সর্বশেষ

মতামত

ক্ষমতার ক্ষুধা ও বিপন্ন মানবতা

লিটন আব্বাস
লিটন আব্বাস

শুক্রবার, ১২ জুন, ২০২৬ ৩:৪৫ পূর্বাহ্ন

শেয়ার করুন:
ইতিহাসের পাতা ওল্টালে একটি নির্মম সত্য বারবার উন্মোচিত হয়—সাম্রাজ্যের নাম বদলায়, শাসকের মুখোশ বদলায়, কিন্তু আধিপত্যের আদিম ও নিষ্ঠুর চরিত্রটি কখনো বদলায় না। খ্রিস্টপূর্ব হাজার বছর আগের ফারাওদের প্রাচীন মিশরীয় সাম্রাজ্য, পারস্য, ইউরোপ-এশিয়া কাঁপানো রোমান সাম্রাজ্য, মধ্যযুগের বাইজেন্টাইন সাম্রাজ্য, মঙ্গোলীয় সাম্রাজ্য এবং আধুনিক যুগের অটোম্যান সাম্রাজ্য ও ঔপনিবেশিক যুগের ‘সূর্য অস্ত না যাওয়া’ ব্রিটিশ রাজত্ব, কিংবা আজকের আধুনিক যুগের নব্য-সাম্রাজ্যবাদী পরাশক্তি—সবারই মূল চালিকাশক্তি ছিল প্রায় এক। সীমাহীন লোভ এবং ক্ষমতার অপপ্রয়োগ। শক্তির এই মদমত্ততায় যুগে যুগে পিষ্ট হয়েছে সাধারণ মানুষ। ক্ষমতার বাগিচা সম্প্রসারণের এই রক্তাক্ত মহড়ায় আজ বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি মানুষের দীর্ঘশ্বাস, ক্ষুধা, মঙ্গা ও মৃত্যুর এক অন্তহীন মিছিল তৈরি হয়েছে।

সভ্যতার এত বিকাশ এবং মানবাধিকারের এত স্লোগানের পরও আধুনিক সাম্রাজ্যবাদীদের বিবেককে মানুষের এই চরম হাহাকার বিন্দুমাত্র টলাতে পারছে না।

আধিপত্যবাদের এই বিষাক্ত রেশ আফ্রিকা থেকে শুরু করে গোটা এশিয়াজুড়ে বিস্তৃত। ক্ষমতার এই নির্মম খেলায় মেতে উঠেছে কিছু শক্তিশালী রাষ্ট্র, যারা তাদের পার্শ্ববর্তী অপেক্ষাকৃত দুর্বল প্রতিবেশী দেশগুলোর ওপর প্রতিনিয়ত জবরদস্তিমূলক নীতি চাপিয়ে দিচ্ছে। সীমান্তের কাঁটাতারে কিংবা ভূ-রাজনীতির নোংরা দাবার চালে পিষ্ট হচ্ছে সাধারণ মানুষের জীবন। তীব্র রোদে পুড়ে, অনাহারে-বৃষ্টিতে ভিজে যেসব নারী, পুরুষ ও শিশু আজ যাযাবর, দেশহীন তারা, দিশাহীন তারা! জন্ম নিয়ে যেন মহাপাপী! ভুক্তভোগীরা নিজদেশে বাস্তুচ্যুত হয়ে পথে পথে। এইসব অসহায় প্রান্তিক মানুষের আশ্রয় হচ্ছে সীমান্তের শূন্যরেখায় খোলা আকাশের নিচে। কেন ঠেলে দেওয়া হচ্ছে; তারা কি দেশহীন ভিন দেশের বাসিন্দা? সভ্য পৃথিবীর সামনের এ কেমন জুলুম ও জালিয়াতির কূটনীতি? তাদের ভুখা মুখ, কোটরগত চোখ, গড়িয়ে পড়া চোখের জলই যেন জালিম শাসকদের রোজকার তৃষ্ণা ও আহার মেটানোর উপাদান!

জবরদস্তিমূলক সম্প্রসারণনীতি, দুর্বলকে গ্রাস করার আগ্রাসন; ত্রয়োদশ শতকের নিষ্ঠুর মঙ্গোল শাসক হালাকু খানের বাগদাদ ধ্বংসের সেই নির্মম ইতিহাসকে স্মরণ করিয়ে দেয়। বর্তমানের আধুনিক শাসকেরা হয় ইতিহাস পড়ে না, না হয় ইতিহাস থেকে কোনো শিক্ষা নেয় না।

সাম্রাজ্যবাদের এই আগ্রাসী নীতির সবচেয়ে বড় এবং প্রত্যক্ষ শিকার হলো সাধারণ মানুষের মৌলিক অধিকার। বর্তমান প্রযুক্তিনির্ভর একবিংশ শতাব্দীতেও যুদ্ধ, প্রক্সি ওয়ার এবং কৃত্রিমভাবে তৈরি করা অর্থনৈতিক সংকটের কারণে বিশ্বের বিশাল জনগোষ্ঠী আজ চরম পুষ্টিহীনতা ও তীব্র খাদ্য সংকটে ভুগছে। ভূ-রাজনৈতিক স্বার্থ চরিতার্থ করার জন্য যখন কোনো অঞ্চলে নিষেধাজ্ঞা জারি করা হয় কিংবা বোমাবর্ষণ করা হয়; তখন তার প্রথম আঘাতটি গিয়ে পড়ে সাধারণ মানুষের দুপুরের খাবারের থালায়। বিশ্বজুড়ে বাস্তুচ্যুত মানুষের সংখ্যা ইতিহাসের সব রেকর্ড ছাড়িয়ে গেছে। নিজ মাতৃভূমি, সাজানো সংসার এবং শৈশবের স্মৃতি ফেলে স্রেফ প্রাণ বাঁচানোর তাগিদে লাখ লাখ মানুষ আজ উদ্বাস্তু। সংঘাতপ্রবণ এলাকাগুলোতে নারীদের ওপর নির্যাতন ও সহিংসতা সাম্রাজ্যবাদী আধিপত্যের অন্যতম একটি হাতিয়ার হয়ে উঠেছে।

এই আধিপত্যবাদী শাসকেরা সর্বতই ভিন্ন প্রজাতির জীব। সাধারণ মানুষের চোখের জলে এরা সকালের সুগন্ধায় হিংস্রতা ফোটায়; এদের কূটনীতির টেবিল সাজানো হয় লাখো মানুষের কান্নার সুতোয়। এদের দুপুরের খাবারে যেন মিশে থাকে নিরীহ মানুষের রক্তের ঝোল। রাতের আঁধারে এরা মেতে ওঠে এক আদিম খেলায়—যেখানে মানুষ ও পশুর মাংসের কোনো তফাত থাকে না, যেখানে মানবতা লাঞ্ছিত হয় অতি মুনাফা ও অস্ত্র ব্যবসার লোভে। অস্ত্রের ঝনঝনানি এবং সাম্রাজ্য বিস্তারের এই নেশা এতটাই তীব্র যে, কোনো আন্তর্জাতিক আইন কিংবা মানবিক আবেদন এদের এই নিষ্ঠুর পথ থেকে তাদেরকে বিচ্যুত করতে পারছে না। মদমত্ততায় অন্ধ এই শাসকেরা আজ কাউকেই তোয়াক্কা করছে না; কিন্তু তাদেরও ভয়াবহ পরিণতি অপেক্ষমাণ।

ইতিহাস আমাদের স্পষ্টভাবে শেখায়, কোনো সাম্রাজ্যই চিরস্থায়ী নয়। ফারাওদের পিরামিড মমি আগলে দাঁড়িয়ে আছে, রোমানদের কলোসিয়াম কেবলই ধ্বংসাবশেষ, মঙ্গোলদের সেই দাপট আজ ইতিহাসের পাতায় বন্দী। অমোঘ নিয়মেই প্রতিটি অত্যাচারী শক্তিরই পতন নিশ্চিত এবং আধুনিক আধিপত্যবাদীরাও এর ব্যতিক্রম নয়। তবে জাগতিক পতনের চেয়েও বড় এক মহাসত্য এদের সামনে অপেক্ষমাণ। এই বিশ্বজগতের একজন প্রতিপালক আছেন, যিনি সর্বশক্তিমান এবং সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান। জগতের সব অত্যাচারীর ক্ষমতার দম্ভকে চূর্ণ করে একদিন সবাইকে তাঁর কাছেই ফিরে যেতে হবে। সেদিন পরম বিচারকের কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে প্রতিটি রক্তপাত, প্রতিটি অশ্রুবিন্দু এবং প্রতিটি জুলুমের পুঙ্খানুপুঙ্খ হিসাব দিতে হবে। আধিপত্যবাদীরা আজ ক্ষমতার মোহে অন্ধ হয়ে এই চিরন্তন সত্যকে ভুলে থাকলেও, সৃষ্টির নিয়মে বিচার ও পতন কিন্তু অনিবার্য।

লেখক : নাট্যকার ও প্রাবন্ধিক

১৩৪ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন
এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন














সর্বশেষ সব খবর
মতামত নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

২৫০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন