মাকে হারিয়েছেন আগেই, পরীক্ষায় বাবাকে হারিয়েও পেল জিপিএ-৫
বুধবার, ১২ আগস্ট, ২০২৬ ২:০১ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
মায়ের মৃত্যুর শোক তখনো কাটেনি। এর মধ্যেই এসএসসি পরীক্ষার সময় বাবাকেও হারায় নোভিদ হোসেন। ছেলের পরীক্ষা যেন নষ্ট না হয়, তাই বাবার মৃত্যুর খবর তার কাছ থেকে গোপন রাখে পরিবার। জীববিজ্ঞান পরীক্ষা শেষে কেন্দ্র থেকে বেরিয়ে সে জানতে পারে, বাবাও আর নেই। জানাজা ও দাফন শেষে আবার বই-খাতা নিয়ে বসতে হয় তাকে। সেই অসহনীয় শোককে সঙ্গে নিয়েই সব পরীক্ষা শেষ করে এবার জিপিএ-৫ পেয়েছে বাবা-মায়ের একমাত্র সন্তান নোভিদ।
জামালপুরের মাদারগঞ্জ উপজেলার আদারভিটা ইউনিয়নের পলিশা গ্রামের নোভিদ হোসেন এবার এসএসসি পরীক্ষায় জিপিএ-৫ পেয়েছে। তবে অন্য অনেক শিক্ষার্থীর মতো তার এই সাফল্যের পেছনে নেই শুধু পড়াশোনা, পরিশ্রম আর পরীক্ষার প্রস্তুতির গল্প। আছে বাবা-মাকে হারানোর গভীর শোক পেরিয়ে সামনে এগিয়ে যাওয়ার কঠিন এক অধ্যায়।
নোভিদ প্রয়াত শিক্ষক দম্পতি সুজাউদ্দিন সুজা ও কামরুন্নাহার এলিনার একমাত্র ছেলে। বাবা সুজাউদ্দিন সুজা পলিশা উচ্চ বিদ্যালয়ের শরীরচর্চার শিক্ষক ছিলেন। মা কামরুন্নাহার এলিনা মেলান্দহ উপজেলার চরসগুনা এস এম মোখলেছুর রহমান লাভলু মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষিকা ছিলেন।
প্রায় এক বছর আগে অসুস্থতাজনিত কারণে মারা যান নোভিদের মা। মায়ের মৃত্যুর শোক সামলে ওঠার আগেই এবার এসএসসি পরীক্ষার মাঝপথে বাবাকেও হারায় সে।
গত ১৯ মে রাতে স্ট্রোক করে অসুস্থ হয়ে পড়েন সুজাউদ্দিন সুজা। প্রথমে তাঁকে স্থানীয় একটি হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। পরে অবস্থার অবনতি হলে ঢাকার একটি হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে আইসিইউতে চিকিৎসাধীন ছিলেন তিনি।
২০ মে সকালে নোভিদের জীববিজ্ঞান পরীক্ষা ছিল। সেদিন সকাল আটটার দিকে মারা যান তার বাবা। কিন্তু পরীক্ষার কথা চিন্তা করে পরিবারের সদস্যরা নোভিদকে বাবার মৃত্যুর খবর জানাননি। এমনকি মৃত্যুর প্রায় দুই ঘণ্টা পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে খবরটি প্রকাশ করা হয়, যাতে পরীক্ষার আগে কোনোভাবে বিষয়টি তার কানে না যায়।
নোভিদ জামালপুরের বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ইউনাইটেড পাবলিক স্কুল অ্যান্ড কলেজ থেকে এসএসসি পরীক্ষায় অংশ নেয়। জীববিজ্ঞান পরীক্ষা শেষে কেন্দ্র থেকে বের হওয়ার পর সে জানতে পারে, তার বাবা আর নেই।
একদিকে বাবাকে হারানোর শোক, অন্যদিকে পরীক্ষার প্রস্তুতি—দুটিকে একসঙ্গে সামলাতে হয়েছে তাকে। বাবার জানাজা ও দাফন শেষে শেষবারের মতো বিদায় জানিয়ে আবার পড়াশোনায় মন দেয় নোভিদ। বুকের ভেতর বাবা-মাকে হারানোর কষ্ট নিয়েই পরবর্তী পরীক্ষাগুলো শেষ করে সে।
ফল প্রকাশের পর নোভিদের অর্জনে খুশি তার স্বজন, শিক্ষক ও এলাকাবাসী। তবে এই আনন্দের মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি মনে পড়ছে বাবা-মায়ের কথাই।
নোভিদ বলে, বাবা-মা বেঁচে থাকলে তার ফলাফল দেখে সবচেয়ে বেশি খুশি হতেন। সে সবাইকে তার বাবা-মায়ের জন্য দোয়া করতে অনুরোধ করেছে। পাশাপাশি বাবা-মায়ের স্বপ্ন পূরণ করতে পারে, সে জন্যও সবার কাছে দোয়া চেয়েছে।
মাদারগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) সুমন চৌধুরী বলেন, নোভিদের জিপিএ-৫ অর্জনের খবর অত্যন্ত আনন্দের। উপজেলা প্রশাসন এই মেধাবী শিক্ষার্থীর পাশে থাকবে। তার উচ্চশিক্ষার ক্ষেত্রে উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা করার চেষ্টা করা হবে।
বাবা-মায়ের স্নেহের ছায়া নেই, কিন্তু তাঁদের রেখে যাওয়া স্বপ্ন আছে। নোভিদের জিপিএ-৫ তাই শুধু একটি ফল নয়—অসহনীয় শোকের মধ্যেও থেমে না যাওয়ার এক অনুপ্রেরণার গল্প।
১১৭ বার পড়া হয়েছে