সর্বশেষ

সারাদেশ

ঢাকা-আরিচা মহাসড়কে থ্রি-হুইলারের দাপট: নজরদারি নেই

স্টাফ রিপোর্টার, মানিকগঞ্জ
স্টাফ রিপোর্টার, মানিকগঞ্জ

বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ৯:৪২ অপরাহ্ন

শেয়ার করুন:
ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের মানিকগঞ্জ অংশে নিষেধাজ্ঞা উপেক্ষা করে অবাধে চলছে নছিমন, করিমন, ভটভটি, সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও ব্যাটারিচালিত ইজিবাইকসহ বিভিন্ন ধরনের থ্রি-হুইলার। বানিয়াজুরি থেকে পাটুরিয়া ও আরিচা পর্যন্ত মহাসড়কের বিভিন্ন পয়েন্টে দূরপাল্লার বাস ও অন্যান্য দ্রুতগতির যানবাহনের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে এসব ধীরগতির যান চলাচল করায় বাড়ছে দুর্ঘটনার ঝুঁকি। হাইওয়ে পুলিশের দায়িত্বশীলদের সামনে দিয়েও এসব যান চলাচল করলেও কার্যকর পদক্ষেপ না নেওয়া নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন স্থানীয় বাসিন্দা ও পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

ঢাকা-আরিচা মহাসড়কের বানিয়াজুরি থেকে পাটুরিয়া ও আরিচা অংশে দীর্ঘদিন ধরেই থ্রি-হুইলারের অবাধ চলাচলের অভিযোগ রয়েছে। আইন অনুযায়ী মহাসড়কে নছিমন, করিমন, ভটভটি, সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও ব্যাটারিচালিত ইজিবাইকের মতো ধীরগতির ও অননুমোদিত যান চলাচল নিষিদ্ধ। তবে বাস্তবে মহাসড়কের বিভিন্ন স্থানে দেখা যাচ্ছে ভিন্ন চিত্র।

সরেজমিনে বানিয়াজুরি, জোকা, বরঙ্গাইল ও উথুলীসহ বিভিন্ন এলাকায় দেখা যায়, দূরপাল্লার বাস ও পণ্যবাহী যানবাহনের সঙ্গে একই সড়কে নির্বিঘ্নে চলাচল করছে থ্রি-হুইলার। কোথাও কোথাও মহাসড়কের ওপরেই যাত্রী ওঠানো-নামানো হচ্ছে। এতে দ্রুতগতির যানবাহনকে হঠাৎ গতি কমাতে বা পাশ কাটিয়ে যেতে হচ্ছে।

মানিকগঞ্জ জেলায় মহাসড়কের শৃঙ্খলা রক্ষায় দুটি হাইওয়ে থানা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের মতে, মহাসড়কে নিষিদ্ধ যানবাহন চলাচল বন্ধ করা এসব সংস্থার অন্যতম দায়িত্ব। সরকার ও উচ্চ আদালতের নির্দেশনাতেও মহাসড়কে ধীরগতির ও ঝুঁকিপূর্ণ যানবাহন চলাচল বন্ধের কথা বলা হয়েছে। এরপরও বানিয়াজুরি থেকে পাটুরিয়া ও আরিচা পর্যন্ত বিভিন্ন এলাকায় এসব যান কীভাবে নিয়মিত চলাচল করছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে।

বরঙ্গাইল হাইওয়ে থানা সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছরের জুলাইয়ে সড়ক দুর্ঘটনার মামলা হয়েছে চারটি এবং নিয়মিত মামলা হয়েছে সাতটি। আগস্টে দুর্ঘটনার মামলা হয়েছে তিনটি এবং নিয়মিত মামলা হয়েছে চারটি। স্থানীয়দের অভিযোগ, মহাসড়কের এই অংশে প্রতিদিন যে পরিমাণ থ্রি-হুইলার চলাচল করে, তার তুলনায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার সংখ্যা খুবই কম।

জোকা এলাকায় কথা হয় ইজিবাইকচালক মোবারক হোসেনের সঙ্গে। তিনি জানান, প্রতিদিন বরঙ্গাইল থেকে বানিয়াজুরি পর্যন্ত তিনি আট থেকে দশবার যাতায়াত করেন। যাত্রীও ভালো পাওয়া যায়। মহাসড়কে ইজিবাইক চালানোর বিষয়ে পুলিশের বাধার কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন, তাঁদের ‘সিস্টেম’ আছে এবং কোনো সমস্যা হলে সমিতির লোকজন বিষয়টি দেখেন।

বরঙ্গাইল এলাকার একটি সিএনজি স্টেশনে মতিন নামের এক চালক বলেন, সব কথা প্রকাশ্যে বলা সম্ভব নয়। তাঁদের কিছু নিয়ম মেনে চলতে হয়। মহাসড়কে চলাচলের কারণে পুলিশের মামলার ভয়ও থাকে বলে জানান তিনি।

উথুলী বাসস্ট্যান্ড এলাকার কয়েকজন থ্রি-হুইলার চালক ও মালিক নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, মহাসড়কের অল্প অংশ ব্যবহার করলেও বিভিন্ন বিষয় ‘ম্যানেজ’ করেই তাঁদের গাড়ি চালাতে হয়। তাঁদের দাবি, পরিচয় প্রকাশ পেলে জীবিকার ওপর প্রভাব পড়তে পারে।

বানিয়াজুরি বাসস্ট্যান্ডে পথচারী শরিফুল ইসলাম বলেন, বাসস্ট্যান্ড এলাকায় আঞ্চলিক ও দূরপাল্লার বাসের পাশাপাশি থ্রি-হুইলারগুলোও দ্রুতগতিতে চলাচল করে। এতে পথচারীদের আতঙ্কের মধ্যে চলতে হয়। মহাসড়কে এসব যান অবাধে চলাচলের কারণে ছোট-বড় দুর্ঘটনার ঝুঁকি বেড়েছে বলেও তিনি মন্তব্য করেন।

সেলফি পরিবহনের চালক সৌরভ আহমেদ বলেন, তাঁদের বাসে প্রায় অর্ধশত যাত্রী থাকে। বিভিন্ন বাসস্ট্যান্ডের ফিডার সড়ক থেকে থ্রি-হুইলার হঠাৎ মহাসড়কে উঠে এলোপাতাড়ি চলাচল করায় বাস চালাতে সমস্যা হয়।

নীলাচল পরিবহনের চালক আনিস মিয়া বলেন, দূরপাল্লার বাস নির্দিষ্ট গতিতে চলাচল করে। কিন্তু মহাসড়কে থ্রি-হুইলার বেড়ে যাওয়ায় সমস্যা তৈরি হচ্ছে। এসব যানবাহন যত্রতত্র থামিয়ে যাত্রী ওঠানো-নামানোর কারণে বড় যানবাহনের চালকদের অনেক সময় হঠাৎ ব্রেক করতে হয়। মহাসড়কে এ ধরনের যান চলাচল বন্ধে প্রশাসনের কঠোর নজরদারি প্রয়োজন বলে তিনি মনে করেন।

বরঙ্গাইল হাইওয়ে থানা-সংলগ্ন সিএনজি মালিক সমিতির একাধিক নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, স্থানীয় যাত্রীদের সুবিধার জন্য তাঁরা মহাসড়কের কিছু অংশ ব্যবহার করেন। তাঁদের দাবি, বড় বাস অনেক সময় স্থানীয় যাত্রীদের গন্তব্যে না থামায়। তবে মহাসড়কে থ্রি-হুইলার চলাচল নিষিদ্ধ—এমন আইনের বিষয়ে তাঁরা অবগত নন বলে জানান।

মানিকগঞ্জ জেলা বাস, মিনিবাস, মাইক্রোবাস ও অটোটেম্পো ওনার্স গ্রুপের সভাপতি আব্দুর রাজ্জাক লিটন বলেন, মহাসড়কে আঞ্চলিক যান চলাচল নিয়ে সমস্যা নেই, তবে দ্রুতগতির যানবাহনের সঙ্গে থ্রি-হুইলার চলাচল ঝুঁকিপূর্ণ। এসব যানবাহনের এলোপাতাড়ি চলাচলের কারণে দুর্ঘটনা ঘটছে। দুর্ঘটনার পর অনেক ক্ষেত্রে বড় যানবাহনের চালকদের বিরুদ্ধেই ব্যবস্থা নেওয়া হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি।

মহাসড়কে থ্রি-হুইলার চলাচল বন্ধে জেলা ও উপজেলা প্রশাসন এবং পুলিশ প্রশাসনের কাছে অনুরোধ করা হলেও এখনো প্রত্যাশিত ফল পাওয়া যায়নি বলেও জানান তিনি।

সুশাসনের জন্য নাগরিক—সুজনের মানিকগঞ্জ জেলা শাখার সহসভাপতি ইকবাল হোসেন কচি বলেন, মহাসড়কে থ্রি-হুইলার চলাচল আইনবহির্ভূত এবং এতে সাধারণ মানুষের নিরাপত্তা ঝুঁকিতে পড়ে। নিয়মিত অভিযান ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা না থাকলে নানা ধরনের প্রশ্ন তৈরি হওয়া স্বাভাবিক। মহাসড়ক নিরাপদ রাখতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

মানিকগঞ্জ বিআরটিএ সার্কেলের সহকারী পরিচালক (ইঞ্জিনিয়ারিং) মাহবুব কামাল বলেন, ব্যাটারিচালিত অটোরিকশা ও সিএনজিচালিত থ্রি-হুইলার কোনোভাবেই মহাসড়কে চলতে পারে না। তাঁরা নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করছেন। তবে মহাসড়কের কয়েকটি এলাকায় থ্রি-হুইলারের চলাচল বেড়েছে। অভিযান আরও জোরদার করা প্রয়োজন বলে তিনি জানান।

শিবালয় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মনিষা রানী কর্মকার বলেন, মহাসড়ক নিরাপদ রাখতে বিআরটিএ ও হাইওয়ে পুলিশকে তৎপর থাকতে বলা হয়েছে। অবৈধ যানবাহনের বিরুদ্ধে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকেও সময় সময় ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হচ্ছে।

বরঙ্গাইল হাইওয়ে থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হারুন অর রশিদ বলেন, শুধু তাঁদের এলাকায় নয়, দেশের বিভিন্ন মহাসড়কেই থ্রি-হুইলার চলাচল করছে। নিয়মিত মামলা কম হওয়ার বিষয়ে তিনি জনবলসংকটের কথা উল্লেখ করেন। একই সঙ্গে মহাসড়কে নিষিদ্ধ যান চলাচলের বিষয়টি গণমাধ্যমে তুলে ধরে সমাধানে ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান।

মহাসড়কে ধীরগতির ও অননুমোদিত যানবাহনের অবাধ চলাচল নিয়ে স্থানীয়দের উদ্বেগের মূল বিষয় হলো নিরাপত্তা। দূরপাল্লার বাস ও ভারী যানবাহনের সঙ্গে একই সড়কে এসব যান চলাচল অব্যাহত থাকলে দুর্ঘটনার ঝুঁকি আরও বাড়তে পারে বলে মনে করছেন পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। তাই নিষেধাজ্ঞা বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের নিয়মিত নজরদারি ও কার্যকর পদক্ষেপের ওপরই এখন গুরুত্ব দিচ্ছেন তাঁরা।

১২৩ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০















সর্বশেষ সব খবর
সারাদেশ নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

২৫০ x ২৫০


বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০