সাংবাদিক ওয়ালিউল বারী চৌধুরী
আপসহীন সাংবাদিকতার এক উজ্জ্বল আলোকবর্তিকার প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি
শনিবার, ২৫ জুলাই, ২০২৬ ৯:১০ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
কিছু মানুষ চলে যান, কিন্তু তাঁদের কর্ম, আদর্শ ও ব্যক্তিত্ব সময়ের গণ্ডি পেরিয়ে মানুষের হৃদয়ে বেঁচে থাকেন। প্রখ্যাত সাংবাদিক আলহাজ্ব ওয়ালিউল বারী চৌধুরী ছিলেন তেমনই একজন মানুষ। তাঁর ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকীতে গভীর শ্রদ্ধা, বিনম্র কৃতজ্ঞতা ও ভালোবাসায় স্মরণ করছি তাঁকে।
আজও স্পষ্ট মনে আছে সেই দিনের কথা। এক দুপুরে আমরা তিনজন—কুমারখালী পাবলিক লাইব্রেরির সাধারণ সম্পাদক মীর আমজাদ আলী ভাই, আমি (হাবীব চৌহান) এবং সামছুল ভাই—লাইব্রেরির নিচতলার অফিস কক্ষে বসে গল্প করছিলাম। সামছুল ভাই প্রায়ই আমজাদ ভাইয়ের কাছে আসতেন। বয়সে ছোট হলেও তাঁদের বন্ধুত্ব ছিল বহু দিনের। আড্ডার ফাঁকে তাঁরা অতীতের নানা স্মৃতি রোমন্থন করছিলেন, আর আমি নীরবে শুনছিলাম তাঁদের প্রাণবন্ত আলাপ।
হঠাৎ লাইব্রেরির টেলিফোন বেজে উঠল। আমজাদ ভাই ফোন ধরলেন। কিছুক্ষণ কথা বলে ফোন রেখে উচ্ছ্বসিত কণ্ঠে বললেন, “কুষ্টিয়া থেকে সাংবাদিক ওয়ালিউল বারী চৌধুরী সাহেব আসছেন। চল, তাড়াতাড়ি আকবরের দুধ চা নিয়ে আসি।”
সামছুল ভাইকে বিদায় দিয়ে আমরা দুজন ফ্লাস্ক হাতে বাটিকামারা রেলগেটের দিকে গেলাম। আকবরের বিখ্যাত দুধ চা নিয়ে ফিরে এসে অফিস কক্ষ গুছিয়ে তাঁর জন্য অপেক্ষা করতে লাগলাম।
বিকেল প্রায় তিনটার দিকে লাইব্রেরিতে এসে পৌঁছালেন তিনি। আন্তরিক অভ্যর্থনার পর চা-নাস্তা সেরে তিনি লাইব্রেরির দ্বিতীয় তলায় গ্রন্থাগার পরিদর্শনে গেলেন। সেখানে আজীবন সদস্যদের নামসংবলিত ফলকের সামনে দাঁড়িয়ে কিছুক্ষণ মনোযোগ দিয়ে নামগুলো দেখলেন। এরপর আমজাদ ভাইকে জিজ্ঞেস করলেন, “আজীবন সদস্য কীভাবে হওয়া যায়?”
আমজাদ ভাই নিয়ম-কানুন বিস্তারিত বুঝিয়ে বললেন। নিচে ফিরে এসে আবার গল্প শুরু হলো। একপর্যায়ে আমজাদ ভাই বললেন, “আমাদের লাইব্রেরিতে আপনার একটি স্মৃতি থাকা উচিত।”
বাক্যটি শেষ হতে না হতেই ওয়ালিউল বারী চৌধুরী চাচা হাসিমুখে বললেন, “হ্যাঁ, আমি আজীবন সদস্য হতে চাই।”
কথা শেষ করেই তিনি পকেট থেকে পাঁচ হাজার টাকা বের করে আমজাদ ভাইয়ের হাতে তুলে দিলেন। আমজাদ ভাই অত্যন্ত আনন্দিত হলেন। তিনি গুণী মানুষকে গভীরভাবে শ্রদ্ধা করতেন এবং তাঁদের সম্মান দিতে কখনো কার্পণ্য করতেন না। সঙ্গে সঙ্গেই রশিদ প্রদান করা হলো। পরবর্তী কার্যনির্বাহী সভায় সর্বসম্মতিক্রমে ওয়ালিউল বারী চৌধুরীকে কুমারখালী পাবলিক লাইব্রেরির আজীবন সদস্য নির্বাচিত করা হয়। তাঁর নাম লাইব্রেরির সম্মানিত সদস্যদের তালিকায় সংযোজিত হয়, যা আজও তাঁর স্মৃতিকে বহন করে চলেছে।
ওয়ালিউল বারী চৌধুরী ছিলেন স্বাধীনতা, সত্য, ন্যায়বিচার এবং মানুষের অধিকারের প্রশ্নে আজীবন আপসহীন এক সংগ্রামী সাংবাদিক। মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় মুক্তাঞ্চল থেকে প্রকাশিত প্রথম সংবাদপত্র ‘স্বাধীন বাংলা’-এর সম্পাদক হিসেবে তিনি ইতিহাসের এক গৌরবোজ্জ্বল দায়িত্ব পালন করেন। পাশাপাশি সাপ্তাহিক ‘মশাল’, ‘ইস্পাত’ এবং পাক্ষিক ‘সমীক্ষা’ পত্রিকার প্রকাশক ও সম্পাদক হিসেবে দেশের সাংবাদিকতা ও সংবাদপত্র জগতে তিনি রেখে গেছেন অনন্য অবদান।
ভাষা আন্দোলনের চেতনা, মহান মুক্তিযুদ্ধের আদর্শ এবং গণমানুষের অধিকার রক্ষার প্রত্যয়ে তিনি আজীবন কলম চালিয়েছেন। সত্য প্রকাশে ছিলেন নির্ভীক, অন্যায়ের বিরুদ্ধে ছিলেন সোচ্চার। তাঁর সাংবাদিকতা ছিল কেবল পেশা নয়—এটি ছিল ন্যায় ও মানবিকতার প্রতি গভীর অঙ্গীকার।
আজ তাঁর ষষ্ঠ মৃত্যুবার্ষিকীতে আমরা শুধু একজন প্রখ্যাত সাংবাদিককেই স্মরণ করছি না; স্মরণ করছি একজন দেশপ্রেমিক, একজন আদর্শবাদী, একজন সাহসী বিবেকবান মানুষকে, যিনি তাঁর কর্ম ও আদর্শ দিয়ে আগামী প্রজন্মের জন্য অনুপ্রেরণার এক উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত রেখে গেছেন।
মহান আল্লাহ তাআলা মরহুম আলহাজ্ব ওয়ালিউল বারী চৌধুরীকে জান্নাতুল ফেরদৌস দান করুন। তাঁর কর্মময় জীবন, আদর্শ ও অবদান আমাদের প্রজন্মের জন্য চিরকাল প্রেরণার উৎস হয়ে থাকুক।
লেখক : সাংবাদিক ও সাধারণ সম্পাদক দুর্নীতি প্রতিরোধ কমিটি (দুপ্রক)।
১৪৪ বার পড়া হয়েছে