কসমেটিকস বিক্রেতা থেকে সীমান্তের ‘ডন’
যুবদল নেতা জুবেরের রূপকথার আড়ালে অন্ধকার সাম্রাজ্য
মঙ্গলবার, ৭ জুলাই, ২০২৬ ৬:৫৮ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
মাত্র চার বছর আগে সিলেটের গোয়াইনঘাট উপজেলার জাফলংয়ের গুচ্ছগ্রাম এলাকায় একটি ছোট দোকানে কসমেটিকস বিক্রি করতেন জুবের আহমদ। নুন আনতে পান্তা ফুরানোর সেই সাধারণ জীবন থেকে আজ তিনি কয়েক কোটি টাকার মালিক।
চড়েন বিলাসবহুল গাড়িতে, নিয়মিত প্রমোদভ্রমণে যান দুবাই, সিঙ্গাপুর ও মালদ্বীপে। তবে এই অবিশ্বাস্য উত্থানের পেছনে কোনো জাদুর কাঠি নয়, বরং রয়েছে ভয়ংকর চোরাচালান, চাঁদাবাজি, বালি-পাথর লুটপাট আর ত্রাসের এক অন্ধকার রাজত্ব। হাজিপুর সীমান্তে এখন এক মূর্তমান আতঙ্কের নাম ‘জুবের বাহিনী’।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০২০ সালে গুচ্ছগ্রাম লালমাটি এলাকায় কসমেটিকস ব্যবসা দিয়ে জুবেরের কর্মজীবন শুরু হলেও বছরখানেক পরই বিজিবির জনৈক অসাধু কর্মকর্তার সঙ্গে সখ্য গড়ে তুলে তিনি পা রাখেন অপরাধ জগতে। নিজ গ্রাম প্রতাপুরের হাজিপুরে ফিরে দুলাল ও হাতেমকে নিয়ে গড়ে তোলেন এক শক্তিশালী চোরাকারবারি সিন্ডিকেট। বিজিবির নাম ভাঙিয়ে সীমান্তে চাঁদাবাজি দিয়েই মূলত তার বিত্তবৈভবের সূচনা।
অভিযোগ রয়েছে, জুবেরের নেতৃত্বে নকশিয়া পুঞ্জি, লামাপুঞ্জি, প্রতাপুর ও হাজিপুর সীমান্ত দিয়ে প্রতিদিন কোটি কোটি টাকার মদ, গরু, চিনি, স্বর্ণ ও রসুন অবৈধভাবে দেশে প্রবেশ করে। স্থানীয়রা জানান, সীমান্তের একদম কাছে বাড়ি হওয়ার সুযোগে পাসপোর্ট ছাড়াই জুবের নিয়মিত ভারতের ডাউকিতে যাতায়াত করেন এবং ওপার থেকেই সিন্ডিকেট নিয়ন্ত্রণ করেন।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে জুবের সাবেক মন্ত্রী ইমরান আহমদের পিএসের ‘খাস লোক’ হিসেবে পরিচিত ছিলেন। সে সময় আওয়ামী লীগ নেতাদের ছত্রছায়ায় তিনি চোরাচালান নিয়ন্ত্রণ করতেন। তবে গত ৫ আগস্ট সরকার পতনের পর রাতারাতি ভোল পাল্টে তিনি নিজেকে উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক কমিটির সদস্য হিসেবে পরিচয় দিতে শুরু করেন। বর্তমানে তিনি উপজেলা যুবদলের সাধারণ সম্পাদক পদপ্রার্থী হওয়ার জন্য জোর লবিং চালাচ্ছেন। অভিযোগ রয়েছে, নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ নেতা আলাউদ্দিনের প্রশ্রয়ে এবং যুবলীগের কামরুল ও খাইরুলের মতো চিহ্নিত সন্ত্রাসীদের মাধ্যমে তিনি হাজিপুর বালুমহাল থেকে অবৈধভাবে বালি উত্তোলন ও চাঁদাবাজি অব্যাহত রেখেছেন।
জুবেরের রয়েছে নিজস্ব এক ‘লাঠিয়াল বাহিনী’। সম্প্রতি বালুমহাল নিয়ে বিরোধের জেরে তোফায়েল আহমদ নামে এক ব্যক্তির বাড়িতে হামলা চালায় জুবেরের অনুসারীরা। নৃশংসতার চরম সীমায় পৌঁছে তারা তোফায়েলের বৃদ্ধ বাবার একটি আঙুল কেটে নিয়ে জুবেরকে ‘উপহার’ হিসেবে দেয় বলে এলাকায় চাঞ্চল্যকর অভিযোগ রয়েছে। এই ঘটনার পর ভুক্তভোগী পরিবার থানায় মামলা করতে চাইলেও রহস্যজনক কারণে পুলিশ মামলা নেয়নি এবং পরবর্তীতে ৩ লাখ টাকার বিনিময়ে বিষয়টি ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। এই ধামাচাপার ঘটনায় গোয়াইনঘাট থানার এসআই ফয়েজ উদ্দিনের হাত রয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
জুবেরের বর্তমান জীবন যেন কোনো সিনেমার চিত্রনাট্য। সিলেট নগরীর জেল রোডে তার রয়েছে বিলাসবহুল হোটেল, উপশহরে আলিশান ভাড়া বাড়ি এবং জেলার বিভিন্ন স্থানে বেনামি প্রচুর জমি। অথচ বিস্ময়কর তথ্য হলো, জুবেরের বাবা এখনো স্থানীয় একটি মসজিদে ইমামতি করে জীবন অতিবাহিত করেন।
জুবেরের এমন অনুপ্রবেশ নিয়ে ক্ষুব্ধ তৃণমূলের জাতীয়তাবাদী নেতাকর্মীরা। সম্প্রতি জুবের আহমদের বিরুদ্ধে সিলেট জেলা যুবদলের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক বরাবর একটি লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক কমিটির সিনিয়র সদস্য এসএম শাহিন। অভিযোগে উল্লেখ করা হয়, জুবের এবং তার ভাইয়েরা (কাজী সিরাজ, জাহের, নাজিম প্রমুখ) সরাসরি আওয়ামী লীগের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত ছিলেন এবং এমপি ইমরানের সেল্টারে থেকে বিএনপি কর্মীদের ওপর নির্যাতন চালিয়েছেন। ৫ আগস্টের পর দলে ঢুকে তিনি বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করছেন এবং দলের ভাবমূর্তি নষ্ট করছেন। অভিযোগের সঙ্গে জুবের ও তার পরিবারের সদস্যদের আওয়ামী লীগের কর্মসূচিতে অংশগ্রহণের স্থিরচিত্রও জমা দেওয়া হয়েছে।
সিলেট জেলা ছাত্রদলের শীর্ষ একজন নেতা জানান, জুবেরের বিষয়টি যুবদলের শীর্ষ নেতারা জানলেও তাঁরা কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছেন না কেন। জুবের দলের ক্ষতি করছেন।
গোয়াইনঘাট উপজেলা যুবদলের আহ্বায়ক অ্যাডভোকেট শাহজাহান সিদ্দিকী বলেন, যুবদলের নাম ভাঙিয়ে কোনো অপকর্ম বরদাস্ত করা হবে না। জুবের যদি চোরাচালান বা সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকেন, তবে তার বিরুদ্ধে কঠোর সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
তোফায়েলের বাড়িতে হামলা ও বৃদ্ধের আঙুল কাটার বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে এসআই ফয়েজ উদ্দিন বিষয়টির সত্যতা নিশ্চিত করে জানান, আঙুল কাটার ঘটনা সারা বাংলাদেশ জানে। বিষয়টি নিষ্পত্তি করে ফেলেছে তারা।
এ বিষয়ে সুপ্রিম কোর্টের একজন আইনজীবীর সঙ্গে কথা বললে তিনি জানান, কারো আঙুল কেটে নেওয়া দণ্ডবিধির ৩২৬ ধারার অপরাধ, যা জামিন অযোগ্য এবং অ-আপোষযোগ্য। অর্থাৎ ভুক্তভোগী টাকা নিলেও আইনের হাত থেকে বাঁচার সুযোগ নেই। কোনো পুলিশ কর্মকর্তা যদি এই অপরাধকে ‘নিষ্পত্তি হয়েছে’ বলে দাবি করেন, তবে তিনি আইনি প্রক্রিয়ার লঙ্ঘন করছেন। কোনো গুরুতর শারীরিক জখমের ঘটনা আদালতের বাইরে মীমাংসা করার এখতিয়ার পুলিশ বা কারো নেই।
গোয়াইনঘাট থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. ওমর ফারুক জানান, আমি থানায় নতুন যোগদান করেছি। আইনশৃঙ্খলা রক্ষায় পুলিশ তৎপর রয়েছে। তোফায়েলের বাড়িতে হামলার বিষয়টি পুনরায় তদন্ত করা হবে। অপরাধী যে দলেরই হোক, ছাড় পাবে না।
অন্যদিকে, দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) সিলেট কার্যালয়ের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, চার বছরে একজন দোকানদারের কোটিপতি হওয়া অস্বাভাবিক। সুনির্দিষ্ট অভিযোগ পেলে দুদক জুবেরের সম্পদের উৎস অনুসন্ধানে নামবে।
হাজিপুর সীমান্তের এই স্বঘোষিত ‘রাজা’ ও তার বাহিনীর দাপটে সাধারণ মানুষ এখন দিশেহারা। এলাকাবাসী জুবের ও তার বাহিনীর হাত থেকে বাঁচতে এবং তার অবৈধ সম্পদের তদন্ত সাপেক্ষে দ্রুত প্রশাসনের কঠোর হস্তক্ষেপ কামনা করছেন।
১৩১ বার পড়া হয়েছে