পূর্ব রায়েরবাজারে জমি দখলের অভিযোগ
রাতের আঁধারে হামলা-ভাঙচুর, সাইনবোর্ড নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ; জিডির পরও নিরাপত্তাহীনতায় পরিবার
মঙ্গলবার, ২৯ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২:২৩ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
রাজধানীর পূর্ব রায়েরবাজারে দলিলমূলে মালিকানাধীন ৮ দশমিক ০৮ শতাংশ জমি রাতের আঁধারে দলবল নিয়ে জোরপূর্বক দখল, ভাঙচুর, মারধর ও প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী পরিবারের দাবি, হামলাকারীরা জমির একটি অংশে প্রাচীর নির্মাণের পাশাপাশি ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড ভাঙচুর করে নিয়ে যায়। ঘটনায় হাজারীবাগ থানায় জিডি হলেও পুলিশি পদক্ষেপ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন ভুক্তভোগীরা।
রাজধানীর হাজারীবাগ থানাধীন পূর্ব রায়েরবাজার এলাকায় দলিলমূলে মালিকানাধীন জমি রাতের আঁধারে জোরপূর্বক দখল, বাড়িঘরে ভাঙচুর, মালামাল লুট এবং প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগ উঠেছে। ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, শতাধিক লোক নিয়ে রাতের বেলায় হামলা চালিয়ে তাদের জমির একটি অংশ দখল করে সেখানে রাস্তার জন্য প্রাচীর নির্মাণ করা হয়েছে। একই সময় ওই জমিতে ভবন নির্মাণের জন্য নিয়োজিত ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ডও ভাঙচুর করে তুলে নিয়ে যাওয়ার অভিযোগ রয়েছে।
ঘটনার পর এশিউর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ডিজাইন লিমিটেডের পক্ষ থেকে হাজারীবাগ থানায় সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে। জিডিতে জমি দখল, ভাঙচুর, মারধর এবং প্রাণনাশের হুমকির অভিযোগ তুলে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করা হয়।
তবে ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, ঘটনার পর তারা থানায় গিয়ে আইনগত সহায়তা চাইলেও প্রত্যাশিত সহযোগিতা পাননি। এমনকি থানার অফিসার ইনচার্জ তাদের সঙ্গে তীরস্কারমূলক আচরণ করেছেন বলেও অভিযোগ করেছেন তারা। যদিও পুলিশের পক্ষ থেকে এ অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তার বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
অভিযোগ ও সংশ্লিষ্ট দলিলের তথ্য অনুযায়ী, জমিটির ঠিকানা ১২২, পূর্ব রায়েরবাজার, ধানমন্ডি, ঢাকা। জমির বর্তমান মালিক হিসেবে মাহাফুজা চৌধুরী ওরফে মাহফুজা খানমের নাম উল্লেখ করা হয়েছে। জমিটির পরিমাণ ৮ দশমিক ০৮ শতাংশ।
দলিলের ধারাবাহিকতায় দেখা যায়, ১৯৬২ সালের ২৩ অক্টোবর রেজিস্ট্রি করা ১০৬০৩ ও ১০৬০৪ নম্বর সাব-কবলা দলিলের মাধ্যমে রবিউল আওয়াল ও মোসা. ফিরোজা খানম শিবপুর মৌজার সংশ্লিষ্ট সম্পত্তি ক্রয় করেন। পরে ১৯৭৩ সালের ৮ অক্টোবর রেজিস্ট্রি করা দুটি হেবাবিল এওয়াজনামা দলিলের মাধ্যমে তাঁর ফুফা রবিউল আওয়াল সম্পত্তির অংশ মাহাফুজা চৌধুরী ওরফে মাহফুজা খানম এবং স্ত্রী ফিরোজা খানমের কাছে হস্তান্তর করেন।
এরপর ১৯৮২ সালের ১৬ মার্চ রেজিস্ট্রি করা ১৯৮৭ নম্বর হেবাবিল এওয়াজনামা দলিলের মাধ্যমে ফিরোজা খানম তাঁর মালিকানাধীন ও স্বামীর কাছ থেকে পাওয়া সম্পত্তি মাহাফুজা চৌধুরী ওরফে মাহফুজা খানমের কাছে হেবা করেন বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে উল্লেখ রয়েছে।
অভিযোগকারীদের দাবি, এসব দলিলের ভিত্তিতে মাহাফুজা চৌধুরী দীর্ঘদিন ধরে ওই সম্পত্তির মালিকানা ভোগ করে আসছেন। ঢাকা সিটি জরিপেও তাঁর নামে জমিটি রেকর্ডভুক্ত হয়েছে এবং নিয়মিত খাজনা পরিশোধের নথিও রয়েছে বলে তারা জানিয়েছেন।
নথিপত্র অনুযায়ী, গত ৩১ আগস্ট ২০২৬ তারিখে রেজিস্ট্রি করা ৭১০৩ নম্বর চুক্তিপত্র এবং ৭১০৪ নম্বর আম-মোক্তার দলিলের মাধ্যমে জমিতে ভবন নির্মাণের জন্য এশিউর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ডিজাইন লিমিটেডের পক্ষে প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. শেখ সাদীকে আম-মোক্তার নিযুক্ত করা হয়।
চুক্তির পর ৫ সেপ্টেম্বর ওই জমিতে এশিউর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ডিজাইন লিমিটেডের সাইনবোর্ড স্থাপন করা হয় বলে প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে।
কোম্পানিটির অভিযোগ, সাইনবোর্ড স্থাপনের কয়েক সপ্তাহের মধ্যেই জমিটি নিয়ে বিরোধের সূত্রপাত হয় এবং একপর্যায়ে রাতের আঁধারে হামলা চালিয়ে জমির একটি অংশ দখল করা হয়।
এশিউর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ডিজাইন লিমিটেডের ডেপুটি ম্যানেজার মো. উজ্জল আলীর করা জিডিতে বলা হয়েছে, ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৬ রাত আনুমানিক সাড়ে ১১টার দিকে মো. আমিনুল কবির, দেলোয়ারা বেগম, আব্দুল গফুর, আব্দুল মন্নানসহ আরও ২০-২৫ জন অজ্ঞাতনামা ব্যক্তি জমিতে হামলা চালান।
জিডির বর্ণনায় বলা হয়, হামলাকারীরা জমির একটি অংশ জোরপূর্বক দখল করে সেখানে প্রাচীর নির্মাণ শুরু করেন। একই সময় এশিউর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ডিজাইন লিমিটেডের সাইনবোর্ড ভাঙচুর করা হয়। কোম্পানির লোকজন বাধা দেওয়ার চেষ্টা করলে তাদের মারধর করা হয় এবং ভাঙা সাইনবোর্ড নিয়ে যাওয়া হয় বলে অভিযোগ করা হয়েছে।
জিডিতে আরও উল্লেখ করা হয়েছে, হামলাকারীরা কোম্পানির লোকজনকে ঘটনাস্থল থেকে চলে যেতে বলেন এবং সেখানে অবস্থান করলে প্রাণে মেরে ফেলার হুমকি দেন।
অন্যদিকে জমির মালিকপক্ষের বর্ণনায় ঘটনার সঙ্গে আরও বড়সংখ্যক লোকের সম্পৃক্ততার অভিযোগ করা হয়েছে। তাদের দাবি, ২৪ সেপ্টেম্বর রাত ১১টা ৩০ মিনিট থেকে রাত ১২টার মধ্যে আবুল কালাম আজাদ, মো. মিরাজ, আব্দুল মান্নান, আব্দুল গফুর, মো. সবুর, হুমায়ুন কবির, মো. এনামুল কবির, মো. এহসান কবির, মো. আমিনুল কবিরসহ প্রায় ১০০ থেকে ১৫০ জন লোক সেখানে হামলা চালায়।
তাদের অভিযোগ, এ সময় মাহাফুজা চৌধুরীর বাড়িতে ভাঙচুর করা হয়। বাড়ির ভাড়াটিয়া এবং ঘরে থাকা টাকা-পয়সা ও মূল্যবান মালামাল লুট করা হয়েছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে। একই সঙ্গে ডেভেলপার প্রতিষ্ঠানের সাইনবোর্ড ভাঙচুর করে নিয়ে যাওয়ার পাশাপাশি রান্নার গ্যাসের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে জমির একটি অংশ দখল করে প্রাচীর নির্মাণ করা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
তবে এসব অভিযোগের স্বাধীন সত্যতা তাৎক্ষণিকভাবে যাচাই করা সম্ভব হয়নি।
ভুক্তভোগী পরিবারের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনার পর মাহাফুজা চৌধুরী তাঁর অসুস্থ স্বামী ও তিন কন্যাসন্তানকে নিয়ে চরম নিরাপত্তাহীনতার মধ্যে রয়েছেন। হামলাকারীরা তাদের প্রাণনাশের হুমকি দিয়ে আসছে বলেও অভিযোগ করা হয়েছে।
পরিবারটির দাবি, বৈধ মালিকানা ও দীর্ঘদিনের দখল থাকার পরও যদি রাতের আঁধারে একটি জমি জোরপূর্বক দখল করা হয়, তাহলে সংশ্লিষ্ট পরিবারের নিরাপত্তা এবং সম্পত্তির সুরক্ষা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি হয়।
ঘটনার পর ২৬ সেপ্টেম্বর ২০২৬ এশিউর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ডিজাইন লিমিটেডের পক্ষ থেকে হাজারীবাগ থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি করা হয়। জিডি নম্বর ১৫৭৭, ট্র্যাকিং নম্বর MB L216।
জিডিতে জমি দখল, সাইনবোর্ড ভাঙচুর, মারধর এবং প্রাণনাশের হুমকির কথা উল্লেখ করে ভবিষ্যতের জন্য বিষয়টি সাধারণ ডায়েরিভুক্ত করার পাশাপাশি প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার অনুরোধ করা হয়েছে।
জিডির নথিতে ডিউটি অফিসার হিসেবে এসআই (নিরস্ত্র) হেলাল উদ্দিনের নাম এবং অফিসার ইনচার্জ হিসেবে মো. মোশাররফ হোসেনের নাম রয়েছে। নথিতে অফিসার ইনচার্জের পক্ষ থেকে ‘এই ডায়েরী সংক্রান্তে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করুন’ মর্মে নির্দেশনার উল্লেখও রয়েছে।
এ অবস্থায় প্রশ্ন উঠেছে—জিডিতে অভিযোগ পাওয়ার পর ঘটনাস্থল পরিদর্শন, অভিযুক্তদের বিষয়ে তদন্ত, ভাঙচুর ও দখলের অভিযোগ যাচাই এবং ভুক্তভোগীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ কী পদক্ষেপ নিয়েছে?
ভুক্তভোগী পক্ষের দেওয়া কাগজপত্রের মধ্যে রয়েছে— খাজনা রশিদ; সিটি জরিপ, আরএস ও এসএ খতিয়ানের কপি; মালিকানা সংক্রান্ত দলিল; ৭১০৪ নম্বর আম-মোক্তার দলিল; ৭১০৩ নম্বর চুক্তিপত্র; হাজারীবাগ থানায় করা জিডির কপি; জমির মালিকের জাতীয় পরিচয়পত্রের কপি।
দলিলের তফসিল অনুযায়ী, জমিটি ঢাকা জেলার হাজারীবাগ থানা ও মোহাম্মদপুর সাব-রেজিস্ট্রি অফিসের আওতাধীন শিবপুর মৌজায় অবস্থিত। সংশ্লিষ্ট নথিতে সিএস, এসএ, আরএস ও ঢাকা সিটি জরিপের খতিয়ান ও দাগ নম্বর উল্লেখ রয়েছে।
এই ঘটনায় জমিটির চূড়ান্ত মালিকানা বা দখল নিয়ে কোনো পক্ষের দাবি আদালতের চূড়ান্ত রায়ে নিষ্পত্তি হয়েছে কি না—সেটি আলাদা বিষয়। জমির মালিকানা নিয়ে বিরোধ থাকলে সংশ্লিষ্ট পক্ষ আদালত বা আইনগত প্রক্রিয়ার আশ্রয় নিতে পারে।
কিন্তু অভিযোগ সত্য হলে রাতের বেলায় দলবল নিয়ে জমিতে প্রবেশ, ভাঙচুর, মারধর, জোরপূর্বক দখল, স্থাপনা নির্মাণ এবং প্রাণনাশের হুমকির মতো অভিযোগগুলো ফৌজদারি তদন্তের বিষয় হয়ে দাঁড়ায়। ফলে জমির মালিকানা বা দখলসংক্রান্ত বিরোধের পাশাপাশি হামলা ও ভাঙচুরের অভিযোগেরও নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন বলে মনে করছেন ভুক্তভোগীরা।
সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে পুলিশের ভূমিকা নিয়ে। জিডিতে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশ থাকার পর বাস্তবে কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, তা এখনো স্পষ্ট নয়।
ভুক্তভোগী পরিবারের অভিযোগ, তারা থানায় গিয়ে সহায়তা চাইলেও প্রত্যাশিত সহযোগিতা পাননি। এমনকি ওসি তাদের তিরস্কার করেছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। অন্যদিকে জিডির নথিতে আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণের নির্দেশ থাকায় অভিযোগের পর পুলিশের কার্যক্রমের বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা প্রয়োজন।
এ বিষয়ে হাজারীবাগ থানার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বক্তব্য পাওয়া যায়নি।
দলিল, খতিয়ান, খাজনা রশিদ ও জিডির নথি পর্যালোচনায় দেখা যায়, জমিটি নিয়ে দীর্ঘদিনের মালিকানা-সংক্রান্ত কাগজপত্র রয়েছে। তবে ২৪ সেপ্টেম্বরের রাতের ঘটনায় কারা প্রকৃতপক্ষে হামলা চালিয়েছে, কতজন সেখানে ছিল, জমির কতটুকু অংশ দখল হয়েছে, ভাঙচুর বা লুটপাটের ঘটনা ঘটেছে কি না এবং কার নির্দেশে এসব হয়েছে—এসব প্রশ্নের উত্তর পেতে নিরপেক্ষ তদন্ত প্রয়োজন।
১৪১ বার পড়া হয়েছে