা সম্ভব হতে পারে।

সরকারি অর্থের অনিয়ম, প্রকল্প বাস্তবায়নের ত্রুটি ও অর্থ অপচয় অনুসন্ধানে গণমাধ্যমের ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ। তথ্য অধিকার আইনের আওতায় নাগরিকরা লিখিত বা ইলেকট্রনিক মাধ্যমে তথ্য চাওয়ার সুযোগ পেলেও আবেদন করার পর সেটির বর্তমান অবস্থা জানার ব্যবস্থা আরও সহজ করার প্রয়োজন রয়েছে।

তথ্য অধিকার আবেদনের অনলাইন রসিদ, আবেদন কোন পর্যায়ে রয়েছে, দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার পরিচয় এবং তথ্য সরবরাহের নির্ধারিত সময়সীমা অনলাইনে দেখা গেলে পুরো প্রক্রিয়াটি আরও স্বচ্ছ হতে পারে।

বিশেষ করে জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট তথ্যের ক্ষেত্রে সাংবাদিকদের আবেদন ও অগ্রগতি পর্যবেক্ষণের জন্য একটি সহজ ডিজিটাল ব্যবস্থা চালু করা হলে অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার কাজ আরও গতিশীল হতে পারে।

জবাবদিহি নিশ্চিত করতে অভিযোগ পাওয়ার পর যথাযথ তদন্তের ওপর গুরুত্ব দেওয়ার কথা বলছেন সংশ্লিষ্টরা। কোনো অভিযোগ উঠলেই সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা বা কর্মচারীকে দোষী হিসেবে বিবেচনা না করে নথি, অডিট প্রতিবেদন, প্রকল্পের মাঠপর্যায়ের অবস্থা এবং অন্যান্য প্রমাণ যাচাই করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রয়োজন রয়েছে।

অভিযোগের ধরন অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, বিভাগীয় তদন্ত ব্যবস্থা, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) অথবা আইনানুগ অন্য সংস্থার মাধ্যমে তদন্ত হতে পারে। অভিযোগ প্রমাণিত হলে আইন ও বিধি অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার পাশাপাশি ভিত্তিহীন অভিযোগের ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তির অধিকার নিশ্চিত করা জরুরি।

জেলা পর্যায়ে সরকারি ওয়েবসাইট ও তথ্য অধিকার বাস্তবায়ন পর্যবেক্ষণের জন্য ‘তথ্য স্বচ্ছতা ও ওয়েব মনিটরিং সেল’ গঠনের বিষয়টি বিবেচনা করা যেতে পারে।

এ ধরনের একটি সেলের দায়িত্বের মধ্যে জেলার সরকারি অফিসগুলোর ওয়েবসাইটের তালিকা তৈরি, প্রকল্প ও বাজেটের তথ্য প্রকাশ করা হয়েছে কি না তা পর্যবেক্ষণ, তথ্য অধিকার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার যোগাযোগের তথ্য দৃশ্যমান আছে কি না তা যাচাই এবং নির্ধারিত সময় অনুযায়ী ওয়েবসাইট হালনাগাদ হচ্ছে কি না তা পর্যালোচনা অন্তর্ভুক্ত হতে পারে।

কোনো দপ্তর নিয়মিত তথ্য প্রকাশ না করলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে অবহিত করা এবং ধারাবাহিকভাবে তথ্য প্রকাশে ব্যর্থতার বিষয়টি সংশ্লিষ্ট নিয়ন্ত্রণকারী মন্ত্রণালয় বা দপ্তরে পাঠানোর ব্যবস্থাও রাখা যেতে পারে।

তবে কোনো কর্মকর্তা বা কর্মচারীর বদলি, বরখাস্ত কিংবা শাস্তির মতো বিষয়ে অবশ্যই সংশ্লিষ্ট আইন, চাকরিবিধি ও প্রশাসনিক এখতিয়ার অনুসরণ করতে হবে।

তথ্য অধিকার আইন সব বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের ওপর একইভাবে প্রযোজ্য নয়। তাই সব বেসরকারি প্রতিষ্ঠানকে একই ধরনের তথ্য প্রকাশের বাধ্যবাধকতার আওতায় আনার বিষয়টি আইনগতভাবে পৃথকভাবে বিবেচনা করতে হবে।

তবে যেসব বেসরকারি প্রতিষ্ঠান সরকারি অর্থ, অনুদান, ভর্তুকি, সরকারি প্রকল্প কিংবা জনসেবা ব্যবস্থাপনার সঙ্গে যুক্ত, সেসব ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট আইন, চুক্তি ও নিয়ন্ত্রক কাঠামোর মাধ্যমে আর্থিক ও কার্যক্রমগত স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা যেতে পারে।

সরকারি ওয়েবসাইটে তথ্য প্রকাশের পাশাপাশি সেই তথ্যের সঙ্গে বাস্তব পরিস্থিতির মিল রয়েছে কি না, তা যাচাই করাও গুরুত্বপূর্ণ।

উদাহরণ হিসেবে কোনো রাস্তা নির্মাণ প্রকল্পের ওয়েবসাইটে যদি ৮০ শতাংশ কাজ সম্পন্ন হওয়ার তথ্য দেওয়া হয়, তাহলে স্থানীয় সাংবাদিক, নাগরিক সংগঠন কিংবা সাধারণ নাগরিক মাঠপর্যায়ে প্রকল্পের বাস্তব অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করতে পারেন।

তথ্য ও বাস্তবতার মধ্যে পার্থক্য পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নজরে আনা, প্রয়োজন হলে অভিযোগ করা এবং আইনানুগ প্রক্রিয়ায় তদন্তের সুযোগ তৈরি হতে পারে।

এভাবে তথ্য প্রকাশ, নাগরিক পর্যবেক্ষণ, গণমাধ্যমের অনুসন্ধান, অভিযোগ, তদন্ত এবং প্রমাণিত অনিয়মের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা—এই ধারাবাহিক প্রক্রিয়াকে আরও কার্যকর করা সম্ভব হতে পারে।

প্রশাসনিক স্বচ্ছতা ও তথ্য অধিকার বাস্তবায়ন জোরদারে কয়েকটি উদ্যোগ বিবেচনা করা যেতে পারে। এর মধ্যে রয়েছে—

সরকারি ওয়েবসাইটে সর্বশেষ তথ্য হালনাগাদের তারিখ বাধ্যতামূলকভাবে প্রকাশ;
প্রকল্প ও বাজেটের মৌলিক তথ্য সহজ ভাষায় প্রকাশ;
তথ্য অধিকার দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তার নাম ও যোগাযোগের তথ্য দৃশ্যমান রাখা;
তথ্য অধিকার আবেদনের অনলাইন ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালু;
জেলা পর্যায়ে ওয়েবসাইট ও তথ্য অধিকার বাস্তবায়নের নিয়মিত মনিটরিং;
নির্ধারিত সময়ে তথ্য প্রকাশ না হলে কারণ জানানোর ব্যবস্থা;
অভিযোগের ক্ষেত্রে নিরপেক্ষ তদন্তের সুযোগ নিশ্চিত করা;
তথ্য প্রকাশ না করার ক্ষেত্রে আইনগত কারণ স্পষ্টভাবে উল্লেখ;
জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট তথ্য পাওয়ার প্রক্রিয়াকে সাংবাদিকদের জন্য আরও সহজ করা;
তথ্য অধিকার বাস্তবায়নের বার্ষিক মূল্যায়ন প্রতিবেদন প্রকাশ।
তথ্যই শেষ কথা নয়, প্রয়োজন জবাবদিহি
সরকারি প্রকল্পের তথ্য জনগণের কাছে উন্মুক্ত করা অনিয়ম ও দুর্নীতি প্রতিরোধের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপাদান হতে পারে। তবে শুধু তথ্য প্রকাশের মাধ্যমে দুর্নীতি পুরোপুরি বন্ধ করা সম্ভব—এমন নিশ্চয়তা নেই।

তথ্যের পাশাপাশি প্রয়োজন কার্যকর অডিট, নাগরিক পর্যবেক্ষণ, গণমাধ্যমের অনুসন্ধান, অভিযোগ গ্রহণ ও নিষ্পত্তি, নিরপেক্ষ তদন্ত এবং প্রমাণিত অনিয়মের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা।

একটি প্রকল্পে কত টাকা বরাদ্দ হয়েছে, কত টাকা ব্যয় হয়েছে, কে কাজটি বাস্তবায়ন করছে এবং বাস্তবে কতটুকু কাজ হয়েছে—এসব তথ্য নাগরিকের কাছে সহজে পৌঁছালে সরকারি অর্থ ব্যবহারের ওপর নজরদারির সুযোগ বাড়বে।

সংশ্লিষ্টদের মতে, দুর্নীতি প্রতিরোধে শুধু ব্যক্তি বা নেতৃত্বের সততার ওপর নির্ভর না করে তথ্য প্রকাশ, প্রযুক্তি, অডিট ও প্রাতিষ্ঠানিক জবাবদিহির সমন্বিত কাঠামো গড়ে তোলা প্রয়োজন। এতে প্রশাসনের কার্যক্রম সম্পর্কে নাগরিকের জানার সুযোগ বাড়ার পাশাপাশি সরকারি অর্থ ব্যবহারে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তিও শক্তিশালী হতে পারে।

১৪৬ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০















সর্বশেষ সব খবর
সারাদেশ নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

২৫০ x ২৫০


বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০