কক্সবাজারে বন্যা ও পাহাড়ধস: নিরাপদ আশ্রয়ে যেতে প্রশাসনের মাইকিং
বৃহস্পতিবার, ৯ জুলাই, ২০২৬ ৫:০৮ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
টানা কয়েক দিনের ভারি বর্ষণে কক্সবাজারের বিভিন্ন এলাকায় বন্যা, জলাবদ্ধতা ও পাহাড়ধসের ঝুঁকি আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েছে। জেলার একাধিক উপজেলার নিম্নাঞ্চল প্লাবিত হওয়ায় সড়ক ও নৌ যোগাযোগ ব্যাহত হয়েছে। পরিস্থিতি মোকাবিলায় জেলা প্রশাসন সর্বোচ্চ সতর্কতা জারি করে ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার বাসিন্দাদের দ্রুত আশ্রয়কেন্দ্রে সরে যাওয়ার আহ্বান জানিয়েছে।
টানা ভারি বর্ষণের প্রভাবে কক্সবাজার জেলায় দুর্যোগ পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে উঠেছে। জেলার বিভিন্ন উপজেলার নিম্নাঞ্চল পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় বহু মানুষ পানিবন্দি হয়ে পড়েছেন। অনেক এলাকায় সড়ক যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হয়েছে এবং গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি নৌপথেও যাত্রীবাহী নৌযান চলাচল বন্ধ রয়েছে।
জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, পাহাড়ের ঢাল, পাদদেশ এবং বন্যাপ্রবণ নিচু এলাকায় বসবাসকারীদের দ্রুত নিরাপদ স্থানে সরিয়ে নেওয়ার কাজ চলছে। মাইকিংয়ের মাধ্যমে সতর্কবার্তা প্রচার করা হচ্ছে। প্রয়োজন হলে ঝুঁকিপূর্ণ স্থান থেকে বাসিন্দাদের জোরপূর্বকও সরিয়ে নেওয়া হচ্ছে।
প্রশাসনের গণবিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছে, কক্সবাজার সমুদ্রবন্দরে ৩ নম্বর স্থানীয় সতর্ক সংকেত বহাল রয়েছে। আবহাওয়া অধিদপ্তরের পূর্বাভাস অনুযায়ী আগামী কয়েক দিন ভারি থেকে অতি ভারি বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। এ কারণে সম্ভাব্য প্রাণহানি এড়াতে সবাইকে নিকটস্থ সাইক্লোন শেল্টার বা নিরাপদ আশ্রয়কেন্দ্রে চলে যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
জরুরি সহায়তার জন্য জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ে একটি কন্ট্রোল রুম চালু করা হয়েছে। প্রয়োজন হলে ০১৮৭২-৬১৫১৩২ নম্বরে সার্বক্ষণিক যোগাযোগ করার অনুরোধ জানিয়েছে প্রশাসন।
জেলা প্রশাসক এম এ মান্নান জানিয়েছেন, জেলার ৬৪৮টি আশ্রয়কেন্দ্র প্রস্তুত রাখা হয়েছে। উদ্ধার, ত্রাণ বিতরণ এবং জরুরি সহায়তা কার্যক্রম সমন্বয়ের জন্য প্রশাসন সার্বক্ষণিক কাজ করছে। দুর্যোগ পরিস্থিতি স্বাভাবিক না হওয়া পর্যন্ত সরকারি নির্দেশনা মেনে চলার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বঙ্গোপসাগরে সৃষ্ট লঘুচাপ এবং সক্রিয় মৌসুমি বায়ুর প্রভাবে জেলার ১০টি উপজেলার অন্তত ৩৫টি ইউনিয়ন বন্যাকবলিত হয়েছে। বন্যা, জলাবদ্ধতা ও পাহাড়ধস মিলিয়ে এখন পর্যন্ত ২০ জনের মৃত্যুর খবর পাওয়া গেছে। অন্তত এক লাখ মানুষ পানিবন্দি অবস্থায় রয়েছেন।
কক্সবাজার সদর, উখিয়া, টেকনাফ, রামু, চকরিয়া, মহেশখালী, কুতুবদিয়া, পেকুয়া ও ঈদগাঁও উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকা সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে।
কক্সবাজার আবহাওয়া অফিস জানিয়েছে, বুধবার সন্ধ্যা পর্যন্ত সর্বশেষ চার দিনে মোট ৭৪৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়েছে, যা সাম্প্রতিক সময়ের মধ্যে সর্বোচ্চ। কর্মকর্তাদের মতে, অল্প সময়ে এত বেশি বৃষ্টিপাত হওয়ায় পাহাড়ধস, আকস্মিক বন্যা এবং দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতার ঝুঁকি কয়েক গুণ বেড়ে গেছে।
আবহাওয়া অফিস আরও জানিয়েছে, অন্তত ১১ জুলাই পর্যন্ত ভারি থেকে অতি ভারি বৃষ্টিপাত অব্যাহত থাকতে পারে। ফলে আগামী কয়েক দিনও দুর্ভোগ অব্যাহত থাকার আশঙ্কা রয়েছে।
জেলার বিভিন্ন এলাকায় শত শত ঘরবাড়িতে পানি প্রবেশ করেছে। বহু গ্রামীণ সড়ক পানিতে ডুবে গেছে এবং কয়েকটি স্থানে বিদ্যুৎ ও যোগাযোগ ব্যবস্থা ব্যাহত হয়েছে। কক্সবাজার শহরের কলাতলী, সুগন্ধা, হোটেল-মোটেল জোন, বাজারঘাটা, তারাবনিয়াছড়া, আলীরজাহাল ও বাস টার্মিনাল এলাকায় হাঁটু থেকে কোমরসমান পানি জমে জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে।
উত্তাল সমুদ্রের কারণে টানা ছয় দিন ধরে টেকনাফ–সেন্টমার্টিন নৌপথে যাত্রীবাহী জাহাজ চলাচল বন্ধ রয়েছে। একই সঙ্গে কক্সবাজার–মহেশখালী ও পেকুয়া–কুতুবদিয়া নৌপথেও নৌযান চলাচল বন্ধ থাকায় যাত্রীদের ভোগান্তি বেড়েছে।
এদিকে রোহিঙ্গা আশ্রয়শিবিরেও টানা বর্ষণে দুই শতাধিক পাহাড়ধসের ঘটনা ঘটেছে। পাহাড়সংলগ্ন বহু আশ্রয়স্থল নতুন করে ঝুঁকির মুখে রয়েছে।
জেলা প্রশাসন জানিয়েছে, ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের জন্য পর্যাপ্ত শুকনো খাবার ও জরুরি ত্রাণসামগ্রী মজুত রয়েছে। অতিরিক্ত সহায়তার জন্য সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে চাহিদাপত্র পাঠানো হয়েছে। পরিস্থিতির আরও অবনতি হলে উদ্ধার ও ত্রাণ কার্যক্রম আরও জোরদার করা হবে।
১২৭ বার পড়া হয়েছে