সর্বশেষ

ধর্ম

আখেরি চাহার সোম্বা: ইতিহাস, সহিহ হাদিস ও আমাদের করণীয়

শাব্বির আহমাদ
শাব্বির আহমাদ

বৃহস্পতিবার, ১৩ আগস্ট, ২০২৬ ১:০৯ পূর্বাহ্ন

শেয়ার করুন:
আখেরি চাহার সোম্বা নিয়ে আমাদের সমাজে প্রচলিত নানা ধারণা ও আচার-অনুষ্ঠান দেখা যায়। তবে ইসলামি
শরিয়ত, সীরাতের বিশুদ্ধ ইতিহাস এবং সহিহ হাদিসের আলোকে পর্যালোচনা করলে দেখা যায়, সমাজে প্রচলিত
অনেক ধারণার সঙ্গেই নির্ভরযোগ্য দলিলের পার্থক্য রয়েছে। বিষয়টির সঠিক চিত্র বুঝতে হলে সীরাতের
সোর্স, সহিহ হাদিসের বর্ণনা এবং পরবর্তীতে ভারতীয় উপমহাদেশে প্রচলিত লোকাচারকে আলাদাভাবে
বিশ্লেষণ করা জরুরি।

আখেরি চাহার সোম্বা কী এবং এর প্রচলিত পটভূমি?

ফারসি শব্দ ‘আখেরি’ অর্থ শেষ এবং ‘চাহার সোম্বা’ অর্থ বুধবার। সহজ কথায়, আখেরি চাহার সোম্বা বলতে
সফর মাসের শেষ বুধবারকে বোঝায়। বাংলাদেশসহ ভারতীয় উপমহাদেশে দিনটি একটি বিশেষ ঐতিহাসিক ও
ধর্মীয় স্মারক হিসেবে পরিচিত। সাধারণ সমাজে প্রচলিত ধারণা হলো—রাসুলুল্লাহ ﷺ তাঁর জীবনের শেষ অসুস্থতার সময় সফর মাসের শেষ বুধবার কিছুটা সুস্থতা বোধ করেছিলেন এবং গোসল করেছিলেন। এই ঘটনাকে কেন্দ্র করেই পরবর্তীতে দিনটিকে কেন্দ্র করে বিশেষ স্মরণ ও কিছু আচার-অনুষ্ঠান চালু হয়।

তবে এখানে প্রধান মৌলিক প্রশ্ন হলো: রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর অসুস্থতা, গোসল এবং শেষ জীবনের ঘটনাগুলো সহিহ
হাদিসে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হলেও, সেগুলো নিশ্চিতভাবে সফর মাসের শেষ বুধবারেই ঘটেছিল কি না এবং সাহাবায়ে কেরাম প্রতিবছর দিনটিকে বিশেষভাবে উদযাপন করেছিলেন কি না—তার সুনির্দিষ্ট শরয়ি প্রমাণ মেলেনি। সহিহ হাদিসের আলোকে রাসুল ﷺ-এর শেষ অসুস্থতা রাসুলুল্লাহ ﷺ জীবনের শেষভাগে মারাত্মক অসুস্থ হয়ে পড়েন। অসুস্থতা বৃদ্ধি পেলে তিনি স্ত্রীদের সম্মতিক্রমে আয়েশা (রা.)-এর ঘরে অবস্থানের ইচ্ছা প্রকাশ করেন এবং সেখানেই তাঁর সেবা-শুশ্রূষা করা হয়। সহিহ বুখারিতে আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত হয়েছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ তাঁর তীব্র অসুস্থতার সময় বলেছিলেন: 'তোমরা আমার ওপর সাতটি ভিন্ন মশক (পানির পাত্র) থেকে পানি ঢালুক, যাতে আমি স্বস্তি পেয়ে মানুষের উদ্দেশ্যে কিছু উপদেশ দিতে পারি।'

অন্য হাদিসেও এসেছে, অসুস্থতার তীব্রতায় তিনি একাধিকবার গোসলের চেষ্টা করেন এবং একপর্যায়ে অচেতন হয়ে পড়েন। সুতরাং, রাসুলুল্লাহ ﷺ অসুস্থ অবস্থায় গোসল করেছিলেন—এ বিষয়টি বিশুদ্ধ হাদিস দ্বারা পুরোপুরি
প্রমাণিত। তবে সেখান থেকে সরাসরি সফর মাসের শেষ বুধবারের গোসলকে একটি বিশেষ বা বার্ষিক হিসেবে নির্দিষ্ট করার কোনো ভিত্তি নেই। ‘সাত মশক পানি ঢালা’ ও সুস্থতার খবরের বাস্তবতা এখানে দুটি বিষয় আলাদা করা দরকার: ১. প্রমাণিত বিষয়: রাসুলুল্লাহ ﷺ অসুস্থতার তীব্রতা কমাতে সাত মশক পানি দিয়ে গোসল করেছিলেন, যাতে তিনি মসজিদে গিয়ে সাহাবিদের শেষ উপদেশ দিতে পারেন। ২. যা প্রমাণিত নয়: সফর মাসের শেষ বুধবারে সাধারণ মুসলমানদের জন্য সাত মশক পানি দিয়ে গোসল করা একটি স্বতন্ত্র সুন্নত বা নেকি অর্জনের বিশেষ মাধ্যম।

অনুরূপভাবে, প্রচলিত বর্ণনায় বলা হয় যে ওই বুধবারে তিনি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু সহিহ বুখারি
ও সহিহ মুসলিমের নির্ভরযোগ্য বর্ণনা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর শেষ অসুস্থতা ছিল অত্যন্ত
কঠিন ও ধারাবাহিক। তিনি ওই সময় কিছুটা স্বস্তি পেলেও রোগমুক্ত হননি, বরং রবিউল আউয়াল মাসে সোমবার
দিন ইন্তেকাল করেন।

সাহাবায়ে কেরাম কি দিনটি উদযাপন করেছিলেন?

ইসলামি ইতিহাসের বিশুদ্ধ সূত্র পর্যবেক্ষণ করলে দেখা যায়—সাহাবায়ে কেরাম (রা.), তাবেঈন কিংবা তাবে-
তাবেঈনদের যুগ থেকে আখেরি চাহার সোম্বাকে বিশেষ কোনো ধর্মীয় উৎসব বা বিশেষ দিন হিসেবে পালন
করার প্রমাণ পাওয়া যায় না।
যেমন সহিহ কোনো রেওয়ায়েতে পাওয়া যায় না যে সাহাবিরা:

● সফর মাসের শেষ বুধবারকে বিশেষ দিন নির্ধারণ করেছিলেন।
● প্রতিবছর এ দিনে বিশেষ কোনো চার রাকাত বা অন্য কোনো নামাজ পড়েছেন।
● বিশেষ গোসলকে প্রথা বানিয়েছেন।
● মীলাদ-মাহফিল বা শুকরিয়া দিবস পালন করেছেন।

এমনকি প্রচলিত কিছু ওয়াজ বা বইপুস্তকে দাবি করা হয়—রাসুল ﷺ-এর সুস্থতার খবর শুনে আবু বকর (রা.)
৫০০০ দিরহাম, উমর (রা.) ৭০০০ দিরহাম, আলী (রা.) ৩০০০ দিরহাম এবং আবদুর রহমান ইবন আউফ
(রা.) ১০০টি উট সদকা করেছিলেন। কিন্তু সংখ্যাভিত্তিক এসব বর্ণনার কোনো সহিহ শরয়ি ভিত্তি ও নির্ভরযোগ্য
সনদ নেই। ইসলামে কোনো তথ্য প্রচারের ক্ষেত্রে সত্যতা যাচাই করা অপরিহার্য। আল্লাহ তাআলা বলেন:

'যে বিষয়ে তোমার সুস্পষ্ট জ্ঞান নেই, তার অনুসরণ করো না।' (সূরা আল-ইসরা, ১৭:৩৬)
সফর মাস নিয়ে জাহেলি কুসংস্কার জাহেলি যুগে আরবদের ধারণা ছিল সফর মাস অশুভ এবং এ মাসে বিপদ-আপদ বেশি নাজিল হয়। রাসুলুল্লাহ ﷺ এই ভুল আকিদাকে স্পষ্টভাবে প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন:
'রোগের কোনো সংক্রামক ক্ষমতা নিজের থেকে নেই, সফর মাসের কোনো অশুভ প্রভাব নেই...' (সহিহ
বুখারি)

অতএব, ‘সফর মাস অশুভ’ বলা যেমন বিভ্রান্তিকর, তেমনি ‘সফর মাসের শেষ বুধবার বিশেষ বিপদমুক্তির
দিন’—এমন সুনির্দিষ্ট আকিদা পোষণ করার জন্যও শরয়ি দলিলের প্রয়োজন। স্থানীয় লোকাচার ও ‘সাত সালাম’
বাংলাদেশ ও উপমহাদেশের কিছু এলাকায় এ দিনে কুরআনের সাত সালাম সম্বলিত আয়াত লিখে তা ধোয়া পানি
পান করার রীতি চালু রয়েছে। এটি মূলত একটি আঞ্চলিক লোকাচার। রাসুলুল্লাহ ﷺ বা সাহাবিরা আখেরি
চাহার সোম্বা উপলক্ষে এ জাতীয় বিশেষ আমল শিখিয়ে যাননি। তাই এটাকে দ্বীনের অংশ বা আখেরি চাহার
সোম্বার বিশেষ সুন্নত হিসেবে প্রচার করা সঠিক নয়।

এই দিনে একজন মুসলিমের করণীয় কী?

আখেরি চাহার সোম্বাকে বিশেষ কোনো উৎসব বা বিশেষ পদ্ধতির ইবাদতের দিন মনে না করে একজন
মুসলমান স্বাভাবিক নেক আমল অব্যাহত রাখতে পারেন:

● পাঁচ ওয়াক্ত ফরজ নামাজ: সময়মতো গুরুত্বের সঙ্গে আদায় করা।
● কুরআন তিলাওয়াত ও জিকির: সাধারণ নেক আমল হিসেবে নিয়মিত তিলাওয়াত করা।
● দরুদ শরিফ পাঠ: রাসুল ﷺ-এর প্রতি ভালোবাসার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে বেশি বেশি দরুদ পাঠ করা।
● দান-সদকা: সাধ্যমতো গরিব-দুঃখীকে সাহায্য করা।
● সীরাত অধ্যয়ন: রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর শেষ জীবনের অসুস্থতা, তাঁর ধৈর্য, উম্মতের প্রতি তাঁর অগাধ
ভালোবাসা এবং মসজিদে প্রদত্ত শেষ উপদেশগুলো বেশি করে অধ্যয়ন করা।
মূল শিক্ষা ও উপসংহার

আখেরি চাহার সোম্বার আলোচনার মূল সুর হওয়া উচিত রাসুলুল্লাহ ﷺ-এর সুন্নাহ ও শেষ জীবনের শিক্ষা গ্রহণ।
মৃত্যুর পূর্বমুহূর্তেও রাসুলুল্লাহ ﷺ নামাজের ব্যাপারে যেভাবে জোর দিয়েছিলেন, উম্মতকে যে ঐক্য ও আদর্শের
নির্দেশ দিয়ে গিয়েছিলেন—তা আমাদের জীবনে বাস্তবায়ন করাই ভালোবাসা প্রমাণের শ্রেষ্ঠ উপায়।
কোনো দিনকে কেন্দ্র করে শরিয়ত-অসমর্থিত বিশেষ নিয়ম-কানুন তৈরি না করে, মহানবীর ﷺ সহিহ সুন্নাহ
অনুসরণ ও তাঁর রেখে যাওয়া আদর্শ আঁকড়ে ধরাই মুমিনের মূল দায়িত্ব।

১১৮ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন
এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন














সর্বশেষ সব খবর
ধর্ম নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

২৫০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন