ওয়ালিউল বারী চৌধুরী: কুষ্টিয়ার নির্ভীক কলমের ইতিহাস
ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, ইস্পাত এবং আন্দোলনের বাজার—একটি সংবাদপত্র-পরম্পরার গল্প
শুক্রবার, ২৪ জুলাই, ২০২৬ ৭:০০ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
ভাষা আন্দোলনের অগ্রসৈনিক, মুক্তিযুদ্ধের কলমযোদ্ধা এবং কুষ্টিয়ার সংবাদপত্র জগতের এক নির্ভীক সম্পাদক ছিলেন ওয়ালিউল বারী চৌধুরী। সাপ্তাহিক মশাল, মুক্তিযুদ্ধের সময় প্রকাশিত স্বাধীন বাংলা এবং পরবর্তীতে ইস্পাত—তাঁর সাংবাদিকতার প্রতিটি অধ্যায়ে উঠে এসেছে সত্য, সাহস ও জনস্বার্থের প্রতি অঙ্গীকার। তাঁর হাত ধরেই কুষ্টিয়ার সংবাদপত্রের যে শক্তিশালী ঐতিহ্য গড়ে উঠেছিল, পরবর্তী প্রজন্মে তা দৈনিক আন্দোলনের বাজার–এর মতো প্রকাশনার মধ্য দিয়ে নতুন মাত্রা পায়। তাঁর জীবন তাই শুধু একজন সাংবাদিকের জীবনকথা নয়; এটি কুষ্টিয়ার সংবাদপত্র, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ ও সাংবাদিকতার স্বাধীনতার এক গুরুত্বপূর্ণ ইতিহাস।
কুষ্টিয়ার সংবাদপত্রের ইতিহাসে কিছু মানুষ আছেন, যাদের কলম শুধু খবর লেখেনি, ইতিহাসও লিখেছে। ওয়ালিউল বারী চৌধুরী ছিলেন তেমনই একজন—ভাষা আন্দোলনের সৈনিক, মুক্তিযুদ্ধের কণ্ঠস্বর, আর কুষ্টিয়ার নির্ভীক সাংবাদিকতার এক অনন্য নাম। তাঁর জীবন শুধু একজন সম্পাদকের জীবন নয়; এটি কুষ্টিয়ার সাংবাদিকতার বিকাশ, একটি পরিবারের উত্তরাধিকার, এবং এক অদম্য সম্পাদকীয় চেতনার দলিল।
১৯৩৯ সালে কুষ্টিয়ায় জন্ম নেওয়া ওয়ালিউল বারী চৌধুরী কেবল একজন সম্পাদক ছিলেন না; তিনি ছিলেন এক প্রতিরোধী সাংবাদিক, এক সংগঠক, এক পরিবারপ্রধান, আর কুষ্টিয়ার সংবাদপত্র-ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ নির্মাতা। তাঁর জন্ম, বেড়ে ওঠা, সংগ্রাম, প্রকাশনা—সব মিলিয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন এ অঞ্চলের সংবাদপত্র-চর্চার এক জীবন্ত অধ্যায়।
ওয়ালিউল বারী চৌধুরীর শেকড় কুষ্টিয়ায়। তাঁর পিতা ফজলুল বারী চৌধুরী ছিলেন এলাকার একজন সম্মানিত ব্যক্তিত্ব, অনারারি ম্যাজিস্ট্রেট এবং একজন ইন্ডিয়া টাইমসের কলামিস্ট। পরিবারে তিনি ছিলেন দ্বিতীয় সন্তান। ছোটবেলা থেকেই তাঁর মধ্যে ছিল সংগঠনের মনোভাব, দৃঢ়তা, আর নিজের কাজকে নিজের মতো করে এগিয়ে নেওয়ার এক দৃঢ় প্রবণতা। কুষ্টিয়ার শহুরে পরিবেশ, পারিবারিক শৃঙ্খলা, আর সামাজিক দায়বোধ—সব মিলিয়ে তাঁর মধ্যে গড়ে ওঠে এক সম্পাদকীয় মন।
সাংবাদিকতায় তাঁর হাতেখড়ি হয় ঢাকার Weekly East Pakistan–এ সহ-সম্পাদক হিসেবে। সেই সময় থেকেই তিনি খবরের ভেতরকার বাস্তবতা, মানুষের জীবন, আর সমাজের গতিপ্রকৃতি বোঝার এক দীর্ঘ যাত্রা শুরু করেন। এটি ছিল তাঁর সাংবাদিক জীবনের প্রাথমিক কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়।
১৯৬৩ সালের ২৬ জুলাই তিনি বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হন। পরের বছর, ১৯৬৪ সালে, কুষ্টিয়ায় তিনি শুরু করেন সাপ্তাহিক মশাল। খান এস. সবুর পত্রিকাটির উদ্বোধন করেন, আর এটি ছাপা হতো কুষ্টিয়ার শুলভ প্রেস থেকে। এই উদ্যোগ কুষ্টিয়ার স্থানীয় সাংবাদিকতার জন্য ছিল এক নতুন অধ্যায়। মশাল শুধু একটি পত্রিকা ছিল না; এটি ছিল একটি কণ্ঠ, একটি অবস্থান, এবং এক নতুন সম্পাদকীয় ধারার সূচনা।
১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের সময়ও ওয়ালিউল বারী চৌধুরী কুষ্টিয়ার আন্দোলনের অগ্রভাগের একজন সৈনিক হিসেবে যুক্ত ছিলেন। ভাষার অধিকার, সাংস্কৃতিক মর্যাদা, আর বাঙালির আত্মপরিচয়ের প্রশ্নে তিনি সেই সংগ্রামের সঙ্গেও সক্রিয়ভাবে যুক্ত ছিলেন। এই অধ্যায় তাঁকে কেবল সাংবাদিক নয়, একজন ভাষাসৈনিক হিসেবেও চিহ্নিত করে। তাঁর জীবন তাই কেবল সংবাদপত্রের ইতিহাসে সীমাবদ্ধ নয়; এটি জাতির চেতনা গঠনের ইতিহাসেও যুক্ত।
১৯৭১ সালের ১৫ এপ্রিল, মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল সময়ে তিনি ভারতে গিয়ে প্রকাশ করেন স্বাধীন বাংলা। এটি ছিল মুক্তাঞ্চল থেকে প্রকাশিত প্রথম সংবাদপত্র—এক ঐতিহাসিক ঘোষণা, এক জাতীয় প্রতিরোধ, আর এক সাংবাদিকের অসম সাহসের প্রমাণ। স্বাধীন বাংলা–র মাধ্যমে তিনি শুধু খবর ছাপেননি; তিনি যুদ্ধের চেতনা, আশার বার্তা, আর প্রতিরোধের ভাষা ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। যুদ্ধের সময় কলম ছিল তাঁর অস্ত্র, আর পত্রিকা ছিল তাঁর প্রতিরোধ।
স্বাধীনতার পর দেশে ফিরে তিনি আবার মশাল প্রকাশ শুরু করেন। এরপর মাসিক ইস্পাত এবং পাক্ষিক সমীক্ষা প্রকাশিত হয় মুকুল মুদ্রায়ন, কুষ্টিয়ার মজমপুর গেট থেকে। ১৯৭৪ সালে দেশের সব পত্রিকা সরকার বন্ধ করার পর মাসিক ইস্পাত–এর পিরিয়ডিসিটি বদলে তা হয়ে ওঠে সাপ্তাহিক ইস্পাত। ১৯৭৬ সাল থেকে ইস্পাত কুষ্টিয়া এবং বৃহত্তর খুলনা বিভাগের একমাত্র শক্তিশালী গণমাধ্যম সাপ্তাহিক পত্রিকা হিসেবে প্রতিষ্ঠা পায়। তখনকার সংবাদপত্রের মান, সম্পাদকীয় সাহস, আর আঞ্চলিক প্রভাব—সব মিলিয়ে ইস্পাত ছিল এক আলাদা নাম। এ সময়ে তিনি যে দৃঢ় সম্পাদকীয় অবস্থান তৈরি করেছিলেন, তা পরবর্তী প্রজন্মের সাংবাদিকতার জন্য এক মানদণ্ড হয়ে ওঠে।
১৯৮৫ সালে জেলা প্রশাসনের সঙ্গে সংবাদ-সংক্রান্ত বিরোধে ইস্পাত অফিস বন্ধ করে দেওয়া হয়। পরে আদালতের ঐতিহাসিক রায়ে সেই সিদ্ধান্ত বাতিল হয় এবং পত্রিকা আবার প্রকাশনা শুরু করে। এই ঘটনা শুধু একটি পত্রিকার নয়; এটি সংবাদপত্রের স্বাধীনতার ইতিহাসে এক গুরুত্বপূর্ণ নজির। প্রশাসনিক চাপের বিপরীতে আদালতের অবস্থান প্রমাণ করেছিল—সাংবাদিকতার কণ্ঠ চিরদিন বন্ধ রাখা যায় না। এই অধ্যায় তাঁকে শুধু সম্পাদক নয়, সংবাদপত্রের স্বাধীনতার সংগ্রামী হিসেবেও স্থাপন করে।
১৯৯১ সালে তাঁর শিক্ষা, অনুপ্রেরণা, এবং সাংবাদিকতার দর্শনকে ভিত্তি করে শুরু হয় দৈনিক আন্দোলনের বাজার। এটি ছিল নতুন ধারার সংবাদপত্র, কিন্তু এর শিকড় ছিল সেই পুরোনো নীতিতে—সত্য, সাহস, আর জনস্বার্থ। আন্দোলনের বাজার–এর প্রকাশক ও সম্পাদক মনজুর এহসান চৌধুরী, তাঁর জ্যেষ্ঠ পুত্র, যিনি বাবার শিক্ষায় দীক্ষিত সাংবাদিক হিসেবে এই উত্তরাধিকারকে এগিয়ে নিয়ে যান। ১৯৯৪ সালে কম্পিউটার কম্পোজ ও অফসেট প্রযুক্তির মাধ্যমে কুষ্টিয়ায় আধুনিক সংবাদপত্র প্রকাশের পথও এই ধারাই প্রথম প্রশস্ত করে।
এখানেই ওয়ালিউল বারী চৌধুরীর জীবনের আরেকটি বিশেষ তাৎপর্য দেখা যায়—তিনি কেবল একটি পত্রিকার সম্পাদক ছিলেন না, তিনি একটি সাংবাদিক পরিবারের ভিত্তি স্থাপন করেছিলেন। তাঁর হাতে যে সম্পাদকীয় শৃঙ্খলা, দায়বোধ, আর নির্ভীকতা তৈরি হয়েছিল, তা আন্দোলনের বাজার–এর মতো একটি পত্রিকার জন্মের পথও তৈরি করে। কুষ্টিয়ার সংবাদপত্র ইতিহাসে মশাল, স্বাধীন বাংলা, ইস্পাত এবং আন্দোলনের বাজার—সব মিলিয়ে একটি অবিচ্ছিন্ন স্রোত তৈরি হয়েছে, যার কেন্দ্রে ছিলেন ওয়ালিউল বারী চৌধুরী।
বয়স বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে তিনি অসুস্থ হতে থাকেন। চিকিৎসা হয়েছে ভারত, থাইল্যান্ড, সিঙ্গাপুর, আর বাংলাদেশে। কোভিডকালে ওষুধ সরবরাহে সমস্যা, আর বার্ধক্যজনিত জটিলতা—সব মিলিয়ে ২০২০ সালের ২৫ জুলাই কুষ্টিয়ায় নিজ বাড়িতে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। মহামারির সময় সীমিত পরিবেশে কুষ্টিয়া পৌর গোরস্থানের সামনে তাঁর জানাজা হয়, আর সম্মানের অংশ হিসেবে কুষ্টিয়া মুক্তিযোদ্ধা ইউনিট তাঁকে গার্ড অব অনার দেয়।
ওয়ালিউল বারী চৌধুরী ছিলেন কুষ্টিয়ার সংবাদপত্রের এক নির্ভীক কণ্ঠস্বর। পরিবার, সংগ্রাম, ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ, আদালত, আর সম্পাদকীয় সাহস—সব মিলিয়ে তিনি হয়ে উঠেছিলেন এক অনন্য ইতিহাস। তাঁর জীবন শেষ হয়েছে, কিন্তু তাঁর আদর্শ, তাঁর পত্রিকা, আর তাঁর শিক্ষা রয়ে গেছে কুষ্টিয়ার সাংবাদিকতার মেরুদণ্ড হয়ে।
৪৫৮ বার পড়া হয়েছে