হাজার বছর ধ'রে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে...
রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ৭:৫৮ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
আমি বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত কানাডিয়ান অভিবাসী । দীর্ঘদিন পর পরিবারের সাথে পূর্নমিলনের জন্য ক'দিন আগে আসা হয়েছে শ্রীলঙ্কার রাজধানী কলম্বোতে। আমার কানাডা হতে এখানে আসার একদিন পরেই বাংলাদেশ হতে এসেছেন পরিবারের অন্যান্য সদস্যরা। আমরা উঠেছি ওয়েস্টার্ন প্রভিন্সের কোট্টে জেলার বাট্টামুলার অভিজাত এলাকায়। বান্দরনায়েক বিমানবন্দর হতে ৩৭ কিলোমিটার দূরত্বে ছিমছাম শান্ত নিরিবিলি শহর।
কলম্বো আসার পর শনিবার, তিনদিন অতিবাহিত হয়ে গেল। সারাদিন প্রচণ্ড গরম ছিল। তাপমাত্রা ৩২ ডিগ্রি সেলসিয়াস। শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত রুমে শুয়ে-বসে রীতিমতো হাঁসফাঁস করতে হয়েছে। শনিবার ছুটির দিন থাকায় রাস্তায় মানুষজন ছিলই না। ভোরে বাইরে চা-পান শেষে সারাটা দিন ঘুমিয়ে কেটেছে। মাঝে কিছু জরুরি ইমেইল এবং মেসেজের উত্তর দিতে হলো। সন্ধ্যায় যখন শহরের কোথায় ঠেক দেওয়া যায় ভাবছি, তখন মনে হলো ওল্ড টাউন কেন দেখা হচ্ছে না ?
যেকোনো শহরকে চিনতে হলে তার আদি ঐতিহ্য দেখতে হবে, খুঁজতে হবে পুরোনো শহরের অলিগলির ইতিহাস। সেখানে স্থানীয় মানুষের রুচি, সংস্কৃতি, খাদ্যাভ্যাস, বাড়িঘর, পথঘাট দেখে মোটামুটি ধারণা পাওয়া যায়। যারা সলো ট্যুরিস্ট কিংবা দলবেঁধে আসেন, এরা কিন্তু দিনভর একটা ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে,হাতে ক্যামেরা নিয়ে পুরোনো শহর ঘুরে বেড়ায়। এদের দেখার চোখ এবং জানার তৃষ্ণা দেহকে ক্লান্ত করতে পারে না।
যাহোক, পিকমি অ্যাপস ব্যবহার করে টুকটুক ডেকে অবেলায় চলে এলাম পুরোনো শহরে। কলম্বোর আব্দুল হামিদ স্ট্রীট। মুসলিম অধ্যুষিত এলাকা, যা অনেকটাই পুরোনো ঢাকার চকবাজার বা কলকাতার জাকির স্ট্রিট, সদর স্ট্রিট, নিউমার্কেট এলাকার মতন। চলতি পথে কাবাব, পরোটা, মশলাদার খাবারের গন্ধ চারিদিকে উড়ছে !
আহা কি অদ্ভুত খাবারের ঘ্রান!
বৃষ্টিস্নাত সন্ধ্যায় মানুষ গিজগিজ করছে। গা বাঁচিয়ে হাঁটাচলা মুশকিল। ফুটপাত ছেড়ে ছেলে, মেয়ে, বয়স্ক সব ধরনের মানুষের ঢল নেমেছে রাস্তায়। এ রাস্তা নাকি মধ্যরাত পর্যন্ত লোকজনে গমগম করে। গত তিন দিন পর প্রথম এ জায়গায় দেখলাম মানুষের ব্যাপক আনাগোনা, উচ্চকিত কণ্ঠ, লাউডস্পিকারে গানের সুর, রাস্তার দু'পাশে ভ্যানগাড়ি কিংবা টেবিলে সাজিয়ে রেখেছে কাবাব, নান, পরোটা, ফুচকা, চটপটি, পানিপুরি,চউমিনসহ হরেক পদের খাবার। মানুষজন রাস্তায় দাঁড়িয়ে কিংবা পরিবার নিয়ে পেতে রাখা চেয়ার-টেবিলে খাচ্ছে। এ যেন কলকাতা বা পুরান ঢাকার স্মৃতি মনে করিয়ে দিল। বেশ কিছু রেস্টুরেন্টের সামনে দিয়ে যেতে নাকে এল নানান পদের, নানান নামের বিরিয়ানির গন্ধ। কোথাও লেখা অরিজিনাল মাটন বিরিয়ানি, কোথাও পেশোয়ারি, হায়দ্রাবাদী, কোথাও কাবুলি পোলাও।
আহা বিরিয়ানি!
শুধু গন্ধ শুঁকে দেখা ছাড়া কোনো উপায় নেই খাওয়ার। আমার তো খাওয়া নিষেধ। ডাক্তারের এই নিষেধাজ্ঞা অমান্য করার দুঃসাহস আপাতত নেই। তাই গন্ধেই অর্ধভোজন সারা হলো!
এই শহরের একটা জিনিস ভালো লেগেছে—বৌদ্ধ মন্দির, খ্রিস্টান চার্চ, হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের বিশাল বিশাল মন্দির ও মুসলিমদের বেশ কিছু মসজিদের সহাবস্থান। ধর্ম নিয়ে এদের কোনো বাড়াবাড়ি নেই। এখানে সব মানুষের ধর্মীয়, বাক,ব্যক্তি স্বাধীনতা শক্তভাবে নিশ্চিত করেছে রাষ্ট্র। এর চেয়েও আমার কাছে বড় মনে হয়েছে মানুষের শিক্ষা। শতভাগ মানুষের মাঝে আছে শিক্ষার আলো। এই আলোয় এরা আলোকিত, শিক্ষিত। আইন বা নিয়ম তো সব দেশেই আছে, কিন্তু মানুষের মাঝে যদি শিক্ষা না থাকে, তবে সব চেষ্টাই বৃথা।
তবে মানুষজনের সাথে কথা বলে যতটুকু বুঝেছি, এরা সৎ, কর্মঠ, বিনয়ী। এরা চায় তাদের দেশ আরও উন্নতি করুক, নিজেরা সেই চেষ্টা করে যাচ্ছে। তাদের ভাষ্য হচ্ছে—দুর্নীতিগ্রস্ত রাজনৈতিক দল ও অসৎ রাজনীতিবিদরাই হচ্ছে প্রধান সমস্যা। রাজনীতিবিদরা যদি দুর্নীতিপরায়ণ হয়, সেই দেশ কখনোই উন্নতি করতে পারে না। ২০২১ সালের পর শ্রীলঙ্কা ঘুরে দাঁড়িয়েছে। সরকার ও জনগনের ঐকান্তিক প্রচেস্টায় একটা দেশ কিভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে অর্থনৈতিকভাবে শক্তিশালী হয়ে উঠছে, এ থেকে অন্যদের শিক্ষা নেয়ার অনেক কিছু আছে।
যাহোক, ওল্ড টাউনে ঘুরে ক্লান্ত ও ক্ষুধার্ত। ক্ষুধা নিবারণে ঢুকে পড়ি চলতি পথের একটা রেস্টুরেন্টে। অনেকটাই পুরান ঢাকার লালবাগের মদিনা রেস্টুরেন্টের মতন। চিকেন কাবাব, পরোটা, সালাদ দিয়ে সান্ধ্যকালীন নাস্তা সেরে ফেলি। সবশেষে চা বা কফি না হলে কি আয়োজন পরিপূর্ণ হয়! সেটাও এলো । দুধের এই চা সত্যি দারুণ ছিল।
লেখক: গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব।
১৪২ বার পড়া হয়েছে