রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুলের নাম চূড়ান্ত করেছে বিএনপি
সোমবার, ১০ আগস্ট, ২০২৬ ৬:৩৩ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
বাংলাদেশের পরবর্তী রাষ্ট্রপতি হিসেবে বিএনপির মহাসচিব ও স্থানীয় সরকার, পল্লী উন্নয়ন ও সমবায়মন্ত্রী মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের মনোনয়ন প্রায় চূড়ান্ত করেছে ক্ষমতাসীন বিএনপি। দলের উচ্চপর্যায়ের একাধিক সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, বিএনপির চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাষ্ট্রপতি পদে মির্জা ফখরুলের নাম চূড়ান্ত করেছেন। রাষ্ট্রপতি প্রার্থী হওয়ার সম্মতিসূচক লিখিত বিবৃতিতেও তিনি স্বাক্ষর করেছেন বলে দলীয় সূত্র জানিয়েছে। এদিকে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় বিরোধী জোট রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিএনপির সাবেক নেতা ও এলডিপি চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদকে প্রার্থী ঘোষণা করেছে।
বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে এবার রাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। ক্ষমতাসীন বিএনপি মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে দলীয় উচ্চপর্যায়ের একাধিক সূত্র জানিয়েছে। যদিও এ বিষয়ে বিএনপির পক্ষ থেকে এখনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা দেওয়া হয়নি।
দলীয় সূত্রের বরাত দিয়ে জানা গেছে, রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী হওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় সম্মতিসূচক লিখিত বিবৃতিতে মির্জা ফখরুল গত শনিবার স্বাক্ষর করেছেন। রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন অনুযায়ী, মনোনয়নপত্র দাখিলের সময় সংসদ সদস্যের প্রস্তাব ও সমর্থনের পাশাপাশি প্রার্থীকে ওই পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা ও দায়িত্ব পালনে সম্মত থাকার বিষয়ে স্বাক্ষর করা ঘোষণা বা বিবৃতি জমা দিতে হয়।
এর আগে গত ২ আগস্ট বিএনপির জাতীয় স্থায়ী কমিটির বৈঠকে রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী মনোনয়নের দায়িত্ব দলীয় চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানকে দেওয়া হয়। এরপর থেকেই মির্জা ফখরুলের নাম আলোচনায় আসে।
মির্জা ফখরুল ২০১১ সালে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্ব পান। ২০১৬ সালে দলের জাতীয় কাউন্সিলে তাঁকে আনুষ্ঠানিকভাবে মহাসচিব নির্বাচিত করা হয়। দীর্ঘ রাজনৈতিক জীবনে তিনি বিএনপির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ ও গ্রহণযোগ্য নেতায় পরিণত হয়েছেন। আওয়ামী লীগ সরকারের সময়ে তিনি একাধিকবার কারাবরণ করেন এবং প্রতিকূল রাজনৈতিক পরিস্থিতিতে দলের নেতৃত্বে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি হলে বিএনপির মহাসচিব পদে তাঁর উত্তরসূরি কে হবেন—এ প্রশ্ন ইতিমধ্যে দলের ভেতরে আলোচনায় এসেছে। সম্ভাব্য উত্তরসূরি হিসেবে স্থায়ী কমিটির সদস্য সালাহউদ্দিন আহমদ এবং দলের যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভীর নাম বেশি আলোচিত হচ্ছে।
দলীয় সূত্রগুলো বলছে, জাতীয় কাউন্সিলের আগে অথবা কাউন্সিলকে কেন্দ্র করে একজন ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব নিয়োগ করা হতে পারে। পরে জাতীয় কাউন্সিল বা তার আশপাশের সময়ে মহাসচিব পদে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
রুহুল কবির রিজভী এবারের জাতীয় নির্বাচনে প্রার্থী হননি এবং তাঁকে মন্ত্রিসভাতেও রাখা হয়নি। এ কারণে মহাসচিব পদ শূন্য হলে তাঁকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব করার সম্ভাবনা রয়েছে বলে বিএনপির দায়িত্বশীল নেতাদের কেউ কেউ মনে করছেন।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সামনে রেখে বিএনপি ইতিমধ্যে নির্বাচন কমিশন থেকে দুটি মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেছে। রোববার সকালে বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান ও জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ নুরুল ইসলাম মনি এবং দলের জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব ও প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক উপদেষ্টা রুহুল কবির রিজভী নির্বাচন কমিশনে গিয়ে সিইসির দপ্তর থেকে মনোনয়নপত্র সংগ্রহ করেন।
একই ব্যক্তির নামে একাধিক মনোনয়নপত্র দাখিলের সুযোগ রয়েছে বলে জানিয়েছে ইসি। একাধিক মনোনয়নপত্রের মধ্যে যেকোনো একটি বৈধ হলেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি বৈধ প্রার্থী হিসেবে বিবেচিত হবেন।
এর আগে সদ্য বিদায়ী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিনের নির্বাচনেও তাঁর নামে দুটি মনোনয়নপত্র জমা দেওয়া হয়েছিল।
এদিকে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতার সিদ্ধান্ত নিয়েছে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন ১১-দলীয় বিরোধী জোট। জোটের পক্ষ থেকে বিএনপির সাবেক নেতা ও লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান কর্নেল (অব.) অলি আহমদকে প্রার্থী ঘোষণা করা হয়েছে।
রোববার রাজধানীর মিন্টো রোডে বিরোধীদলীয় নেতার সরকারি বাসভবনে জোটের শীর্ষ নেতাদের বৈঠক শেষে বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম এ সিদ্ধান্ত জানান।
তিনি বলেন, জুলাই সনদ ও রাষ্ট্র সংস্কারের বিষয়ে বিএনপি প্রত্যাশিত উদ্যোগ নেয়নি। এ কারণে ঐক্যবদ্ধভাবে রাষ্ট্রপতি পদে একজন প্রার্থী দেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়নি। তাই ১১-দলীয় ঐক্যের পক্ষ থেকে আলাদাভাবে প্রার্থী দেওয়া হয়েছে।
রাষ্ট্রপতি পদে প্রার্থী মনোনীত হওয়ার পর কর্নেল (অব.) অলি আহমদ বলেন, একজন মুক্তিযোদ্ধা ও পরীক্ষিত ব্যক্তি হিসেবে এবং তাঁর বিরুদ্ধে দুর্নীতির অভিযোগ না থাকায় জোটের নেতারা সর্বসম্মতিক্রমে তাঁর নাম প্রস্তাব করেছেন। তিনি বলেন, রাষ্ট্রপতি পদে তাঁর প্রার্থিতা দেশের জনগণকে একটি রাজনৈতিক বার্তা দেবে।
জামায়াতে ইসলামীর আমির ও বিরোধীদলীয় নেতা শফিকুর রহমান বলেন, সর্বক্ষেত্রে রাজনীতি স্বচ্ছ ও প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক হওয়া উচিত। তাঁর মতে, প্রতিদ্বন্দ্বিতার মধ্য দিয়েই গণতন্ত্রের গতি ফিরে আসতে পারে।
নির্বাচন কমিশনের ঘোষিত তফসিল অনুযায়ী, আগামী ২০ আগস্ট বৃহস্পতিবার রাষ্ট্রপতি পদে ভোট গ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। ১৩ আগস্ট সকাল ১০টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত মনোনয়নপত্র দাখিল করা যাবে। প্রার্থিতা প্রত্যাহারের শেষ সময় ১৮ আগস্ট।
সংবিধান ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন, ১৯৯১ অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতি নির্বাচিত হন জাতীয় সংসদ সদস্যদের প্রকাশ্য ভোটে। প্রত্যেক সংসদ সদস্য একটি করে ভোট দিতে পারেন।
সংসদে ক্ষমতাসীন দলের একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকলে সাধারণত রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিরোধী দল প্রার্থী দেয় না। কারণ ভোটের ফলাফল আগে থেকেই অনেকটা নিশ্চিত থাকে। ১৯৯১ সালে সংসদীয় গণতন্ত্র পুনঃপ্রতিষ্ঠার পর কেবল ওই বছরই রাষ্ট্রপতি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতামূলক ভোট হয়েছিল। এরপর আর কোনো রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে বিরোধী দলের প্রার্থী দেওয়ার কারণে ভোটাভুটির প্রয়োজন হয়নি।
এবার সংসদে বিএনপির দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা থাকা সত্ত্বেও বিরোধী জোট প্রার্থী দিয়েছে। ফলে অলি আহমদ প্রার্থিতা প্রত্যাহার না করলে আগামী ২০ আগস্ট সংসদ কক্ষে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনে ভোট হওয়ার কথা রয়েছে।
সদ্য বিদায়ী রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন গত ২৪ জুলাই পদত্যাগ করার পর রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হয়। এরপর থেকে স্পিকার হাফিজ উদ্দিন আহমদ ভারপ্রাপ্ত রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব পালন করছেন।
সংবিধান ও রাষ্ট্রপতি নির্বাচন আইন অনুযায়ী, রাষ্ট্রপতির পদ শূন্য হওয়ার ৯০ দিনের মধ্যে নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সম্পন্ন করতে হয়। সেই ধারাবাহিকতায় নির্বাচন কমিশন ইতিমধ্যে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা করেছে এবং ভোট আয়োজনের প্রস্তুতি শুরু করেছে।
সব মিলিয়ে এবারের রাষ্ট্রপতি নির্বাচন শুধু নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের আনুষ্ঠানিকতা নয়; এর সঙ্গে বিএনপির অভ্যন্তরীণ নেতৃত্বের ভবিষ্যৎ সমীকরণও জড়িয়ে পড়েছে। মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর রাষ্ট্রপতি হলে প্রায় দেড় দশকের বেশি সময় ধরে বিএনপির মহাসচিবের দায়িত্ব পালন করা এই নেতার স্থলাভিষিক্ত কে হবেন, তা নিয়ে দলের ভেতরে নতুন করে আলোচনা ও সমীকরণ শুরু হওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। অন্যদিকে সংখ্যাগরিষ্ঠতার ব্যবধান জানা সত্ত্বেও বিরোধী জোটের অলি আহমদকে প্রার্থী করার সিদ্ধান্ত এবারের রাষ্ট্রপতি নির্বাচনকে রাজনৈতিকভাবে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে তুলেছে।
১৩৮ বার পড়া হয়েছে