ক্ষুধার্ত চাঁদের কবি ও আগ্নেয়গিরির বর্ণমালা: সুকান্ত ভট্টাচার্যের শিল্প-প্রতিবেশে এক নির্জন পদচারণা
শুক্রবার, ১৫ মে, ২০২৬ ১:৪৭ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
১৩ মে। তারিখটা ক্যালেন্ডারের পাতায় নিছক একটি সংখ্যা হতে পারতো, কিন্তু বাংলার সাহিত্য-ইতিহাসে এই দিনটি যেন এক অসমাপ্ত মহাকাব্যের শেষ যতিচিহ্ন। ১৯৪৭ সালের এই গোধূলি লগ্নেই যবনিকা পড়েছিল এক কিশোরের জীবননাট্যে, যাঁর বয়স যখন মাত্র একুশ। একুশ-যৌবনের প্রারম্ভিক এই বয়সে মানুষ যখন স্বপ্ন আর অনুরাগের মোহজালে আচ্ছন্ন থাকে, তখন সুকান্ত ভট্টাচার্য নামের সেই দ্রোহী কিশোরটি বাংলা কবিতার চিরাচরিত মেদ আর রোমান্টিকতার মায়াজাল ছিন্নভিন্ন করে দিয়েছিলেন।
তিনি তাঁর ক্ষুরধার লেখনীতে এমন এক উত্তপ্ত লাভাস্রোত বইয়ে দিয়েছিলেন, যা তৎকালীন ঘুড়ে ধরা সমাজব্যবস্থার ভিত কাঁপিয়ে দিয়েছিল। সুকান্ত কেবল একজন কবি ছিলেন না; তিনি ছিলেন সময়ের এক নির্মোহ আয়না, এক প্রদীপ্ত জবানবন্দি। আজ ২০২৬ সালের এই বসন্ত-পরবর্তী তপ্ত দিনে দাঁড়িয়ে যখন তাঁকে ফিরে দেখার আয়োজন হয়, তখন বোঝা যায় তাঁর কবিতা কেন কেবল ধূসর ইতিহাসের অংশ নয়, বরং চিরকালীন এক মানবিক ইশতেহার।
সুকান্তের কাব্যকৃতির মূলে প্রবেশ করতে হলে আমাদের একটু পিছিয়ে গিয়ে দাঁড়াতে হবে বিংশ শতাব্দীর সেই ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ চল্লিশের দশকে। সেই সময়টা ছিল এক বিষাক্ত কুয়াশার মতো। একদিকে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের বিভীষিকা, অন্যদিকে তেপ্পান্নর মন্বন্তর-বাংলার রাজপথ তখন লাশের মিছিলে ভারী, লঙ্গরখানায় ক্ষুধার মানুষের দীর্ঘশ্বাস। আকাশজুড়ে সাম্রাজ্যবাদের শকুন উড়ছে। সেই সময়ে কবিদের কলমে যখন জ্যোৎস্না আর বিরহের আলপনা আঁকা হচ্ছিল, তখন সুকান্ত এক রুক্ষ বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়েছিলেন। তিনি দেখেছিলেন, ক্ষুধার জ্বালায় শিশুর ক্রন্দন আর বুর্জোয়া শ্রেণির বিলাসিতার মধ্যে যে দুস্তর ব্যবধান, তা কোনো মিঠে সুর দিয়ে মোছা সম্ভব নয়। তাই তাঁর কবিতায় রোমান্টিকতার স্নিগ্ধতা নেই, আছে যুদ্ধের সাইরেন।
অনেকে বলেন, সুকান্তের কাব্যাদর্শ ছিল মার্কসীয় দর্শনের এক কাব্যিক অনুবাদ। কথাটি হয়তো আংশিক সত্য, কিন্তু তাঁর কবিতা কোনো শুকনো রাজনৈতিক স্লোগান ছিল না। মার্কসীয় দ্বান্দ্বিক বস্তুবাদের যে তত্ত্ব পুঁথিগত পাতায় সীমাবদ্ধ থাকে, সুকান্ত তাকে নিয়ে এসেছিলেন বেলেঘাটার স্যাঁতসেঁতে গলি আর ফুটপাতের ধুলোয়। তিনি কেবল জগতকে ব্যাখ্যা করতে চাননি, চেয়েছিলেন তাকে দুহাতে বদলে দিতে। তাই তাঁর কলমে যখন বের হয়—'পূর্ণিমা-চাঁদ যেন ঝলসানো রুটি', তখন সেটি কেবল একটি উপমা থাকে না। এটি হয়ে ওঠে শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ চপেটাঘাত সেই নন্দনতত্ত্বের গালে, যা পেটের ক্ষুধার চেয়ে আকাশের চাঁদের সৌন্দর্যকে বড় করে দেখে। আচ্ছা, একজন ক্ষুধার্ত মানুষের কাছে চাঁদের রূপোলি মায়ার চেয়ে একখণ্ড গরম রুটির দাহিকা শক্তি কি বেশি কাম্য নয়? সুকান্ত সেই অমোঘ সত্যটিকেই কবিতার ছত্রে ছত্রে ফুটিয়ে তুলেছেন। রুটি এখানে নিছক খাদ্য নয়, এটি এক সর্বহারা শ্রেণির মৌলিক অধিকারের প্রতীক।
সুকান্তের দেখার চোখ ছিল অদ্ভুত রকমের গভীর। তিনি সাধারণ মানুষের অতি তুচ্ছ অনুষঙ্গকে শিল্পের সিংহাসনে বসিয়েছিলেন। এই যে একটা আধপোড়া সিগারেট, একটা অতি সাধারণ দেশলাই কাঠি কিংবা ক্লান্তিহীন এক রানার—এগুলো যে বিপ্লবের একেকটা স্ফুলিঙ্গ হতে পারে, তা সুকান্তের আগে বাংলা সাহিত্যে কেউ এমনভাবে ভাবেননি। তাঁর ‘রানার’ কবিতাটির কথা ধরা যাক। রাতের আঁধারে পিঠে খবরের বোঝা নিয়ে যে মানুষটি বন-বাদাড় পেরিয়ে ছুটে চলেছেন, তাঁর পায়ের নূপুরধ্বনি আর হাতের লণ্ঠন যেন এক অন্তহীন সংগ্রামের গল্প বলে। রানারের পথচলা আসলে এই ক্লান্ত সভ্যতার চাকা সচল রাখার সেই নেপথ্য কারিগরদেরই আখ্যান, যাদের ঘামের বিনিময়ে গড়ে ওঠে বড় বড় অট্টালিকা। সুকান্ত এখানে ওয়াল্টার বেঞ্জামিনের সেই ঐতিহাসিক বস্তুবাদের সুর যেন অলক্ষ্যে বুনে দিয়েছিলেন—ইতিহাসের আলো যেখানে কেবল রাজা-বাদশাদের ওপর নয়, বরং ব্রাত্য আর বিজিতদের ওপর এসে পড়ে।
কৈশোরের গণ্ডি ডিঙিয়ে সুকান্ত যখন ‘আঠারো বছর বয়স’ লিখলেন, তখন তিনি যৌবনের এক নতুন সংজ্ঞা নির্মাণ করলেন। আঠারো বছর তাঁর কাছে কেবল ক্যালেন্ডারের বয়স ছিল না; এটি ছিল এক মানসিক মেরুদণ্ড, যা অন্যায়ের কাছে মাথা নোয়াতে জানে না। তিনি লিখছেন—“আঠারো বছর বয়স কী দুঃসহ/ স্পর্ধায় নেয় মাথা তোলবার ঝুঁকি।” এই স্পর্ধা ছিল নজরুলের বিদ্রোহী সত্তার উত্তরসূরি, কিন্তু এখানে এক ধরণের সুশৃঙ্খল রাজনৈতিক সচেতনতাও ছিল। তিনি জানতেন, আবেগ দিয়ে হয়তো সাময়িক ঢেউ তোলা যায়, কিন্তু পৃথিবী বদলাতে প্রয়োজন সুসংগঠিত আদর্শ। তাই তো তাঁর পঙক্তিতে ঝরে পড়ে অটল বিশ্বাস—“সাবাস, বাংলাদেশ, এ পৃথিবী অবাক তাকিয়ে রয়/ জ্বলে পুড়ে ছারখার তবু মাথা নোয়াবার নয়।”
সুকান্তের জীবনদর্শনকে যদি একটু গভীরে গিয়ে পর্যবেক্ষণ করা যায়, তবে সেখানে জঁ-পল সার্ত্রের অস্তিত্ববাদের এক গোপন ছোঁয়া অনুভব করা সম্ভব। মার্কসবাদী হওয়া সত্ত্বেও সুকান্তের কবিতায় ব্যক্তির দায়বদ্ধতা ছিল প্রবল। ‘ছাড়পত্র’ কবিতায় তিনি যখন এক নবাগত শিশুর জন্য পৃথিবীকে বাসযোগ্য করে তোলার অঙ্গীকার করেন, তখন সেখানে ফুটে ওঠে এক বিশাল মানবিক দায়। তিনি যেন নিজেই সেই শিশুর কাছে এক সামাজিক চুক্তিতে আবদ্ধ হচ্ছেন। “এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি—/ নবজাতকের কাছে এ আমার দৃঢ় অঙ্গীকার।” এই কথাগুলো কেবল কবিতার লাইন নয়, বরং এক আগামীর স্বপ্নের বীজ। তিনি জানতেন যে শাসকগোষ্ঠী কেবল লাঠি আর বন্দুক দিয়ে শোষণ করে না, তারা তাদের আদর্শ দিয়েও মানুষের মগজ ধোলাই করে। সুকান্তের কবিতাগুলো ছিল সেই মগজ ধোলাইয়ের বিরুদ্ধে একেকটি বৌদ্ধিক মাইন।
সুকান্তের কবিতায় প্রথাগত নারী বা প্রেম হয়তো খুব একটা দেখা যায় না, কিন্তু সেখানে যা আছে, তা হলো সমষ্টির প্রতি এক বিশাল প্রেম। তাঁর কাছে প্রেম মানে কেবল নিরিবিলি বসে থাকা নয়, প্রেম মানে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে লড়াই করা। যখন তাঁর সমকালীন অন্য কবিরা সুররিয়ালিস্টিক জটিলতায় ডুবে ছিলেন, সুকান্ত তখন সহজ ভাষায় মানুষের প্রাণের কথা বলছেন। এই সারল্য ছিল তাঁর সচেতন এক কৌশল। আন্তোনিও গ্রামসি যেভাবে ‘অর্গানিক ইন্টেলেকচুয়াল’ বা জৈব বুদ্ধিজীবীর কথা বলেছিলেন, সুকান্ত ছিলেন অবিকল তাই। তিনি শ্রমিক-কৃষক শ্রেণির ভেতর থেকে উঠে আসা সেই কণ্ঠস্বর, যাঁর ভাষা ছিল সাধারণের, কিন্তু লক্ষ্য ছিল সুদূরপ্রসারী। তাঁর ‘সিগারেট’ কবিতাটির দিকে তাকালে এক অদ্ভুত রূপক চোখে পড়ে। মানুষ কীভাবে পুঁজিবাদের আগুনে পুড়তে পুড়তে অন্যকে আনন্দ দেয় এবং শেষে ছাই হয়ে এক কোণায় পড়ে থাকে—এই শ্লেষাত্মক চিত্রায়ন সুকান্তের কলম ছাড়া আর কার পক্ষেই বা সম্ভব ছিল?
বর্তমান সময়ের এই অতি-আধুনিক যুগে দাঁড়িয়ে সুকান্তের প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে হয়তো অনেকে তর্কে লিপ্ত হতে পারেন। কেউ হয়তো বলতে পারেন, এখন তো সাম্যবাদের সেই জোয়ার নেই। কিন্তু একটু ভেবে দেখলে দেখা যাবে, বিশ্বায়নের এই মোড়কে বৈষম্য কি কমেছে? বরং তা আরও সূক্ষ্ম ও ভয়াবহ রূপ ধারণ করেছে। প্রযুক্তির আড়ালে শ্রমিকের শ্রম আজ আরও বেশি নিংড়ে নেওয়া হচ্ছে। এডওয়ার্ড সাঈদ যে ‘ক্ষমতার কাছে সত্য বলা’-এর কথা বলেছিলেন, সুকান্ত তাঁর সংক্ষিপ্ত জীবনে প্রতিটি লাইনে সেই সত্যই উচ্চারণ করে গেছেন। তাঁর ‘দেশলাই কাঠি’ কবিতাটি আজও মনে করিয়ে দেয় যে, অবহেলিত সাধারণ মানুষ যখন ঐক্যবদ্ধ হয়, তখন তারা যে কোনো অজেয় সাম্রাজ্যকেও ছাই করে দেওয়ার ক্ষমতা রাখে। সুকান্ত লিখেছিলেন—“আমি একটা ছোট্ট দেশলাই কাঠি/ এমনি নগন্য, হয়তো চোখেও পড়ি না:/ তবু জেনো-/ মুখে আমার উসখুস করছে বারুদ-/ বুকে আমার জ্বলে উঠবার দুরন্ত ইচ্ছা;”। এই বারুদ হলো মানুষের সম্মিলিত চেতনার বারুদ, যা কোনোদিন নিঃশেষ হয় না।
সুকান্তের নন্দনতত্ত্বের এক অনন্য প্রকাশ ঘটেছে ‘হে মহাজীবন’ কবিতায়। এখানে তিনি জীবনের এক নির্মম ও রুক্ষ সত্যকে আলিঙ্গন করেছেন। সৌন্দর্যের চিরাচরিত সংজ্ঞায় পূর্ণিমার চাঁদ স্নিগ্ধতা ও মায়ার আধার, কিন্তু দারিদ্র্যের কশাঘাতে জর্জরিত মানুষের কাছে তা কেবল এক টুকরো ভোজ্য বস্তুর সাদৃশ্য। থিওডোর অ্যাডর্নো বলেছিলেন যে, আউশভিৎজের বীভৎসতার পর কবিতা লেখা অসম্ভব। সুকান্ত তার অনেক আগেই যেন ইঙ্গিত দিয়েছিলেন যে, মন্বন্তর আর ক্ষুধার হাহাকারের মাঝে রোমান্টিক কবিতা কেবল এক বিলাসিতা। তাই তিনি কবিতার কাছে ক্ষণিকের বিদায় চেয়ে গদ্যের রূঢ়তাকে বরণ করে নিতে চেয়েছিলেন। অথচ সেই রূঢ় গদ্যই তাঁর হাতে হয়ে উঠেছিল অমর পদ্য।
অকাল প্রয়াণ সুকান্তের শরীরকে কেড়ে নিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু তাঁর সৃষ্টিকে কি কোনোদিন ম্লান করতে পেরেছে? যক্ষ্মা রোগ তাঁকে মাত্র একুশ বছরে থামিয়ে দিয়েছিল বেলেঘাটার এক সাধারণ ঘরে। সেই প্রয়াণ ছিল বাংলা সাহিত্যের এক অপূরণীয় শূন্যতা। কিন্তু ‘ছাড়পত্র’, ‘ঘুম নেই’ বা ‘পূর্বাভাস’-এর মতো কাব্যগ্রন্থগুলো তাঁর মৃত্যুর পর প্রকাশিত হয়ে প্রমাণ করেছে যে, সুকান্ত তাঁর সময়ের চেয়ে অনেক বেশি এগিয়ে ছিলেন। তিনি যে জীর্ণ পৃথিবীকে সংস্কারের ডাক দিয়েছিলেন, সেই সংস্কারের কাজ কি শেষ হয়েছে? আজও যুদ্ধবিধ্বস্ত পৃথিবীতে কোনো শিশু নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে কাঁদতে কাঁদতে ঘুমিয়ে পড়ে। আজও রুটি আর চাঁদের দ্বন্দ্ব মেটেনি। তাই সুকান্ত আজও আমাদের সমসাময়িক, আজও আমাদের পাশের বাড়ির সেই চেনা কিশোর।
সুকান্তের কবিতা কোনো নির্দিষ্ট ভূগোলে আটকে থাকে না। ফিলিস্তিনের কান্নায় কিংবা ভিয়েতনামের লড়াইয়ে—সবখানেই তাঁর পঙক্তিমালা যেন জীবন্ত হয়ে ওঠে। তিনি ছিলেন সমষ্টির কবি। ব্যষ্টির তুচ্ছ দুঃখকে তিনি বিশ্বমানবের যন্ত্রণার সাথে মিলিয়ে দিতে পেরেছিলেন। মিখাইল বাখতিন যেমন বহুস্বরের বা ডায়ালজিক দর্শনের কথা বলেছিলেন, সুকান্তের কাব্যে সেই বহুস্বর স্পষ্ট। সেখানে কবির নিজের কণ্ঠের চেয়ে বেশি শোনা যায় কারখানার হাতুড়ির শব্দ, চাষির লাঙলের ঘর্ষণ আর রাস্তার ধারের নিঃস্ব মানুষের দীর্ঘশ্বাস। তাঁর কবিতা যেন এক জীবন্ত রণধ্বনি, যা প্রতিটি সংকটে গর্জে ওঠে এবং আমাদের শিরদাঁড়া সোজা করে দাঁড়ানোর মন্ত্র দেয়।
সুকান্ত ভট্টাচার্য কেবল একজন কিশোর কবি নন, তিনি ছিলেন এক প্রাজ্ঞ রাজনৈতিক দ্রষ্টা। তাঁর বিদ্রোহ ধ্বংসের নেশায় মত্ত ছিল না, বরং তা ছিল নতুন এক সৃষ্টির ভিত্তিপ্রস্তর। তিনি শিখিয়ে গেছেন, নিরাশার আঁধারেও কীভাবে আশার প্রদীপ জ্বালাতে হয়। জীবন সংক্ষিপ্ত হতে পারে, কিন্তু সেই জীবনের ছাপ যদি মহাকালের হৃদয়ে পড়ে, তবেই তার সার্থকতা। সুকান্ত আজও বেঁচে আছেন দেশলাই কাঠির দাহিকা শক্তির মাঝে আর সেই অনাগত শিশুর হাসির মাঝে যার জন্য তিনি তাঁর সবটুকু নিংড়ে দিয়েছিলেন।
তিনি বাঙালির অহংকার, বিশ্বমানবের সেই আদি কণ্ঠস্বর যা শোষিতের শেষ আশ্রয়। বাংলা কবিতার সেই চিরকিশোর আগ্নেয়গিরি আজও স্তব্ধ হয়নি; তিনি আজও স্পন্দিত হচ্ছেন প্রতিটি লড়াকু মানুষের হৃদপিণ্ডে। যতকাল শোষণ থাকবে, যতকাল বৈষম্য থাকবে, ততকাল সুকান্তের পঙক্তিগুলো এক একটি আগুনের গোলার মতো আমাদের পথ দেখাবে।
সময়ের স্রোতে অনেক কিছুই বদলে যায়, কিন্তু কিছু সত্য ধ্রুবতারার মতো স্থির থাকে। সুকান্তের সেই অম্লান প্রতিশ্রুতি আজ আমাদের কানে ভেসে আসে—“এ বিশ্বকে এ শিশুর বাসযোগ্য করে যাব আমি।” আমরা কি পেরেছি তাঁর সেই অঙ্গীকার পূরণ করতে? উত্তরটা হয়তো বাতাসের আর্তনাদেই লুকিয়ে আছে। কিন্তু চেষ্টার তো শেষ নেই। সুকান্ত আমাদের শিখিয়েছিলেন, লড়াইটাই বড় কথা। জয়ের চেয়েও মহৎ হলো সেই লড়াকু মানসিকতা। তাই তো তিনি আজও অমর। মৃত্যুর কোনো ক্ষমতা নেই তাঁর মতো এক জীবনতৃষ্ণায় ভরপুর কবিকে মুছে দেওয়ার। তিনি মিশে আছেন বাংলার ধুলো-মাটিতে, ঘামে-রক্তে আর এক সাম্যবাদী ভোরের প্রতীক্ষায়। তাঁর সেই অমোঘ জীবনবোধই তাঁকে দিয়েছে মৃত্যুঞ্জয়ী মর্যাদা। সুকান্ত ভট্টাচার্য—এক অবিনশ্বর চেতনার নাম, যা যুগ থেকে যুগান্তরে প্রতিধ্বনিত হয়ে চলবে।
লেখক: কবি ও প্রাবন্ধিক
১২০ বার পড়া হয়েছে