হাম-রুবেলা টিকার কার্যকারিতা যাচাইয়ে দেশজুড়ে গবেষণা
শনিবার, ১ আগস্ট, ২০২৬ ৫:২৭ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
হাম-রুবেলা (এমআর) টিকা নেওয়ার পর শিশুদের শরীরে পর্যাপ্ত রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়েছে কি না, তা জানতে দেশব্যাপী অ্যান্টিবডি পরীক্ষা শুরু করেছে সরকার। আগস্টের মাঝামাঝি এই গবেষণার ফল প্রকাশের কথা রয়েছে। এদিকে দেশে হামের সংক্রমণ এখনো উদ্বেগজনক পর্যায়ে রয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, শুধু জুলাই মাসেই হাম ও সংশ্লিষ্ট জটিলতায় ১১৮ শিশুর মৃত্যু হয়েছে এবং হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৩০ হাজারের বেশি শিশু।
দেশে চলমান হাম পরিস্থিতি মূল্যায়নে নতুন করে অ্যান্টিবডি-ভিত্তিক একটি গবেষণা শুরু করেছে সরকার। এই গবেষণার মাধ্যমে জানা যাবে, বিশেষ এমআর টিকাদান কর্মসূচির আওতায় টিকা নেওয়া শিশুদের শরীরে পর্যাপ্ত রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়েছে কি না।
রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইডিসিআর) জানিয়েছে, দেশের ১৮টি উপজেলা থেকে শিশুদের রক্তের নমুনা সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হচ্ছে। আগস্টের মাঝামাঝি গবেষণার ফল প্রকাশ করা হবে। ফলাফলের ভিত্তিতে টিকার কার্যকারিতা এবং প্রয়োজন হলে পরবর্তী করণীয় নির্ধারণ করা হবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, চলতি বছরের মার্চে হামের প্রাদুর্ভাব শুরু হওয়ার পর পর্যায়ক্রমে দেশের বিভিন্ন ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় বিশেষ এমআর টিকাদান কর্মসূচি চালু করা হয়। প্রথমে ১৮ জেলার নির্বাচিত উপজেলা ও পৌরসভায় কার্যক্রম শুরু হলেও পরে তা সারাদেশে সম্প্রসারণ করা হয়।
তবে সংক্রমণ পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আসেনি। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, জুলাই মাসে হাম ও এর জটিলতায় ১১৮ শিশুর মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছে ৩০ হাজার ২০৯ জন শিশু। বর্তমানে প্রতিদিন প্রায় এক হাজার নতুন রোগী শনাক্ত হওয়ার তথ্যও জানিয়েছে স্বাস্থ্য বিভাগ।
বিশেষ টিকাদান কর্মসূচির আওতায় ৬ থেকে ৫৯ মাস বয়সী এক কোটি ৮০ লাখ শিশুকে টিকা দেওয়ার লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছিল। সরকারের দাবি, নির্ধারিত লক্ষ্যের ১০৩ শতাংশ অর্জিত হয়েছে। কিন্তু জাতীয় ভিটামিন ‘এ’ ক্যাম্পেইনের একই বয়সী শিশুদের লক্ষ্যমাত্রা ছিল প্রায় দুই কোটি ২৬ লাখ। ফলে প্রায় ৪৬ লাখ শিশুর হিসাব নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, এই ব্যবধান ইঙ্গিত দেয় যে উল্লেখযোগ্যসংখ্যক শিশু বিশেষ টিকাদান কর্মসূচির বাইরে থেকে যেতে পারে। এতে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে চ্যালেঞ্জ আরও বেড়েছে।
স্বাস্থ্যমন্ত্রী সরদার মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেছেন, বর্তমানে আক্রান্ত শিশুদের বড় অংশই টিকাবঞ্চিত অথবা অপুষ্টিতে ভুগছে। তাঁর ভাষ্য, টিকাদানের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণে ভুল থাকায় অনেক শিশু কর্মসূচির বাইরে থেকে গেছে। এ পরিস্থিতিতে বাদ পড়া শিশুদের দ্রুত টিকার আওতায় আনার পরিকল্পনা নেওয়া হচ্ছে।
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, শুধু টিকাদান কর্মসূচি যথেষ্ট নয়। আক্রান্ত শিশুদের দ্রুত শনাক্ত করা, অন্যদের থেকে আলাদা রাখা, হাসপাতালের প্রস্তুতি জোরদার করা, ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় নিবিড় নজরদারি এবং জনসচেতনতা বৃদ্ধির মতো সমন্বিত জনস্বাস্থ্য ব্যবস্থা আরও কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করা প্রয়োজন।
হাম ও রুবেলা নির্মূল কার্যক্রম যাচাইয়ে জাতীয় কমিটির চেয়ারম্যান অধ্যাপক মাহমুদুর রহমান বলেন, কোভিড-১৯ মহামারির সময়ের মতো সংক্রমণ প্রতিরোধে শুরু থেকেই সামাজিক সচেতনতা, হাত ধোয়ার অভ্যাস, প্রয়োজন হলে মাস্ক ব্যবহার এবং জ্বর আক্রান্ত শিশুকে আলাদা রাখার মতো পদক্ষেপ নেওয়া হলে সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে ইতিবাচক প্রভাব পড়তে পারত।
এদিকে নিয়মিত টিকা নেওয়ার পরও কিছু শিশুর হামে আক্রান্ত হওয়ার ঘটনাও সামনে এসেছে। রাজধানীর বাংলাদেশ শিশু হাসপাতাল ও ইনস্টিটিউটে চিকিৎসাধীন তিন বছর বয়সী এক শিশুর পরিবার জানিয়েছে, নিয়মিত দুই ডোজ এমআর টিকার পাশাপাশি বিশেষ কর্মসূচিতেও সে টিকা পেয়েছিল। এরপরও সে হামে আক্রান্ত হয়েছে। একইভাবে বিশেষ টিকাদান কর্মসূচির আওতায় টিকা নেওয়া আরেকটি শিশুর মৃত্যুর ঘটনাও উদ্বেগ বাড়িয়েছে।
টিকা বিশেষজ্ঞদের মতে, টিকাদানের পর নির্বাচিত এলাকায় অ্যান্টিবডির মাত্রা পরীক্ষা করা হলে বোঝা যাবে কতজন শিশুর শরীরে কার্যকর রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতা তৈরি হয়েছে। এর মাধ্যমে ভবিষ্যতে পুনরায় টিকাদান বা অতিরিক্ত ব্যবস্থা নেওয়ার প্রয়োজন আছে কি না, সে বিষয়েও সিদ্ধান্ত নেওয়া সহজ হবে।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা আরও বলছেন, টিকার কার্যকারিতা মূল্যায়নে গবেষণা বা পোস্ট মার্কেটিং সার্ভিলেন্স আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি প্রক্রিয়া। এ ধরনের মূল্যায়নের মাধ্যমে মাঠপর্যায়ে টিকাদান কর্মসূচির সফলতা, ঘাটতি এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নির্ধারণ করা সম্ভব হয়।
১১৫ বার পড়া হয়েছে