সর্বশেষ

ধর্ম

আত্মজিজ্ঞাসার আলোকে আধ্যাত্মিক অভিযাত্রা

খাজা মাসুম বিল্লাহ কাওছারী
খাজা মাসুম বিল্লাহ কাওছারী

সোমবার, ১০ আগস্ট, ২০২৬ ৭:৫০ অপরাহ্ন

শেয়ার করুন:
আমার জীবন মূলত এক অনিশ্চিত ও ক্ষণস্থায়ী অস্তিত্বের নাম। আমি জন্মগ্রহণ করেছি পৃথিবীর বহুমাত্রিক আকর্ষণ ও সম্পর্কের মধ্যে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য। একসময় অনিবার্য মৃত্যুর সম্মুখীন আমাকে হতে হবে। মানুষ হিসেবে এই জীবনযাত্রার মধ্যেই কখনো নিজেকে সর্বশক্তিমান মনে হয়। আবার কখনো অস্তিত্বের অসহায়ত্ব উপলব্ধি করে স্রষ্টার কাছে আশ্রয় অনুসন্ধান করি।
খাজা মাসুম বিল্লাহ কাওছারী

আধ্যাত্মিক দর্শনের দৃষ্টিতে মানুষের এই দ্বৈত অভিজ্ঞতা অহংকার ও অসহায়ত্ব, মোহ ও মুক্তির আকাঙ্ক্ষা, ভয় ও আশ্বাস মানবজীবনের অন্যতম মৌলিক অস্তিত্বগত সত্য।
“আল্লাহ আমি সৃষ্টি, তুমি স্রষ্টা” এই উপলব্ধির মধ্যে আমার সৃষ্টিগত সীমাবদ্ধতা। স্রষ্টার পরম ক্ষমতার একটি মৌলিক দার্শনিক স্বীকৃতি নিহিত রয়েছে। মানুষ তার কর্ম, জ্ঞান, সম্পদ কিংবা সামাজিক ক্ষমতার মাধ্যমে পৃথিবীতে সাময়িক প্রভাব বিস্তার করতে পারে। কিন্তু তার জন্ম, মৃত্যু এবং অস্তিত্বের মৌলিক নিয়ন্ত্রণ তার নিজের হাতে নেই। সে কখন জীবন থেকে বিচ্ছিন্ন হবে, কখন তার পার্থিব যাত্রার সমাপ্তি ঘটবে এ বিষয়ে মানুষের ক্ষমতা সীমিত। ফলে আত্মঅহংকারের পরিবর্তে বিনয়, আত্মনির্ভরতার পরিবর্তে স্রষ্টানির্ভরতা এবং ক্ষমতার প্রদর্শনের পরিবর্তে নৈতিক দায়িত্ববোধই হয়ে ওঠে পরিণত মানবচেতনার পরিচায়ক।
মানুষের আরেকটি মৌলিক দুর্বলতা হলো সময় ও পরিস্থিতির সঙ্গে তার চেতনার পরিবর্তন। অন্ধকার রাত মানুষকে মৃত্যুভয়, অনিশ্চয়তা ও অসহায়ত্বের কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। কিন্তু সকাল হলে সে আবার দৈনন্দিন ব্যস্ততা, আকাঙ্ক্ষা ও পার্থিব কর্মব্যস্ততায় ফিরে যায়। এই মনস্তাত্ত্বিক বৈপরীত্য মানুষের আত্মবিস্মৃতির প্রতীক। বিপদের মুহূর্তে মানুষ স্রষ্টাকে স্মরণ করে। স্বস্তির সময়ে সেই স্মরণ অনেকাংশে ম্লান হয়ে যায়। আধ্যাত্মিক জীবন কেবল সংকটকালের প্রার্থনা নয়। সুখ-দুঃখ, ভয়-নিরাপত্তা এবং লাভ-ক্ষতির ঊর্ধ্বে একটি স্থায়ী নৈতিক ও আত্মিক সচেতনতা মাত্র।
মানুষের কর্মজীবনেও একই ধরনের আত্মবিভ্রান্তি লক্ষ করা যায়। ক্ষমতা, সম্পদ, ভোগ, সামাজিক মর্যাদা এবং পার্থিব সাফল্যের পেছনে ছুটতে গিয়ে মানুষ কখনো কখনো নিজের অস্তিত্বের গভীরতর উদ্দেশ্যকে ভুলে যায়। “কর্মবলে মর্মভূলে, অসার কার্য” এই ধারণা মূলত এমন এক জীবনব্যবস্থার সমালোচনা করে। যেখানে কর্ম আছে কিন্তু কর্মের নৈতিক অর্থ নেই। অর্জন আছে কিন্তু আত্মিক পরিতৃপ্তি নেই। গতি আছে কিন্তু গন্তব্যের উপলব্ধি নেই। জীবন তখন নদীর স্রোতে ভেসে চলা এক নৌকার মতো হয়ে পড়ে, যার যাত্রী জানে না সে কোন তীরে পৌঁছাবে।

এই অবস্থায় “কাণ্ডারি” বা পথপ্রদর্শকের ধারণাটি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ। আধ্যাত্মিক অর্থে কাণ্ডারি হলো সেই পরম আশ্রয়, যিনি জীবনের অস্থির স্রোত, নৈতিক বিপর্যয় ও অস্তিত্বগত অনিশ্চয়তার মধ্য দিয়ে মানুষকে নিরাপদ তীরে পৌঁছানোর পথ দেখান। মানুষের জ্ঞান সীমিত কিন্তু তার আত্মিক আকাঙ্ক্ষা অসীম। তাই স্রষ্টার প্রতি আস্থা মানুষের অস্তিত্বকে অর্থবহ করে এবং তাকে নৈতিক দায়িত্বের দিকে পরিচালিত করে।
এই দর্শনের সঙ্গে মানবমর্যাদার প্রশ্নটিও গভীরভাবে যুক্ত। মানুষের বাহ্যিক পরিচয়, দারিদ্র্য, দুর্বলতা, পোশাক, পেশা কিংবা সামাজিক অবস্থান দেখে কাউকে অবজ্ঞা করা মূলত মানবিক মর্যাদার অস্বীকৃতি। অথচ প্রত্যেক মানুষের অন্তরে রয়েছে অনুভূতি, আত্মসম্মান এবং স্রষ্টাপ্রদত্ত মর্যাদা বোধ। সামাজিক অবস্থানের পার্থক্য মানুষকে মূল্যগতভাবে ছোট-বড় করে না। বরং একজন মানুষের প্রকৃত মূল্য নির্ধারিত হয় তার চরিত্র, নৈতিকতা, সহমর্মিতা ও মানবিক আচরণের দ্বারা।
অন্যকে অপমান করা বা অবজ্ঞা- হ্যাঁও প্রতিপন্ন করা কেবল ব্যক্তিগত অসম্মান নয়। এটি বৃহত্তর মানবিক নৈতিকতার ওপর আঘাত করা। ক্ষমতাবান ব্যক্তি দুর্বলকে অবজ্ঞা করতে পারে। ধনী ব্যক্তি দরিদ্রকে তুচ্ছ তাছিল্য করতে পারে। শিক্ষিত ব্যক্তি অশিক্ষিতকে হেয় করতে পারে। কিন্তু এই শ্রেণিবিন্যাস কোনো মানুষের অন্তর্নিহিত মর্যাদাকে বিলুপ্ত করতে পারে না। প্রকৃত মহত্ত্ব শক্তি প্রদর্শনে নয় বরং নিজের শক্তিকে সংযত করে দুর্বল মানুষের প্রতি সহমর্মী হওয়ার মধ্যেই প্রকাশিত হয়। ভালোবাসা, সম্মান, ক্ষমাশীলতা ও বিনয় তাই মানবিক সভ্যতার মৌলিক নৈতিক ভিত্তি।

অন্যদিকে “আঁধারে ঘিরিলো কোথা যাই বলো" এই আত্মজিজ্ঞাসা মানুষের মৃত্যুচেতনার গভীরতম প্রকাশ। জীবনের অধিকাংশ সময় মানুষ ভবিষ্যৎ, সম্পদ, সম্পর্ক, ভোগ ও সাফল্য নিয়ে ব্যস্ত থাকে। কিন্তু মৃত্যুর সন্নিকটে এসে তার সামনে এক ভিন্ন বাস্তবতা উন্মোচিত হয়। তখন পার্থিব সম্পর্কের অনেক পরিচিত মুখ অনুপস্থিত। যাদের একসময় চিরস্থায়ী সঙ্গী মনে হয়েছিল, তারা প্রত্যেকে নিজ নিজ জীবনের পথে চলে গেছে। মানুষ উপলব্ধি করে পার্থিব যাত্রার শেষ পর্যায়ে প্রত্যেককেই একা দাঁড়াতে হয়।

মোহ-মায়া আর কামিনীর সঙ্গে কত রঙ্গে ঢঙ্গে জীবন অতিবাহিত করা। প্রেম, কামনা, সম্পদ, বিনোদন ও সামাজিক আকর্ষণ মানুষের জীবনে স্বাভাবিক হলেও এগুলো যখন জীবনের চূড়ান্ত উদ্দেশ্য হয়ে ওঠে, তখন মানুষ অস্তিত্বের গভীরতর সত্য থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। মৃত্যুচেতনা সেই মোহের পর্দা সরিয়ে দেয় এবং প্রশ্ন তোলে আমি কী অর্জন করেছি? কাকে ভালোবেসেছি? কাকে কষ্ট দিয়েছি এবং আমার জীবন কি সত্যিই কোনো নৈতিক অর্থ বহন করেছে?
কবর বা শ্মশান, মৃতদেহের গন্ধ, নিঃসঙ্গতা এবং অন্ধকারের প্রতীকগুলো এখানে কেবল মৃত্যুভয়ের চিত্র নয়। এগুলো আত্মসমালোচনার প্রতীক। মৃত্যুর মুখোমুখি দাঁড়িয়ে মানুষ বুঝতে পারে যে পার্থিব পরিচয়, ক্ষমতা ও সম্পদ কোনো কিছুই তাকে চিরস্থায়ী নিরাপত্তা দিতে পারে না। তখন তার প্রয়োজন হয় একজন পরম পথপ্রদর্শকের। যিনি তাকে অন্ধকার থেকে আলোর দিকে, আত্মবিস্মৃতি থেকে আত্মজ্ঞান এবং মোহ থেকে সত্যের দিকে পরিচালিত করবেন। আধ্যাত্মিক দর্শনের মূল শিক্ষা হলো মানুষ ক্ষণস্থায়ী, কিন্তু তার নৈতিক দায়িত্ব স্থায়ী অর্থ বহন করে। জীবন অনিশ্চিত, তাই অহংকার অর্থহীন। মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী তাই অন্যায় ও অপমান অর্থহীন। পার্থিব সম্পর্ক ক্ষণস্থায়ী তাই ভালোবাসা ও মানবিকতা অপরিহার্য। মানুষের শ্রেষ্ঠ পরিচয় তার সামাজিক অবস্থানে নয় বরং তার অন্তরের নৈতিকতায়।
মানুষের প্রকৃত মুক্তি বাহ্যিক অর্জনে নয় বরং আত্মপরিচয়, স্রষ্টাসচেতনতা, মানবমর্যাদার প্রতি শ্রদ্ধা এবং মৃত্যুচেতনা থেকে উদ্ভূত নৈতিক জীবনে। যে ব্যক্তি নিজের সীমাবদ্ধতা উপলব্ধি করে, অন্য মানুষকে সম্মান করে, পার্থিব মোহের প্রকৃতি বোঝে এবং জীবনের চূড়ান্ত গন্তব্য সম্পর্কে সচেতন থাকে। সে-ই প্রকৃত অর্থে আত্মিক অভিযাত্রায় অগ্রসর হতে পারে। অন্ধকার যত গভীরই হোক, পথের শেষ আশ্রয় সেই পরম কাণ্ডারি, স্রষ্টার প্রতি বিশ্বাস, আত্মসমর্পণ ও নৈতিক জীবনযাপন।


লেখকঃ সিনিয়র সাংবাদিক,গবেষক, বেসরকারি গবেষণা ও উন্নয়ন সংস্থার নির্বাহী পরিচালক।

১৭৪ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন
এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন














সর্বশেষ সব খবর
ধর্ম নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

২৫০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন