রত্নগর্ভা মায়ের অগ্নিগর্ভ বিদায়ঃ সমাজ ও রাষ্ট্রের দায়
বুধবার, ৩ জুন, ২০২৬ ৫:৩৮ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রত্যেক মা-বাবারই স্বপ্ন থাকে। তারা চান তাঁদের সন্তানরা উচ্চশিক্ষিত হোক, প্রতিষ্ঠিত হোক এবং সমাজে সম্মানজনক অবস্থান অর্জন করুক। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে অনেক অভিভাবকের স্বপ্ন থাকে সন্তানকে দেশের শীর্ষ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, যেমন বুয়েট, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় বা ঢাকা মেডিকেল কলেজে পড়ানো।
নুরজাহান বেগমও ব্যতিক্রম ছিলেন না। তিনি তাঁর সন্তানদের সুশিক্ষিত ও প্রতিষ্ঠিত করার জন্য জীবনের সবটুকু শ্রম, ত্যাগ এবং মমতা উৎসর্গ করেছিলেন। তাঁর সন্তানদের কেউ বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক হয়েছেন, কেউ উচ্চপদস্থ প্রশাসনিক কর্মকর্তা, কেউ বিদেশে প্রতিষ্ঠিত জীবন গড়েছেন। সমাজের প্রচলিত মানদণ্ডে এটি নিঃসন্দেহে এক সফল মায়ের গল্প হওয়ার কথা ছিল।
কিন্তু সাম্প্রতিক ঘটনাপ্রবাহ আমাদের সামনে এক বেদনাদায়ক প্রশ্ন উত্থাপন করেছে। শিক্ষা, পেশাগত সাফল্য এবং সামাজিক মর্যাদা কি সত্যিই মানুষকে মানবিক করে তোলে? নাকি মানবিক মূল্যবোধের অনুপস্থিতিতে এসব অর্জন কেবল বাহ্যিক সাফল্যেই সীমাবদ্ধ থাকে? নুরজাহান বেগমের মৃত্যুকে ঘিরে যে তথ্যগুলো গণমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে, তা শুধু একটি পরিবারের সংকট হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ঘটনাটি আমাদের সামাজিক ও নৈতিক অবক্ষয়ের প্রতীক।
একজন মা, যিনি সন্তানদের মানুষ করতে নিজের জীবন উৎসর্গ করেছেন, জীবনের শেষ সময়ে যদি প্রয়োজনীয় সেবা, যত্ন এবং সঙ্গ থেকে বঞ্চিত হন, তাহলে তা শুধু পারিবারিক ব্যর্থতা নয়, আমাদের সামাজিক মূল্যবোধেরও গভীর সংকট নির্দেশ করে। প্রবীণ মানুষের প্রতি অবহেলা আজ বিশ্বব্যাপী একটি উদ্বেগজনক সামাজিক সমস্যা।
আধুনিক জীবনযাত্রা, ব্যক্তিকেন্দ্রিকতা, কর্মব্যস্ততা এবং পারিবারিক কাঠামোর পরিবর্তনের ফলে অনেক ক্ষেত্রে বৃদ্ধ মা-বাবা একাকীত্ব ও অবহেলার শিকার হচ্ছেন। তবে কোনো অবস্থাতেই এটি মানবিক দায়িত্ব এড়িয়ে যাওয়ার অজুহাত হতে পারে না। একজন সন্তানের সবচেয়ে বড় পরিচয় তার পেশাগত অবস্থান নয়, বরং তার মানবিকতা এবং দায়িত্ববোধ। এই ঘটনার পর সমাজের ভূমিকাও গুরুত্বপূর্ণ হয়ে ওঠে। ফলে, সামাজিক নিন্দা বা আবেগঘন প্রতিক্রিয়ার চেয়ে বেশি প্রয়োজন মানবিক মূল্যবোধ পুনর্গঠনের উদ্যোগ। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে নৈতিক শিক্ষা, পারিবারিক দায়িত্ববোধ এবং প্রবীণদের প্রতি সম্মানবোধের চর্চা আরও জোরদার করা প্রয়োজন। শিক্ষার্থীদের সামনে এমন উদাহরণ তুলে ধরা দরকার, যাতে তারা উপলব্ধি করতে পারে যে জীবনের প্রকৃত সাফল্য ডিগ্রি, পদমর্যাদা এবং মানবিক আচরণ ও দায়িত্ববোধের সমন্বয়ে গড়ে ওঠে।
রাষ্ট্রেরও এ ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব রয়েছে। যদি কোনো প্রবীণ ব্যক্তি অবহেলা, অযত্ন বা দায়িত্বহীনতার কারণে জীবনহানির শিকার হন, তবে ঘটনার নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া উচিত। আইন অনুযায়ী দায় নিরূপণ এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ রাষ্ট্রের দায়িত্ব। একই সঙ্গে প্রবীণ নাগরিকদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে বিদ্যমান আইন ও সামাজিক নিরাপত্তা ব্যবস্থার কার্যকর প্রয়োগ জরুরি।
এই ঘটনাকে ঘিরে আবেগ, ক্ষোভ এবং হতাশা স্বাভাবিক। তবে আমাদের মূল মনোযোগ হওয়া উচিত এমন পরিস্থিতি যেন আর কোনো পরিবারের ক্ষেত্রে না ঘটে, সেই ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
নুরজাহান বেগমের মৃত্যু আমাদের সমাজের জন্য একটি গভীর সতর্কবার্তা, যা পারিবারিক ও সামাজিক মূল্যবোধের বর্তমান অবস্থাকে নতুন করে ভাবতে বাধ্য করে। আমরা যদি এই ঘটনার ভেতরে লুকিয়ে থাকা নৈতিক শিক্ষা গ্রহণ করতে ব্যর্থ হই, তাহলে ভবিষ্যতে আরও অনেক প্রবীণ মানুষ একই ধরনের অবহেলা ও নিঃসঙ্গতার শিকার হতে পারেন। একটি সভ্য সমাজের মানদণ্ড নির্ধারিত হয় সে সমাজ তার সবচেয়ে দুর্বল ও নির্ভরশীল মানুষদের কতটা মর্যাদা ও নিরাপত্তা দেয় তার ওপর। সেই বিবেচনায় নুরজাহান বেগমের মর্মান্তিক পরিণতি আমাদের প্রত্যেককে আত্মসমালোচনার সামনে দাঁড় করিয়ে দিয়েছে। এখন প্রশ্ন হলো, আমরা কি এই ঘটনা থেকে শিক্ষা নেব, নাকি এটিকেও সময়ের স্রোতে হারিয়ে যেতে দেব?
লেখক : শিক্ষক, নৃবিজ্ঞান বিভাগ,
শাহজালাল বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়।
৯৬১ বার পড়া হয়েছে