পুরাকীর্তি ঐতিহ্যের নিদর্শন ময়মনসিংহের গাঙ্গিনারপাড়ের ওভারহেড পানির ট্যাংক
শুক্রবার, ১৫ মে, ২০২৬ ৯:১৩ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
ময়মনসিংহের মুক্তাগাছার জমিদার মহারাজ সূর্যকান্ত আচার্য্য চৌধুরী (১৮৫১-১৯০৮) প্রায় ৪১/৪২ বছর জমিদারী পরিচালনা করেন। জমিদারী পরিচালনাকালে তিনি বিভিন্ন জনহিতকর কাজের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন। জনহিতকর কাজের অংশ হিসেবে তিনি ময়মনসিংহ নগরীর নাগরিকদের জন্য সর্বপ্রথম সুপেয় পানির ব্যবস্থা করেন। যার প্রেক্ষিতে ১৮৮৯-৯০ সালে স্ত্রীর নামানুসারে রাজ রাজেশ্বরী ওয়াটার ওয়ার্কস্ স্থাপন করা হয়। এই ওয়াটার ওয়ার্কসের মাধ্যমে নগরীতে সুপেয় পানি সরবরাহ কার্যক্রম শুরু হয়। এ লক্ষ্যে পরবর্তিতে ১৮৯২ সালের দিকে নগরীর বিভিন্ন স্থানে পানির কল স্থাপন করা হয়।
কালের আবর্তে সেসব পানির কল বিলীন/বেহাত হয়ে গেছে। নগরীর ট্রাংকপট্টি মোড়ে একটি পানির কল অবশিষ্ট থাকায় তা সংরক্ষণের লক্ষ্যে পুরাকীর্তি সুরক্ষা কমিটি কর্তৃক ১৬ সেপ্টেম্বর ২০২৫ তারিখে সিটি প্রশাসক বরাবর স্মারকলিপি প্রদান করলে সিটি কর্পোরেশন গত ফেব্রুয়ারি মাসের ০১ তারিখে পানির কলটির সংরক্ষণ কার্যক্রম সমাপ্তপূর্বক দৃষ্টিনন্দনভাবে দৃশ্যমান করে। ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশনের তৎকালীন প্রশাসন এক্ষেত্রে প্রশংসার দাবী রাখে।
রাজ রাজেশ্বরী ওয়াটার ওয়ার্কসের মাধ্যমে অধিকতর সহজভাবে নগরীতে সুপেয় পানি সরবরাহের লক্ষ্যে পরবর্তী ধাপে গাঙ্গিনারপাড় মোড়ে ওভারহেড পানির ট্যাংক স্থাপন করা হয়, যা কালের সাক্ষী হিসেবে আজও দাঁড়িয়ে আছে। তৎসময়ে এই ওভারহেড পানির ট্যাংকটি ছিল নগরীতে সুপেয় পানি সরবরাহের অন্যতম প্রধান মাধ্যম। বর্তমানে সিটি কর্পোরেশন নগরীতে সুপেয় পানি সরবরাহ করছে। যার যাত্রার শুরুর চিত্র এই ওভারহেড পানির ট্যাংক। ইতিহাস সাক্ষীকে দৃশ্যমান রাখা দায়িত্ব ও কর্তব্য। আর এ ক্ষেত্রে এই দায়িত্ব ও কর্তব্য পালন করতে হবে সিটি কর্পোরেশনকেই। যেহেতু ওভারহেড পানির ট্যাংকটি বর্তমানে সিটি কর্পোরেশনের তত্ত্বাবধানে রয়েছে।
প্রাচীন স্থাপনা বা পুরাকীর্তি ঐতিহ্যের নিদর্শন একটি অঞ্চলের ক্রমবিকাশের ইতিহাসের চাক্ষুষ সাক্ষী। যা দেখে প্রজন্ম সহজেই অনুধাবন করতে পারে তার পূর্ব প্রজন্মের জীবনধারা। জানতে পারে পূর্ব প্রজন্মের অবদান সম্পর্কে, যা ইতিহাসের পাঠ। তাই পৃথিবীর সকল দেশেই ইতিহাসের চাক্ষুষ সাক্ষী হিসেবে প্রাচীন স্থাপনা সমূহ পুরাকীর্তি নিদর্শন হিসেবে সংরক্ষণ করা হয় নিজেদের ইতিহাসের ভান্ডারকে সমৃদ্ধ করার জন্য। অপরদিকে প্রাচীন স্থাপনা যে কোন নগরীর সৌন্দর্যের অংশও বটে। ইতিহাসের সাক্ষী হিসেবে দাঁড়িয়ে থাকে বর্তমান সময়ে। প্রাচীন স্থাপত্যশিল্পের আবহে নগরীর সৌন্দর্যকে ফুটিয়ে তোলে দৃষ্টিনন্দনভাবে। যা আকর্ষণ করে দেশী-বিদেশী পর্যটকদেরও।
গাঙ্গিনারপাড় ময়মনসিংহ নগরীর কেন্দ্রস্থল। এ স্থানটি সারাদেশেই সর্বাধিক পরিচিত। এই গাঙ্গিনারপাড়ের মোড়েই অবস্থিত শতাব্দী প্রাচীন ওভারহেড পানির ট্যাংকটি। পানির ট্যাংকটির ঐতিহাসিক ও ঐতিহ্যগত পুরাকীর্তি গুরুত্ব অনুধাবন না করে পূর্বের সিটি কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষের তরফে বাণিজ্যিকভাবে লিজ প্রদান করায় এর সৌন্দর্যহানি ঘটে। একপাশে এটিএম বুথ, অপরপাশে বিলবোর্ড, মাঝখানে বড় এলইডি স্থাপন করায় এর দৃশ্যমান দৃষ্টিনন্দনতা অনেকাংশে ব্যাহত। এছাড়া এখানে নার্সারীও গড়ে উঠেছে।
ময়মনসিংহ একটি প্রাচীন নগরী। এর বুকে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে পুরাকীর্তি ঐতিহ্য। পুরাকীর্তি ঐতিহ্যগুলো সংরক্ষণ করা একান্ত জরুরি। কিন্তু দু:খজনক বাস্তবতা হলো, ময়মনসিংহ নগরীর অনেক পুরাকীর্তি নিদর্শন বিলীন/বেহাত হয়ে গেছে। এই নগরী হঠাৎ করে বেড়ে ওঠেনি। আজকের এই অবস্থায় আসতে তাকে পূর্ব প্রজন্মের হাত ধরে দীর্ঘপথ পাড়ি দিতে হয়েছে। আর দীর্ঘপথ পাড়ি দেওয়ার চাক্ষুষ সাক্ষী পুরাকীর্তি ঐতিহ্যের নিদর্শনসমূহ।
বর্তমান ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষকে নগরীতে সর্বপ্রথম সুপেয় পানি সরবরাহের সাক্ষী গাঙ্গিনারপাড়ের ওভারহেড পানির ট্যাংকটি সংরক্ষণপূর্বক দৃষ্টিনন্দনভাবে দৃশ্যমান করার জন্য আহবান জানাই। পাশাপাশি সাইনবোর্ডে পানির ট্যাংকের সংক্ষিপ্ত ইতিহাস লিখে প্রদর্শন করা হোক। তাহলে যে কেউ সংক্ষিপ্ত ইতিহাসটি পড়ে পানির ট্যাংকটি সম্পর্কে সম্যক তথ্য জানতে পারবে। এই কাজটি করে সিটি কর্পোরেশনও কালের সাক্ষীর অংশ হতে পারে। কালের সাক্ষী হওয়ার সেই সুযোগ সিটি কর্পোরেশন কর্তৃপক্ষের রয়েছে বলে মনে করি।
লেখক: ইমতিয়াজ আহমেদ, সদস্য সচিব, পুরাকীর্তি সুরক্ষা কমিটি, ময়মনসিংহ।
১২৫ বার পড়া হয়েছে