গোলাম সামদানী কোরায়শী
শিকড় ও ডানার দ্বান্দ্বিকতায় এক অনন্য আলোকবর্তিকা
শনিবার, ৮ আগস্ট, ২০২৬ ১২:৩৪ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
গোলাম সামদানী কোরায়শীর জীবনকাহিনি পড়লে মনে হয়, তিনি যেন একাই এক মহাকাব্যিক বৈপরীত্যের সুন্দর সমন্বয় ঘটিয়েছিলেন। ভাবলে অবাক হতে হয়, একাধারে তিনি মাদ্রাসার সর্বোচ্চ ডিগ্রি ‘কামিল’ অর্জন করছেন প্রাচীন ধ্রুপদী জ্ঞানে অবগাহন করতে করতে, আবার অন্যদিকে বামপন্থী দর্শনের প্রগতিশীল আগুনে পুড়িয়ে নিচ্ছেন নিজের চেতনাকে। এই যে দুই মেরুর সহাবস্থান এটি কি কেবলই তাত্ত্বিক মিলন ছিল? নাকি ছিল এক গভীর সাধনার ফল? বিশ শতকের বাংলার বুদ্ধিবৃত্তিক মানচিত্রে তাকালে দেখা যায়, ধর্মতত্ত্ব ও সমাজতত্ত্ব প্রায়ই একে অপরের বিপরীতে দাঁড়িয়ে থাকত। কিন্তু কোরায়শী ছিলেন সেই বিরল পথিক, যিনি এই দুই আপাত-বিপরীত পথের মাঝখানে এক শৈল্পিক ও যৌক্তিক সেতুবন্ধন তৈরি করেছিলেন।
নেত্রকোনার সোঁদাল মাটির গন্ধে ঘেরা সেই গ্রামীণ শৈশব হয়তো তাঁর মনের গহীনে এক ধরণের আদি ও অকৃত্রিম সংবেদনশীলতা বুনে দিয়েছিল। পরবর্তীকালে ঢাকা আলিয়া মাদ্রাসার সেই বিশাল জ্ঞানভাণ্ডার তাঁকে দিয়েছিল ধ্রুপদী পাণ্ডিত্য। তবে তাঁর বিশেষত্ব এখানেই যে, তিনি প্রথাগত শিক্ষার সেই চৌহদ্দিতে নিজেকে বন্দি করে রাখেননি। অনেক সময় দেখা যায়, প্রাতিষ্ঠানিক পাণ্ডিত্য মানুষের চিন্তাকে আড়ষ্ট করে দেয়, কিন্তু তাঁর ক্ষেত্রে তা ঘটেনি। আন্তোনিও গ্রামশি যাকে ‘জৈব বুদ্ধিজীবী’ বা ‘অর্গানিক ইন্টেলেকচুয়াল’ বলেছেন, কোরায়শীর মাঝে সেই গুণাবলিই মূর্ত হয়ে উঠেছিল। গ্রামশির দর্শনে, জৈব বুদ্ধিজীবী কেবল আকাশচারী তাত্ত্বিক নন, বরং তিনি নিজের শেকড় আর সমাজের আকাঙ্ক্ষাকে বুদ্ধিবৃত্তিক ভাষায় রূপ দেন। কোরায়শী ঠিক তাই করেছিলেন। তিনি মাদ্রাসার সেই ধ্রুপদী ও কঠিন জ্ঞানকে কেবল পরকালের পাথেয় হিসেবে নয়, বরং বাঙালির ইহজাগতিক মুক্তি ও প্রগতির হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহারের সাহস দেখিয়েছিলেন।
তাঁর এই উত্তরণ কিন্তু খুব একটা সহজ ছিল না। এটি ছিল এক দীর্ঘ পথ চলা, যেখানে বাংলার নদীগুলোর মতো বাঁক ছিল অনেক। তিনি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা সাহিত্যে উচ্চশিক্ষা নিতে এলেন, তখন তাঁর সামনে খুলে গেল বিশ্বসাহিত্যের বিশাল জানালা। পাশ্চাত্যের আধুনিক সাহিত্যতত্ত্ব, দর্শন আর জীবনবোধের সঙ্গে তাঁর পরিচয় ঘটল। তিনি দেখলেন, অন্ধভাবে কোনো কিছু অনুকরণ করার নাম আধুনিকতা নয়; বরং নিজের ঐতিহ্যকে যুক্তির কষ্টিপাথরে যাচাই করে গ্রহণ করার নামই হলো প্রকৃত আধুনিকতা। লোকমুখে একটা কথা প্রচলিত আছে যে, যে গাছের শেকড় যত গভীরে, সেই গাছ তত বেশি ঝড় সইতে পারে। কোরায়শী ছিলেন সেই গভীর শেকড়ওয়ালা গাছ, যা আধুনিকতার যে কোনো প্রবল ঝড়কেও নিজের ঐতিহ্যের শক্তিতে ধারণ করতে জানতেন।
গোলাম সামদানী কোরায়শীর জ্ঞানতাত্ত্বিক অবদানের কথা উঠলে প্রথমেই তাঁর অসামান্য অনুবাদ কর্মের কথা চলে আসে। ইবনে খালদুনের ‘আল-মুকাদ্দিমা’ অনুবাদ করা কেবল একটি গ্রন্থকে এক ভাষা থেকে অন্য ভাষায় রূপান্তর করা ছিল না। এটি ছিল বাঙালির চিন্তার জগতে সমাজবিজ্ঞানের এক আদিম ও শক্তিশালী পাঠের তোরণ উন্মোচন করা। ওয়াল্টার বেঞ্জামিন বলেছিলেন যে, একজন সত্যিকারের অনুবাদকের কাজ হলো মূল পাঠের ভেতরে লুকিয়ে থাকা সেই ভাষাকে মুক্তি দেওয়া, যা কেবল সৃজনশীলতার স্পর্শেই জীবন্ত হতে পারে। কোরায়শী যেন সেই জাদুকরী কাজটিই করেছিলেন। মধ্যযুগীয় আরব্য সমাজতত্ত্বের সেই জটিল বুননগুলোকে তিনি বাংলার প্রবহমান ও সাবলীল গদ্যে এমনভাবে রূপ দিলেন যে, তা কেবল গবেষকদের লাইব্রেরিতে বন্দি থাকল না, সাধারণ মানুষের কাছেও হয়ে উঠল সহজপাঠ্য এক ঐতিহাসিক দলিল। ‘মুকাদ্দিমা’র পাতায় পাতায় তিনি বাঙালির চিন্তাজগতে সমাজ বিবর্তনের বিজ্ঞানসম্মত ব্যাখ্যা পৌঁছে দিয়েছিলেন।
একইভাবে ‘কালিলা ওয়া দিমনা’র কথা ধরা যাক। অনুবাদ সাহিত্যের এই বিশাল কাজে তিনি প্রাচ্য ও প্রতীচ্যের ধ্রুপদী গল্পের যে এক গভীর অন্তঃস্রোত রয়েছে, তাকে বাঙালির নিজস্ব সাহিত্যের আঙিনায় নতুন করে স্থাপন করেছিলেন। তাঁর অনুবাদ পড়লে মনে হয় না তা ভিনদেশি কোনো কাহিনি, বরং মনে হয় এ তো আমাদেরই কোনো চিরকালীন অভিজ্ঞতার ফসল। হান্স-জর্জ গাদামারের ‘ব্যাখ্যাবিজ্ঞান’ বা ‘হারমেনিউটিকস’-এর যে প্রয়োগ আমরা বড় বড় তাত্ত্বিকদের লেখায় দেখি, কোরায়শীর কাজে তার এক স্বাভাবিক প্রয়োগ লক্ষ্য করা যায়। তিনি অতীতকে বর্তমানের চোখের সামনে এনে দাঁড় করিয়েছিলেন, যেখানে প্রাচীন প্রজ্ঞা আধুনিক জীবনের প্রয়োজন অনুযায়ী নতুন অর্থ তৈরি করে।
কিন্তু রাজনীতির ময়দানে কোরায়শীর অবস্থান ছিল আরও চমকপ্রদ। তিনি ছিলেন এক ব্যতিক্রমী সংশ্লেষবাদী। তিনি মার্ক্সবাদের দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদকে যেমন গ্রহণ করেছিলেন, তেমনি ইসলামের সাম্যবাদী ও মানবিক আর্তিকেও কখনো অগ্রাহ্য করেননি। ন্যাপ (মোজাফফর) এবং বামপন্থী আন্দোলনের সঙ্গে তাঁর ছিল নাড়ির টান। তবে তাঁর এই বামপন্থা কোনো দলীয় স্লোগান ছিল না; এটি ছিল বঞ্চিত মানুষের প্রতি এক নিগূঢ় ভালোবাসা আর দায়বদ্ধতা। তিনি মনে-প্রাণে বিশ্বাস করতেন, ধর্মের যে মূল নির্যাস সাম্য ও মানবতা আর মার্ক্সবাদের যে লক্ষ্য শোষণমুক্ত সমাজ এই দুইয়ের উৎস এক জায়গাতেই। সেটি হলো মানুষের মুক্তি। তাঁর মতে, ধর্ম যখন মানুষকে আত্মিক শক্তি আর সাম্যের শিক্ষা দেয়, তখন তা প্রগতির পথে হতে পারে এক পরম সহায়ক।
এই দর্শনের প্রতিফলন দেখা যায় তাঁর ধর্মতাত্ত্বিক বিশ্লেষণেও। তিনি ধর্মের রাজনৈতিক অপব্যবহারের বিরুদ্ধে সবসময় সোচ্চার ছিলেন। তিনি দেখেছিলেন কীভাবে বাংলার লোকজ সংস্কৃতি আর সুফিবাদী দর্শনের অসাম্প্রদায়িক আবহ আমাদের সমাজকে শতাব্দী ধরে রক্ষা করে এসেছে। তাই তিনি সুফিবাদকে কেবল আধ্যাত্মিক সাধনা হিসেবে দেখেননি, বরং একে দেখেছিলেন এক সামাজিক প্রতিরোধ হিসেবে।
সাহিত্যের ইতিহাস চর্চায় কোরায়শীর দৃষ্টিভঙ্গি ছিল অত্যন্ত নিবিড় ও নির্মোহ। বাংলা সাহিত্যে মুসলিম কবিদের অবদান নিয়ে তাঁর কাজগুলো কোনো সাম্প্রদায়িক পরিচয় বড় করে দেখানোর চেষ্টা ছিল না। বরং তিনি চেয়েছিলেন বাঙালির সামগ্রিক সাংস্কৃতিক পরিচয়ের অখণ্ডতাকে প্রমাণ করতে। তাঁর গবেষণায় মিশে থাকত এক ধরণের সমাজতাত্ত্বিক সূক্ষ্মতা। তিনি দেখিয়েছেন কীভাবে সাহিত্য আর সংস্কৃতির মাধ্যমে একটি জাতি তার আত্মপরিচয় গড়ে তোলে।
মাঝে মাঝে মনে হয়, তাঁর সেই বিখ্যাত উক্তিটি যেন আজকের প্রজন্মের জন্যই লেখা "আমাদের শেকড় থাকুক মাটির গভীরে, কিন্তু ডানা যেন থাকে মুক্ত আকাশে।" এর চেয়ে বড় সত্য আর কী হতে পারে? নিজের শেকড় ভুলে গেলে আমরা হয়ে পড়ব পরগাছা, আবার মুক্ত আকাশে ওড়ার ডানা না থাকলে আমরা হয়ে যাব কূপমণ্ডূক। কোরায়শী সাহেব আমাদের সেই আকাশ আর মাটির সমন্বয় শিখিয়েছিলেন।
তাঁর গদ্যশৈলী নিয়ে কিছু না বললে তাঁর চিত্র অসম্পূর্ণ থেকে যায়। তাঁর ভাষা ছিল গম্ভীর, অথচ তাতে এক ধরণের মিহি কাব্যিক প্রবাহ ছিল। কোনো তাত্ত্বিক আলোচনা করতে গিয়েও তিনি যখন শব্দ নির্বাচন করতেন, তখন সেখানে কেবল অর্থ ফুটে উঠত না, ফুটে উঠত এক ধরণের সংগীত। তিনি যখন অনুবাদ করতেন, তখন তিনি কেবল প্রতিশব্দ বসাতেন না; তিনি খুঁজতেন সেই সাংস্কৃতিক ব্যঞ্জনা যা শব্দের প্রাণ। তাঁর অনুবাদ করা বাক্যগুলো পড়লে মনে হয়, যেন কোনো নিপুণ কারিগর খুব যত্ন করে মাটির মূর্তিতে প্রাণদান করেছেন। তাঁর ‘সাহিত্যের পথে’ কিংবা ‘আমাদের ঐতিহ্য ও সংস্কৃতি’র মতো গ্রন্থগুলো আজও গবেষকদের জন্য বাতিঘরের মতো কাজ করে।
গোলাম সামদানী কোরায়শীর জীবন কিন্তু খুব মসৃণ ছিল না। তাঁকে অনেকটা নিঃসঙ্গ পথিকের মতো চলতে হয়েছে। একদিকে তথাকথিত রক্ষণশীল সমাজ তাঁর প্রগতিশীলতাকে মেনে নিতে পারেনি, তাঁকে অপবাদ দিয়েছে। অন্যদিকে অনেক সময় প্রগতিশীল শিবিরের কেউ কেউ তাঁর ধর্মীয় পাণ্ডিত্য আর মাদ্রাসার পরিচয় নিয়ে সন্দেহের চোখে তাকাতে চেয়েছেন। কিন্তু তিনি ছিলেন পাহাড়ের মতো অটল। তিনি জানতেন সত্যের পথ বড় কণ্টকাকীর্ণ হয়। তিনি ক্ষমতার তোষামোদ করেননি, বরং জ্ঞানকে মানুষের কল্যাণে নিয়োজিত করেছিলেন। মিশেল ফুকো যেমন ক্ষমতার সঙ্গে জ্ঞানের সম্পর্কের কথা বলেছিলেন, কোরায়শী ছিলেন সেই যোদ্ধা যিনি জ্ঞানের মাধ্যমে ক্ষমতার অন্ধকার দিকগুলোকে চিনে নিতে জানতেন।
গোলাম সামদানী কোরায়শী ছিলেন বাংলার সেই চিরন্তন জাগরণ বা রেনেসাঁসের এক সুযোগ্য উত্তরসূরি। রামমোহন, বিদ্যাসাগর কিংবা অক্ষয়কুমার দত্তের সেই যে যুক্তিবাদী ধারা, তাকে তিনি বিশ শতকের মার্ক্সবাদী আর মানবিক দর্শনের সঙ্গে এক সুতোয় গেঁথেছিলেন। তাঁর জীবন আমাদের মনে করিয়ে দেয় যে, ঐতিহ্যবিচ্ছিন্ন আধুনিকতা যেমন প্রাণহীন শুকনো ডাল, তেমনি আধুনিকতাবর্জিত ঐতিহ্যও এক ভারী মৃত পাথরের মতো। তিনি ছিলেন সেই মহীরুহ যার শেকড় এই বাংলার শাশ্বত লোকজ ঐতিহ্যের গভীরে, আর যার ডানা প্রসারিত ছিল বিশ্বমানবতার দিগন্তে।
আজ ২০২৬ সালে দাঁড়িয়ে তাঁর সেই ‘যুক্তিবাদী প্রজ্ঞা’, ‘মানবিক সমাজবোধ’ আর ‘শেকড়সন্ধানী প্রগতিবাদ’ আমাদের পথ দেখানোর জন্য ধ্রুবতারার মতো উজ্জ্বল হয়ে আছে। তিনি হয়তো সশরীরে আমাদের মাঝে নেই, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া চিন্তার প্রবাহ আমাদের মনের গহীনে এক শীতল প্রশান্তি আর উদ্দীপনা জাগিয়ে দেয়। তিনি কেবল একজন মানুষ নন, তিনি একটি আদর্শ, একটি নিরন্তর পথচলা। আজকের প্রজন্মের জন্য তিনি এক পরম অনুপ্রেরণা যিনি শিখিয়েছেন কীভাবে মাটিকে ভালোবেসে আকাশের চাঁদ ছোঁয়া যায়। তাঁর চরণে আমাদের বিনম্র শ্রদ্ধা, যা কেবল কথার মালায় নয়, বরং আমাদের প্রতিদিনের চিন্তায় আর মননে বেঁচে থাকুক অনন্তকাল। তিনি আমাদের বর্তমানের পাথেয় আর আগামীর এক সুন্দর স্বপ্নদ্রষ্টা।
লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক।
১৬২ বার পড়া হয়েছে