ঢাকাকে নতুন দৃষ্টিতে দেখার আহ্বান: বুয়েটে প্রকাশিত হলো ‘বিটুইন কেয়স অ্যান্ড কোহেশন’
বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই, ২০২৬ ৫:৫৭ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
দক্ষিণ এশীয় সংস্কৃতিবিষয়ক জার্নাল সাউথ এশিয়ান কালচারাল স্টাডিজ-এর ২০ বছর পূর্তি উপলক্ষে প্রকাশিত হয়েছে ‘বিটুইন কেয়স অ্যান্ড কোহেশন: অ্যান এক্সপ্লোসিভ রি-ইমার্জেন্স অব ঢাকা’ শীর্ষক বিশেষ গ্রন্থ। রাজধানীর বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) স্থাপত্য বিভাগে আয়োজিত প্রকাশনা অনুষ্ঠানে গবেষক, শিক্ষক, স্থপতি, লেখক ও শিক্ষার্থীরা ঢাকার পরিবর্তিত সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতা নিয়ে আলোচনা করেন।
সোমবার (৬ জুলাই ২০২৬) বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বুয়েট) স্থাপত্য বিভাগের ভ্রুম্যান কক্ষে গ্রন্থটির প্রকাশনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়। অনুষ্ঠানে দেশের বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক, গবেষক, স্থপতি, লেখক, শিক্ষার্থী এবং নানা পেশার বিশিষ্টজনেরা অংশ নেন।
গ্রন্থটি সম্পাদনা করেছেন তাসলিম শাকুর ও ইমামুর হোসেন। সাউথ এশিয়ান কালচারাল স্টাডিজ-এর উদ্যোগে এবং একাডেমিক প্রেস অ্যান্ড পাবলিশার্স লাইব্রেরির সহযোগিতায় এটি প্রকাশিত হয়েছে।
গ্রন্থটির পেছনের প্রচ্ছদে লেখা বক্তব্যে পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান ও অর্থনীতিবিদ হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, ঢাকাকে কেবল নীতি, পরিকল্পনা কিংবা অবকাঠামোর দৃষ্টিকোণ থেকে মূল্যায়ন করলে শহরটির প্রকৃত চরিত্র ধরা পড়ে না। তাঁর মতে, এই শহরের ইতিহাস, মানুষের স্মৃতি, সামাজিক সম্পর্ক এবং ধারাবাহিক পরিবর্তনের ভেতর দিয়েই ঢাকাকে বোঝা সম্ভব। তিনি বইটিকে নগর নিয়ে প্রচলিত আলোচনা থেকে ভিন্নধর্মী একটি গুরুত্বপূর্ণ সংযোজন হিসেবে উল্লেখ করেন।
জানা যায়, দীর্ঘ গবেষণা, আলোচনা ও সম্পাদনার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে বইটি প্রস্তুত হয়েছে। ২০২৫ সালের ২৫ জানুয়ারি অনুষ্ঠিত ‘পলিটিক্যাল ট্রান্সফরমেশনস, চেঞ্জিং হেরিটেজ অ্যান্ড নেগোশিয়েটিং আইডেনটিটিজ: প্ল্যানিং, ডিজাইনস অ্যান্ড দ্য ইভলভিং কালচারস অব ঢাকা’ শীর্ষক আন্তর্জাতিক কর্মশালার আলোচনাকে কেন্দ্র করেই গ্রন্থটির ভিত্তি তৈরি হয়। কর্মশালাটি সোনারগাঁও বিশ্ববিদ্যালয়ের ইন্টারন্যাশনাল সেন্টার ফর ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড এনভায়রনমেন্টাল স্টাডিজসহ কয়েকটি আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠানের যৌথ উদ্যোগে অনুষ্ঠিত হয়েছিল।
অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন গণস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ট্রাস্টি বোর্ডের চেয়ারপারসন ও নারী অধিকারকর্মী শিরীন পারভীন হক। তিনি বলেন, ঢাকাকে বোঝার ক্ষেত্রে শুধু জনসংখ্যা, অবকাঠামো বা নগরায়ণের সমস্যা নয়, মানুষের জীবন, অধিকার, স্মৃতি, সংগ্রাম এবং নাগরিক অংশগ্রহণকেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।
সম্পাদক তাসলিম শাকুর ও ইমামুর হোসেন গ্রন্থটির প্রণয়ন প্রক্রিয়া এবং বিষয়বস্তু তুলে ধরে বলেন, বইটিতে ঢাকাকে একক পরিচয়ের শহর হিসেবে উপস্থাপন করা হয়নি। বরং রাজনৈতিক পরিবর্তন, জনআন্দোলন, অনানুষ্ঠানিক বসতি, আবাসন, ধর্মীয় সংস্কৃতি, খাদ্যসংস্কৃতি, স্মৃতি এবং প্রতিদিনের নগরজীবনের নানা অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে শহরটির বহুমাত্রিক বাস্তবতা বিশ্লেষণ করা হয়েছে।
অনুষ্ঠানে গ্রন্থের একাধিক লেখক উপস্থিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে ছিলেন তাসলিম শাকুর, ইমামুর হোসেন এবং অধ্যাপক মোহাম্মদ আমিনুল করিম। বিদেশে অবস্থানের কারণে কয়েকজন লেখক সরাসরি অংশ নিতে না পারলেও তাঁদের গবেষণা ও সম্পাদনা-সহযোগিতার বিষয়টি অনুষ্ঠানে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়।
গ্রন্থটিতে নুব্রাস সামায়ীন, অধ্যাপক মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান, মো. রাশেদ ভূঁইয়া, পারিসা শাকুর, সানজিদা আহমেদ সিনথিয়া, সৈয়দা জাফরিনা ন্যান্সি, ফারিবা সামিয়া অমি, ফোজিত শেখ বাবু, মো. ইফতেখার রশিদ, আদিল মোহাম্মদ, মাতলুবা খান, থমাস অ্যানিউরিন স্মিথ, নোভা আমিন খান, ডেইজি ওর্তেগা রোমান, তানভীর খান, সুনীলা আহমেদ, সুশীল ঘোষ এবং সামিহা নওশীনের গবেষণাভিত্তিক প্রবন্ধ স্থান পেয়েছে।
প্রবন্ধগুলোতে ঢাকার রাজনৈতিক অস্থিরতা, স্মৃতি ও পরিচয়ের দ্বন্দ্ব, ছাত্র আন্দোলন, উচ্ছেদ ও পুনর্বাসন, অনানুষ্ঠানিক নগরায়ণ, জনপরিসর, জেনেভা ক্যাম্পের মহররম, পথের খাবারের সংস্কৃতি, আবাসনের পরিবর্তন, শিশু ও তরুণবান্ধব নগর এবং দক্ষিণ এশিয়ার নির্মিত পরিবেশ নিয়ে বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি তুলে ধরা হয়েছে।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন নবনীতা ইসলাম। আলোচকেরা বলেন, যানজট, জনঘনত্ব কিংবা অবকাঠামোগত সংকটের বাইরে ঢাকার আরেকটি বাস্তবতা রয়েছে। মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ক, সাংস্কৃতিক চর্চা, সামাজিক সংযোগ এবং রাজনৈতিক অংশগ্রহণের মধ্য দিয়েই শহরটি প্রতিনিয়ত নতুনভাবে গড়ে উঠছে। তাঁদের মতে, গ্রন্থের শিরোনামে ব্যবহৃত ‘বিশৃঙ্খলা’ ও ‘সংহতি’ পরস্পরবিরোধী নয়; বরং এই দুইয়ের আন্তঃসম্পর্কই ঢাকার পরিবর্তনশীল চরিত্রকে ব্যাখ্যা করে।
অনুষ্ঠানের শেষে বুয়েটের স্থাপত্য বিভাগ, বিভাগের প্রধান অধ্যাপক নাজমুল ইমাম, প্রধান অতিথি, সঞ্চালক, লেখক, গবেষক, শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অতিথিদের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান আয়োজকেরা। তাঁদের মতে, গ্রন্থটির প্রকাশ শুধু একটি প্রকাশনা-উদ্যোগের সমাপ্তি নয়; বরং ঢাকা নিয়ে ভবিষ্যৎ গবেষণা ও নতুন আলোচনারও একটি গুরুত্বপূর্ণ সূচনা।
১২১ বার পড়া হয়েছে