ইসরায়েলকে ৪০ হাজার ভারী বোমা দিতে প্রস্তুত ট্রাম্প প্রশাসন
বুধবার, ১৬ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ৭:৩২ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
ইসরায়েলের কাছে ২ হাজার পাউন্ড ওজনের ৪০ হাজার বোমা বিক্রির প্রস্তুতি নিচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। প্রায় ২৮০ কোটি ডলারের এই অস্ত্রচুক্তি কার্যকর হলে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে ইসরায়েলের কাছে এ ধরনের অস্ত্রের সবচেয়ে বড় একক চালান হতে পারে বলে জানিয়েছে দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট।
যুক্তরাষ্ট্রের একজন কর্মকর্তার বরাত দিয়ে দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট জানিয়েছে, প্রস্তাবিত চুক্তির আওতায় ২ হাজার পাউন্ড ওজনের ৪০ হাজার বোমা ইসরায়েলকে দেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে। এর মধ্যে ২০ হাজার এমকে-৮৪ এবং ২০ হাজার বিএলইউ-১১৭ বোমা রয়েছে। পাশাপাশি ২০ হাজার আই-২০০০ পেনিট্রেটর ওয়ারহেডও সরবরাহের তালিকায় রাখা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, অস্ত্র বিক্রির বিষয়ে মার্কিন কংগ্রেসের সংশ্লিষ্ট কমিটিগুলোকে অনানুষ্ঠানিকভাবে জানানো হয়েছে। চুক্তিটির সম্ভাব্য মূল্য প্রায় ২৮০ কোটি ডলার।
এমকে-৮৪ যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক অস্ত্রভাণ্ডারের অন্যতম শক্তিশালী প্রচলিত বোমা। বিস্ফোরণের পর এর ধাতব টুকরো ব্যাপক এলাকায় ছড়িয়ে পড়তে পারে। বোমাটি কংক্রিট ও লোহার কাঠামো ভেদ করার পাশাপাশি মাটিতে বড় গর্ত তৈরি করতে সক্ষম।
বিএলইউ-১১৭ মূলত এমকে-৮৪-এর একটি বিশেষ সংস্করণ। এতে তাপ প্রতিরোধী আবরণ থাকায় নৌবাহিনীর গুদামে সংরক্ষণের উপযোগী করে তৈরি করা হয়েছে। আর আই-২০০০ পেনিট্রেটর ওয়ারহেড ভূগর্ভস্থ স্থাপনা বা শক্তিশালী কাঠামো ধ্বংসের কাজে ব্যবহারের জন্য তৈরি।
যদিও চুক্তিটিকে অস্ত্র বিক্রি হিসেবে উল্লেখ করা হচ্ছে, এর অর্থায়ন হবে ‘ফরেন মিলিটারি ফাইন্যান্সিং’ কর্মসূচির মাধ্যমে। অর্থাৎ, ইসরায়েলকে অস্ত্র কেনার জন্য যে অর্থ দেওয়া হবে, তার জোগান দেবে যুক্তরাষ্ট্র। সেই অর্থের উৎস মূলত মার্কিন করদাতাদের অর্থ।
চুক্তিটি নিয়ে দ্য ওয়াশিংটন পোস্ট জানতে চাইলে ট্রাম্প প্রশাসনের একজন জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, বিদেশে অস্ত্র বিক্রির সব সিদ্ধান্ত যথাযথ প্রক্রিয়া অনুসরণ করেই নেওয়া হয়। প্রক্রিয়াধীন কোনো বিষয় নিয়ে প্রশাসন মন্তব্য করে না। ইসরায়েলি দূতাবাসও এ বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হয়নি।
প্রস্তাবিত এই চুক্তির আকার প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন ও ট্রাম্পের আগের প্রশাসনগুলোর সময়ে ২ হাজার পাউন্ডের বোমা বিক্রির রেকর্ড ছাড়িয়ে যাবে। এর আগে ২০২৫ সালে কংগ্রেসের সাধারণ পর্যালোচনা প্রক্রিয়া এড়িয়ে ইসরায়েলের কাছে ২ দশমিক ০৪ বিলিয়ন ডলারের একটি অস্ত্রের চালান পাঠিয়েছিল ট্রাম্প প্রশাসন।
গাজা ও লেবাননে ইসরায়েলি সামরিক অভিযানে এ ধরনের ভারী বোমার ব্যবহার নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই বিতর্ক রয়েছে। গাজায় ইসরায়েলের ঘোষিত নিরাপদ এলাকাতেও এমকে-৮৪ বোমা ব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে।
মার্কিন সেনাবাহিনীর সাবেক বিস্ফোরক বিশেষজ্ঞ ট্রেভর বল বলেন, ভবন ধ্বংসের জন্য এ ধরনের বোমা ব্যবহারে সামরিক বাহিনীর আগ্রহ থাকে। কারণ একটি এমকে-৮৪ বোমা একটি ভবন ধসিয়ে দিতে সক্ষম।
২০২৪ সালে গাজায় বেসামরিক মানুষের প্রাণহানির আশঙ্কা দেখিয়ে ইসরায়েলের জন্য ২ হাজার পাউন্ডের বোমার একটি চালান আটকে দিয়েছিল বাইডেন প্রশাসন। তবে ২০২৫ সালের জানুয়ারিতে ক্ষমতায় ফিরে ট্রাম্প প্রশাসন সেই নীতি পরিবর্তন করে।
ইন্টারন্যাশনাল ক্রাইসিস গ্রুপের জ্যেষ্ঠ উপদেষ্টা ব্রায়ান ফিনুকেন বলেন, গাজা ও লেবাননের দক্ষিণাঞ্চলের ঘনবসতিপূর্ণ এলাকায় ইসরায়েলের বিমান হামলার কারণে এ ধরনের অস্ত্র ব্যবহারের বিষয়ে উদ্বেগ রয়েছে। ইসরায়েল কোন কোন স্থাপনাকে বৈধ সামরিক লক্ষ্য হিসেবে বিবেচনা করছে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
এদিকে পশ্চিম তীরে ইসরায়েলি বসতি স্থাপনকারীদের সহিংসতা, লেবানন ও সিরিয়ায় ইসরায়েলি সামরিক অভিযান এবং গাজা যুদ্ধের বিভিন্ন বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে মতপার্থক্য তৈরি হলেও ওয়াশিংটন নতুন অস্ত্রচুক্তির উদ্যোগ নিয়েছে।
গাজা নিয়ে ট্রাম্প প্রশাসনের প্রস্তাবিত শান্তি পরিকল্পনাও ইসরায়েল প্রত্যাখ্যান করেছে। ওই পরিকল্পনায় ইসরায়েলি বাহিনী প্রত্যাহারের বিনিময়ে হামাসের নিরস্ত্রীকরণের প্রস্তাব ছিল।
এ ছাড়া যুদ্ধ বন্ধে একটি স্বল্পস্থায়ী চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতার পর ইসরায়েলের প্রধানমন্ত্রী বেনিয়ামিন নেতানিয়াহুর মিত্রদের মধ্যেও সমালোচনা দেখা যায়। চুক্তিতে মধ্যস্থতার ভূমিকার জন্য মার্কিন ভাইস প্রেসিডেন্ট জেডি ভ্যান্সও সমালোচনার মুখে পড়েন।
অন্যদিকে, প্রস্তাবিত অস্ত্রচুক্তি নিয়ে মার্কিন কংগ্রেসেও বিরোধিতা দেখা দিয়েছে। সিনেটের বৈদেশিক সম্পর্কবিষয়ক কমিটি এবং প্রতিনিধি পরিষদের পররাষ্ট্রবিষয়ক কমিটির নেতাদের কাছ থেকে অনুমোদন পাওয়ার জন্য ট্রাম্প প্রশাসন কাজ করছে।
ডেমোক্র্যাটিক সিনেটর ক্রিস ভ্যান হোলেন মঙ্গলবার জানান, তিনি এই অস্ত্র বিক্রির বিরুদ্ধে জনমত গড়ে তুলবেন। তিনি অভিযোগ করেন, মার্কিন করদাতাদের অর্থে ইসরায়েলকে এমন অস্ত্র দেওয়া হচ্ছে, যা গাজা ও লেবাননে ব্যবহৃত হচ্ছে।
ইসরায়েলকে মার্কিন সামরিক সহায়তা নিয়েও যুক্তরাষ্ট্রে বিতর্ক রয়েছে। রিপাবলিকান ও ডেমোক্র্যাট—দুই দলের অনেক নেতা ঐতিহাসিকভাবে ইসরায়েলের প্রতি সামরিক সহায়তাকে সমর্থন করে এলেও গাজা ও ইরান সংঘাতের প্রেক্ষাপটে দলের ভেতরে এ নিয়ে মতপার্থক্য বেড়েছে।
জুলাইয়ে প্রতিনিধি পরিষদের শতাধিক ডেমোক্র্যাট সদস্য ইসরায়েলের জন্য সব ধরনের মার্কিন সহায়তা বন্ধের পক্ষে ভোট দেন। একই সময়ে ইসরায়েলকে যুক্তরাষ্ট্রের বার্ষিক ৩ দশমিক ৮ বিলিয়ন ডলারের সহায়তা নিয়েও রক্ষণশীল মহলের কয়েকজন বিশ্লেষক প্রশ্ন তুলেছেন।
১০৮ বার পড়া হয়েছে