সর্বশেষ

জাতীয়

ঈদের ছুটিতে সড়কে ঝরল ৭৯ প্রাণ

মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় সর্বাধিক মৃত্যু

স্টাফ রিপোর্টার
স্টাফ রিপোর্টার

সোমবার, ১ জুন, ২০২৬ ৩:৩২ অপরাহ্ন

শেয়ার করুন:
পবিত্র ঈদুল আজহাকে কেন্দ্র করে টানা সাত দিনের সরকারি ছুটি শেষে আবারও কর্মচাঞ্চল্যে ফিরছে দেশ। তবে আনন্দময় ঈদযাত্রা ও স্বজনদের সঙ্গে উৎসব উদযাপনের এই সময়টিই অনেক পরিবারের জন্য পরিণত হয়েছে শোকের অধ্যায়ে। ঈদের ছুটির সাত দিনে দেশের বিভিন্ন স্থানে ঘটে যাওয়া সড়ক দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন অন্তত ৭৯ জন। আহত হয়েছেন আরও ১৩৫ জনের বেশি।
মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনার দৃশ্য।

২৫ মে থেকে ৩১ মে পর্যন্ত রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন জেলায় সংঘটিত অন্তত ৩২টি বড় সড়ক দুর্ঘটনায় এসব হতাহতের ঘটনা ঘটে। দুর্ঘটনাগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রাণহানি হয়েছে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায়। সংশ্লিষ্টদের মতে, ঈদকে ঘিরে বাড়তি যানবাহনের চাপ, বেপরোয়া গতি, ঝুঁকিপূর্ণ ওভারটেকিং, মহাসড়কে মোটরসাইকেলের অনিয়ন্ত্রিত চলাচল এবং সড়ক ব্যবস্থাপনার দীর্ঘদিনের দুর্বলতাই এ পরিস্থিতির জন্য দায়ী।

পরিসংখ্যান বলছে, সাত দিনে সংঘটিত ৩০টি বড় দুর্ঘটনার মধ্যে ১৫টিই ছিল মোটরসাইকেলকেন্দ্রিক। এসব দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ৩২ জন, যা মোট মৃত্যুর প্রায় ৪০ শতাংশেরও বেশি।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গণপরিবহনের সংকট, অতিরিক্ত ভাড়া এবং দ্রুত গন্তব্যে পৌঁছানোর প্রবণতার কারণে অনেকেই মোটরসাইকেলকে বিকল্প হিসেবে বেছে নিচ্ছেন। কিন্তু পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ ও অভিজ্ঞতা ছাড়া মহাসড়কে মোটরসাইকেল চালানোর কারণে দুর্ঘটনার ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যাচ্ছে।

ঈদের ছুটির শেষ দিন রোববার দেশের বিভিন্ন জেলায় একাধিক প্রাণঘাতী দুর্ঘটনা ঘটে।

নেত্রকোনার সদর উপজেলার চল্লিশা এলাকায় বাসের চাপায় একটি ব্যাটারিচালিত ইজিবাইকের তিন যাত্রী নিহত হন। নিহতদের মধ্যে ছিলেন এক মা ও তাঁর দুই কন্যা। সাতক্ষীরার শ্যামনগরে মোটরসাইকেলের ধাক্কায় এক বৃদ্ধের মৃত্যু হয়। দিনাজপুরের নবাবগঞ্জে বাসের চাকায় পিষ্ট হয়ে প্রাণ হারান এক তরুণী।

কুষ্টিয়ার মিরপুরে যাত্রীবাহী বাস ও সেনাবাহিনীর সদস্য বহনকারী একটি বাসের মুখোমুখি সংঘর্ষে একজন নিহত এবং অন্তত ৩২ জন আহত হন। গাইবান্ধার পলাশবাড়ীতে বাস খাদে পড়ে এক নারী নিহত ও ১০ জনের বেশি আহত হন।

চাঁদপুরের হাজীগঞ্জে দুটি বাসের প্রতিযোগিতামূলক গতির মধ্যে পড়ে এক নাইটগার্ড নিহত হন। একই জেলার ফরিদগঞ্জে পিকআপ ও মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে এক কিশোর প্রাণ হারায়।

অন্যদিকে ফরিদপুরের ভাঙ্গায় যাত্রীবাহী একটি বাস নিয়ন্ত্রণ হারিয়ে খাদে পড়ে অন্তত ৩০ জন আহত হন। যদিও সেখানে কোনো প্রাণহানির ঘটনা ঘটেনি।

ঈদযাত্রার প্রথম দিন ২৫ মে টাঙ্গাইলের কালিহাতীতে ঘটে ছুটিকালীন সবচেয়ে ভয়াবহ দুর্ঘটনা। রডবোঝাই একটি ট্রাক উল্টে ১৫ শ্রমিক নিহত হন। আহত হন আরও অনেকে।

একই দিনে বগুড়ার শাজাহানপুরে গ্রামের বাড়ি ফেরার পথে মোটরসাইকেল দুর্ঘটনায় প্রাণ হারান একটি উন্নয়ন সংস্থার কর্মী এবং তাঁর চার বছরের শিশু কন্যা। নওগাঁর পত্নীতলায় ডাম্প ট্রাকের সঙ্গে সংঘর্ষে ইজিবাইকের চালকসহ দুইজন নিহত হন।

২৬ মে কিশোরগঞ্জের মিঠামইনে চালবোঝাই পিকআপের সঙ্গে মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে একই পরিবারের তিন সদস্য নিহত হন। বরিশালের গৌরনদীতেও বাসের ধাক্কায় মোটরসাইকেলে থাকা একই পরিবারের তিনজনের মৃত্যু হয়।

সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়ায় বাসচাপায় সিএনজিচালিত অটোরিকশার তিন যাত্রী নিহত হন। রাজধানীর নদ্দা এলাকায় নিয়ন্ত্রণ হারানো একটি বাস সড়ক বিভাজক ভেঙে বিপরীতমুখী আরেকটি বাসে ধাক্কা দিলে চারজন নিহত এবং অন্তত ১০ জন আহত হন।

ফরিদপুরের ভাঙ্গায় দুটি মোটরসাইকেলের মুখোমুখি সংঘর্ষে দুই চালক নিহত হন। ঈদের দিন গোপালগঞ্জে বাস ও মোটরসাইকেলের সংঘর্ষে পাঁচজন প্রাণ হারান এবং অন্তত ২০ জন আহত হন।

দিনাজপুর, নরসিংদী, পটুয়াখালী, বগুড়া, টাঙ্গাইল, চট্টগ্রামসহ বিভিন্ন জেলায় ঈদের দিন ও পরবর্তী দিনগুলোতেও একের পর এক দুর্ঘটনায় প্রাণহানি ঘটে।

পরিবহন বিশ্লেষকদের মতে, দেশের সড়ক ব্যবস্থাপনায় দীর্ঘদিনের কাঠামোগত দুর্বলতা, ট্রাফিক আইন প্রয়োগে অসঙ্গতি, চালকদের অদক্ষতা এবং নিরাপদ পরিবহন ব্যবস্থার ঘাটতি দুর্ঘটনা বৃদ্ধির অন্যতম কারণ।

ঈদকে কেন্দ্র করে লাখো মানুষের একযোগে যাতায়াত, যানবাহনের অতিরিক্ত চাপ, বিশ্রামহীন চালক, ফিটনেসবিহীন যানবাহন এবং অতিরিক্ত গতিও দুর্ঘটনার ঝুঁকি বাড়িয়ে দেয়।

সড়ক দুর্ঘটনা প্রতিরোধে কেবল ঈদকেন্দ্রিক অভিযান বা সতর্কতার ওপর নির্ভর না করে দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা সংস্কৃতি গড়ে তোলার ওপর গুরুত্বারোপ করেছেন পরিবহন বিশেষজ্ঞ এবং বুয়েটের দুর্ঘটনা গবেষণা ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক মো. হাদিউজ্জামান।

তিনি বলেন, সারা বছর সড়কে বিশৃঙ্খলা চলতে থাকলে শুধু ঈদের সময় কিছু নির্দেশনা দিয়ে দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব নয়। নিরাপদ সড়ক ব্যবস্থাপনা একটি ধারাবাহিক চর্চার বিষয়, যা প্রশাসন, পরিবহন মালিক, চালক এবং সাধারণ মানুষের সম্মিলিত অংশগ্রহণ ছাড়া সম্ভব নয়।

তাঁর মতে, গণপরিবহনের সংকট এবং ভাড়া নৈরাজ্যের কারণে অনেক যাত্রী বাধ্য হয়ে মোটরসাইকেল ব্যবহার করছেন। ফলে মহাসড়কে মোটরসাইকেলের সংখ্যা বাড়ছে এবং দুর্ঘটনার ঝুঁকিও বেড়ে যাচ্ছে।

বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, দেশের সড়কের ওপর অতিরিক্ত চাপ কমাতে রেল যোগাযোগের সক্ষমতা বাড়ানো জরুরি। নিরাপদ, সাশ্রয়ী ও গণমুখী পরিবহন ব্যবস্থা গড়ে তুলতে রেলপথ সম্প্রসারণ, আধুনিক গণপরিবহন ব্যবস্থা চালু এবং সড়ক নিরাপত্তা আইন কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের বিকল্প নেই।

প্রতিবারের মতো এবারও ঈদের আনন্দের পাশাপাশি সড়ক দুর্ঘটনা কেড়ে নিয়েছে বহু মানুষের জীবন। অনেক পরিবার হারিয়েছে তাদের উপার্জনক্ষম সদস্যকে, অনেক শিশু হারিয়েছে বাবা-মাকে, আবার অনেক মা-বাবা হারিয়েছেন তাঁদের সন্তানকে।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সড়ক দুর্ঘটনাকে ‘নিয়তি’ হিসেবে নয়, বরং প্রতিরোধযোগ্য মানবসৃষ্ট সমস্যা হিসেবে বিবেচনা করে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা গ্রহণের মাধ্যমেই এ ধরনের প্রাণহানি কমানো সম্ভব। নিরাপদ সড়ক নিশ্চিত করা গেলে ভবিষ্যতে ঈদের আনন্দ আর শোকের মিছিলে পরিণত হবে না—এমন প্রত্যাশাই এখন সবার।

১৬৯ বার পড়া হয়েছে

শেয়ার করুন:

মন্তব্য

(0)

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন
এলাকার খবর

বিজ্ঞাপন

৩০০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন














সর্বশেষ সব খবর
জাতীয় নিয়ে আরও পড়ুন

বিজ্ঞাপন

২৫০ x ২৫০

বিজ্ঞাপন

বিজ্ঞাপন
৩২০ x ৫০
বিজ্ঞাপন