আবদুল্লাহ আবু সায়ীদ: বিতর্কের অতলে নয়, বোধের আলোয়
সোমবার, ৪ মে, ২০২৬ ৮:৪৩ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
সামাজিক জীব হিসেবে আমাদের মনে রাখা দরকার যে, ‘মানুষ’ শব্দটির ভেতরেই এক ধরনের অসম্পূর্ণতার
স্বীকারোক্তি নিহিত আছে। সীমাবদ্ধতার এই শব্দগত ও অর্থগত প্রকাশ কেবল ভাষাতাত্ত্বিক সত্য নয়;
বরং এক গভীর দার্শনিক উপলব্ধিজাতও বটে।
তবু আমাদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক মানসিকতার একটি মৌলিক সংকট হলো, মানুষকে তার স্বাভাবিক মানবিক পরিমণ্ডলে দেখতে আমরা অনাগ্রহী। নিজেদের প্রয়োজনে আমরা কোনো বিশেষ ব্যক্তিকে দেবতা কিংবা অন্তত ফেরেস্তার মর্যাদায় অধিষ্ঠিত দেখতে অথবা প্রতিষ্ঠা করতে চাই। এই অন্যায্য, অযৌক্তিক ও অবাস্তব প্রত্যাশা পরবর্তীতে অনিবার্যভাবে সাধারণ মানুষের মনে জন্ম দেয় হতাশা, বিভ্রান্তি এবং একধরনের প্রতিহিংসাপরায়ণ চরিত্রহননের প্রবণতা। মনোবিজ্ঞানের ভাষায়, এটি ‘আদর্শায়ন-অবমূল্যায়ন চক্র’ (আইডিয়েলাইজেশন-ডিভেলুয়েশন সাইকেল)-এর একটি সামাজিক রূপ যেখানে কাউকে অস্বাভাবিক উচ্চতায় তুলে ধরার পরই তাকে একটা বিশেষ পরিস্থিতিতে তীব্রভাবে নিচে নামিয়ে আনার প্রবণতা তৈরি হয়। অথচ বাস্তবতা হচ্ছে, মানুষ তার সীমাবদ্ধতা, দোষ-ত্রুটি এবং অভ্যন্তরীণ মনোজাগতিক দ্বন্দ্ব নিয়েই জন্মায়, বেড়ে ওঠে এবং একসময় অনন্তে বিলীন হয়। ফলে একজন মানুষের প্রকৃত মর্যাদা তার ত্রুটিহীনতার ভ্রান্ত ধারণায় নয়; বরং
ব্যক্তি হিসেবে তার মনুষ্যত্বে তথা মানবিকতা, নৈতিক সংবেদনশীলতা এবং যাপীতজীবনের বাস্তব প্রেক্ষাপটে আদর্শিক দৃষ্টান্ত স্থাপনের সক্ষমতায় নির্ধারিত হয়।
এই প্রেক্ষাপটে আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদকে বিচার করতে হলে ব্যক্তিগত বা গোষ্ঠিবদ্ধ আবেগ দিয়ে নয়,
বরং বোধ, বুদ্ধি ও উপলব্ধির আলোকে বাংলাদেশের আর্থ-সামাজিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক
প্রেক্ষাপটে বিচার-বিশ্লেষণ করাটা জরুরি। তাঁর সঙ্গে আমার প্রথম পরিচয় ১৯৯৫ সালের কোনো এক
সময়ে, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের আঙিনায়। এরপর ধীরে ধীরে তাঁর নিবিড় সান্নিধ্যে যাওয়ার এবং তাঁকে
ব্যক্তি হিসেবে খুবই কাছ থেকে দেখার সুযোগ তৈরি হয়। ফলে একদিকে তাঁর ব্যক্তিগত পরিসরে প্রবেশের
সুযোগ হয়েছে, অন্যদিকে দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলে তাঁর সঙ্গে কেন্দ্রের সম্প্রসারণের কাজে সময়
কাটানোর অভিজ্ঞতাও আমার রয়েছে। সমাজবিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ হলো, মানুষকে দূর
থেকে দেখা এবং ঘনিষ্ঠভাবে জানার অভিজ্ঞতা এক নয়; নৈকট্য মানুষের চরিত্রের জটিলতাকে
অনুবীক্ষণিক মাপকাঠিতে একজন গবেষকের দৃষ্টিতে দেখতে পাওয়ার সুযোগ সৃষ্টি করে। খুব কাছ থেকে
একজন মানুষকে দেখলে তার মানবিক দুর্বলতা যেমন অতিসহজেই স্পষ্ট ধরা পড়ে, তেমনি তার শক্তি,
সক্ষমতা, স্বাতন্ত্র্য এবং অন্তর্নিহিত বৌদ্ধিক জগতও উন্মোচিত হয়। জীবন-পাঠশালার একজন
জীবনভর শিক্ষার্থী হিসেবে তিনি আমার প্রাতিষ্ঠানিক না হলেও অনানুষ্ঠানিক শিক্ষাগুরু। তাঁকে কেবল
ভক্ত বা অনুরক্ত হিসেবে নয়, বরং জ্ঞানীয় উন্মেষের আন্দোলনে এক ধরনের সহযোদ্ধা হিসেবে দেখারও
সুযোগ হয়েছিল। তাঁর মানবিক সীমাবদ্ধতাগুলো কখনো আমার কাছে বিস্ময়ের কারণ হয়ে ওঠেনি; বরং তাঁর
চিন্তার গভীরতা, মানবিকবোধের বিশ্লেষণী শক্তি ও দৃষ্টিভঙ্গির স্বাতন্ত্র্য আমাকে মুগ্ধ করেছে এবং
তাঁর প্রতি আমার মনের গভীরে এক বৌদ্ধিক শ্রদ্ধাবোধ তৈরি করেছে।
আমার নিজের বেড়ে ওঠার পরিমণ্ডল, বিশেষত পারিবারিক পরিবেশ, পারিপার্শ্বিক সামাজিক বাস্তবতা
এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সাংস্কৃতিক আবহ, আমাকে কিছু গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দিয়েছে। বিশেষ করে আমাকে
সুযোগ দিয়েছিল স্বাধীনভাবে চিন্তা করা, প্রশ্ন তোলা এবং ভিন্নতাকে আলিঙ্গন করার মত উদারনৈতিক
চারিত্র্যিক বৈশিষ্ট্যকে ধারণ ও লালন করার সক্ষমতা অর্জনের। এই শিক্ষার মৌলিক ভিত্তির পেছনে
যেমন পিতামাতা, ভাই-বোন, আত্মীয়-স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবের ভূমিকা ছিল, তেমনি কিছু অনন্য শিক্ষকেরও
সান্নিধ্য তথা তাঁদের চরিত্রের মানবিকতা, নৈতিকতা ও উদারতাসহ শিক্ষার্থী হিসেবে আমাদের প্রতি
স্নেহাশীষ ছিল অনস্বীকার্য। তাঁরা আমাকে জীবনের নানা দিক চিনতে, বুঝতে ও উপলব্ধি করতে সাহায্য
করেছেন, কিন্তু কখনোই তাঁদের পথ অনুসরণ করতে বাধ্য করেননি। সেই সুযোগটা এক ধরনের গভীর
শিক্ষাদর্শের পরিচায়ক, যেখানে অনুকরণ নয়, বরং আত্ম-অন্বেষণকেই প্রাধান্য দেওয়া হয়। দর্শনের
ভাষায়, এটি হলো ‘বৌদ্ধিক স্বায়ত্তশাসন’(ইন্টালেকচুয়াল অটোনমি)-এর বিকাশ। এই স্বাধীনতাকে মনে-
প্রাণে-বিশ্বাসে ধারণ করতে পেরেই আমি জীবনভর নিজের মতো করে একটি বিবর্তনশীল মানস গঠনের
পথে এগোতে পেরেছি। ফলে জীবনচলার পথে কারো সাথে চেতনা, বিশ্বাস কিংবা আচরণগত ভিন্নতা কখনো
বিরূপতার তথা বিরক্তি, বিদ্বেষ কিংবা অশ্রদ্ধার জন্ম দেয়নি; বরং সেটা আমার মাঝে সহনশীলতা বৃদ্ধি
ও বহুত্ববাদের চর্চাকে আরও দৃঢ় করেছে। এই পটভূমিই আমাকে ১৯৯৫ থেকে ২০০১ সাল পর্যন্ত
বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের পরিবেশে বিচরণ করার সাহস, ধৈর্য, ঐকান্তিকতা ও অভিযোজনক্ষমতা প্রদান
করেছে যেখানে ব্যক্তিত্ব, জীবনদর্শন, বিশ্বাস, মতামত ও যাপীতজীবনের অভিজ্ঞতার বৈচিত্র্যের
মধ্যেও শ্রদ্ধাশীল বৌদ্ধিক সহাবস্থান সম্ভব হয়েছিল।
আমরা প্রায়ই ভুলে যাই, একজন ব্যক্তিমানুষ কোনো একক সূত্রে নির্মিত সত্তা নয়; বরং ইতিহাস,
ঐতিহ্য, সমাজ, অর্থনীতি, রাজনীতি, ধর্ম ও সংস্কৃতির দীর্ঘ এক জটিল প্রবাহের সঙ্গে তার জৈবিক
উত্তরাধিকার, আবেগিক অভিজ্ঞতা এবং সময়গত (টেম্পোরাল) বাস্তবতার বহুমাত্রিক মিথষ্ক্রিয়ায় তার
ব্যক্তিত্ব গড়ে ওঠে। ফলে মানুষের চরিত্র কখনোই সরলরৈখিক নয়; এটি জটিল, বহুস্তরবিশিষ্ট এবং
প্রায়শই পরস্পরবিরোধী মনোজাগতিক টানাপোড়েনের ভেতর দিয়েই বিকশিত হয়। মনোবিজ্ঞানের দৃষ্টিতে,
নিজের ভেতরে নিজের সাথে নিজের এই দ্বন্দ্ব এবং মনোজাগতিক আলোড়নই ব্যক্তিসত্তাকে স্থবিরতা
থেকে মুক্ত রেখে ক্রমাগত অগ্রগতির দিকে ঠেলে দেয়। এই অগ্রগতির পথে ‘সাফল্য’ কোনো চূড়ান্ত
গন্তব্য নয়, বরং ‘অগ্রসর হওয়া’ই মূল বিষয় এবং বেঁচে থাকার প্রেরণা। সেটাকেই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর
দার্শনিকতামন্ডিত করেছেন, ‘গতিতে জীবন মম, স্থিতিতে মরণ’ বলে। এই ক্রমবিকাশমান বোধ, বুদ্ধি ও
উপলব্ধির সংবেদনশীলতায় পৌঁছানোর পর আমি উপলব্ধি করেছি যে, আমার ভাষা, সংস্কৃতি, বিশ্বাস
এমনকি ‘জিন’ নামক জৈবিক উত্তরাধিকারের মধ্যেও একটি বহুবর্ণিল জীবনবোধের অন্তঃসলিলা
প্রবাহিত। এই উপলব্ধিই আমাকে ‘খোলা চোখে জগত দেখার’ অভ্যাসে অভ্যস্ত করেছে। ফলে আমি কখনো
কারো অন্ধ অনুসারী বা পদলেহনে অভ্যস্ত ভক্তে কিংবা অনুরক্তে পরিণত হইনি। আবার সমসাময়িক
বাস্তবতার চলমান ঘটনাপ্রবাহ থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কোনো নির্বিকার দর্শকও হয়ে উঠিনি। বরং জীবন
চলার পথে দূরত্ব ও সম্পৃক্ততার এক সূক্ষ্ম ভারসাম্যের মধ্যেও নিজের অবস্থান নির্মাণের চেষ্টা
করেছি।
এই ব্যক্তিগত বৌদ্ধিক যাত্রায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের (১৮৬১-১৯৪১) ভাষা, সাহিত্য ও দর্শনের
প্রভাববলয় থেকে অনুসন্ধিৎসু সমালোচনামূলক পর্যালোচনায় বিশেষ দূরত্ব তৈরি করার ক্ষেত্রে
আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদের ‘দুর্বলতায় রবীন্দ্রনাথ’ শীর্ষক বিশ্লেষণধর্মী নির্মেদ ও প্রখর লেখাটি
আমার জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ অনুঘটক হিসেবে কাজ করেছে। আর মনোজাগতিক ক্রমবিবর্তনে বোধ-বুদ্ধি-
উপলব্ধির এই অবস্থান্তরটাই আমার বৌদ্ধিক উত্তরণে বিশেষ সহায়ক হয়েছে। এখানে ‘উত্তরণ’ বলতে
নিজে প্রভাবমুক্ত হয়ে যাওয়া নয়, বরং প্রভাবকে সচেতনভাবে আত্মস্থ ও পুনর্মূল্যায়নের ক্ষমতা
অর্জন করা যা বৌদ্ধিক চর্চার মৌলিক পূর্বশর্ত। প্রাকযৌবনে অধীত সুফী দর্শনের প্রভাবও এখানে
আমার চেতনাগত উন্মেষে বিশেষ সহায়ক হয়েছিল। নৌকা যেমন পানিতে ভেসে থাকে কিন্তু পানির সঙ্গে
একীভূত হয় না, তেমনি এক ধরনের ‘মধ্যবর্তী অবস্থান’ (নোম্যান্স ল্যান্ড) থেকে আবদুল্লাহ আবু
সায়ীদের চিন্তার জগতের প্রভাববলয়ে ভেতরে ও বাইরে থেকে আমি আমার নিজস্ব বৌদ্ধিক পথচলাকে
ক্রমাগত পুণর্বিন্যস্ত করে এগিয়ে নিয়েছি, প্রতিনিয়তই আমি আমার নিজস্ব পথ নির্মাণের চেষ্টা
করেছি। সেটা ছিল অনেকটা লাটিমের মতই নিজ অক্ষে প্রাগসরমান অনির্ধারিত কক্ষপথে বোধ, বুদ্ধি ও
উপলব্ধির নিত্য-নতুন জাগরণকে আলিঙ্গন করে। সমাজতাত্ত্বিক ভাষায়, এটিকে বলা যায়
‘সমালোচনামূলক নৈকট্য’ (ক্রিটিক্যাল প্রোক্সিমিটি) যেখানে নৈকট্য ও দূরত্ব একে অপরকে বাতিল না
করে বরং সমর্থন করে, তথা পরস্পরের পরিপূরক হয়ে ওঠে। এই ভারসাম্যই আমাকে তাঁকে একজন মানুষ
হিসেবে, তাঁর ব্যক্তিচরিত্রের নানা জটিলতা, সীমাবদ্ধতা, দ্বন্দ্ব, সম্ভাবনা ও শক্তির সম্মিলিত
আলোকে দেখা, বোঝা এবং উপলব্দি করার সুযোগ করে দিয়েছে।
ক্ষুদ্র পরিসরে যাপীতজীবনের আলোকে সব কথা এখানে বলা সম্ভব নয়; তবে একটি বিষয় এখানে
অনিবার্যভাবে বলা যায় যে, বাতাসে ভেসে বেড়ানো সূক্ষ্ম বিষকণা যেমন মানুষের ফুসফুসে অদৃশ্য ক্ষত
তৈরি করে, তেমনি কোনো ব্যক্তিকে লক্ষ্য করে ছড়ানো অবিরাম বিষোদ্গারও একটি জাতির সামষ্টিক
মনস্তত্ত্বকে ধীরে ধীরে বিষাক্ত করে তোলে। আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের ব্যক্তিচরিত্রের প্রকৃতি,
কর্মকান্ডের লক্ষ্য, উদ্দেশ্য ও প্রক্রিয়া সম্পর্কের নেতিবাচক প্রচার-প্রচারণা কেবল একজন
ব্যক্তির বিরুদ্ধে আক্রমণ নয়; বরং একটি সমাজের বৌদ্ধিক স্বাস্থ্য ও নৈতিক পরিমণ্ডলের ওপরও
আঘাত। সুতরাং এই সময়কার একজন শক্তিমান মানবিক ব্যক্তিত্বকে চলমান রাজনৈতিক অপসংস্কৃতির
করালগ্রাস থেকে রক্ষা করা কেবল ব্যক্তিপ্রীতি বা আনুগত্যের প্রশ্ন নয়; এটি আমাদের এক ধরনের
বৌদ্ধিক, মানবিক ও নৈতিক দায়বদ্ধতা। এই দায়বোধ থেকেই যে কোনো সচেতন নাগরিকের প্রয়োজন,
কোন ব্যক্তিমানুষের কর্মকান্ডের সমালোচনাকে শালীনতার ভেতরে রাখা, বিশেষ করে ব্যক্তিকে নয়, বরং
তার কর্মকান্ডের যুক্তিসম্মত ও ন্যায়সঙ্গত মূল্যায়নের সংস্কৃতি গড়ে তোলা।
ব্যক্তিগতভাবে আবদুল্লাহ আবু সায়ীদকে আমি দেখি একজন ‘প্রান্তিক মানস’ এবং ‘প্রাতিস্বিক
ব্যক্তিত্ব’ হিসেবে। এখানে ‘প্রান্তিকতা’ কোনো ভৌগোলিক অবস্থানকে নির্দেশ করে না; বরং এক ধরনের
বৌদ্ধিক অবস্থান যেখানে ব্যক্তি সচেতনভাবে মূলধারার আরামদায়ক কেন্দ্রে না থেকে চিন্তার
প্রান্তরেখায় অবস্থান নেন। এই প্রান্তিকতা একদিকে মনোজাগতিক স্বাতন্ত্র্যের, অন্যদিকে কৌশলী
দূরদর্শিতারও প্রকাশ। কিন্তু আমাদের কলুষিত সামাজিক ও রাজনৈতিক বাস্তবতায় এমন ব্যক্তিত্ব
প্রায়শই ‘দশাচক্রে ভগবান ভুত’ হয়ে পড়েন। অর্থাৎ যিনি একসময় লোকসমাজে সম্মানিত হয়ে ওঠেন,
তাকেই রাজনৈতিক প্রতিহিংসায় পরবর্তীতে সন্দেহ, অপবাদ ও বিকৃত ব্যাখ্যার মাধ্যমে ‘অপর’ করে তোলা
হয়। এ প্রবাদের অন্তর্নিহিত সত্যটি এখানে বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। রাজদরবারের অমাত্য ‘ভগবান’
আসলে রক্তমাংসের মানুষ হলেও কিন্তু লোকসমাজে ‘ভুত’ এক ধরনের সামাজিক কল্পনা। সেই অলৌকিক
ভুতে বিশ্বাসী সাধারণ মানুষদের কাছে যুক্তিতর্ক সহজে গ্রহণযোগ্য হয় না। ফলে অতি সহজেই ‘ভগবান’
অবাঞ্চিত হয়ে পড়ে সমাজে। প্রশ্ন হলো, এই পরিস্থিতিতে বিবেকবান মানুষ কি নীরব দর্শকের ভূমিকা
নেবে? ইতিহাস বলে, তা কখনোই হয়নি, এবং হওয়াও উচিত নয়।
দুনিয়ার বৌদ্ধিক ইতিহাসে মানবিকতা ও সভ্যতার বিকাশে এমন প্রান্তিক মানুষের অভাব নেই। জার্মান
অর্থনীতিবিদ কার্ল মার্ক্স (১৮১৮-১৮৮৩), রাশিয়ান সাহিত্যিক লিও টলস্তয় (১৮২৮-১৯১০), কিংবা
সমসাময়িক বিশ্বে মার্কিন ভাষাতাত্ত্বিক নোম চমস্কি (১৯২৮-) এঁরা প্রত্যেকেই প্রচলিত ধারার বাইরে
দাঁড়িয়ে চিন্তার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছেন। তাঁদের প্রত্যেকের মধ্যেই ছিল মানবিক সীমাবদ্ধতা,
ব্যক্তিগত বিশ্বাস ও দার্শনিক বৈপরীত্য, এবং তাঁদের সামাজিক, রাজনৈতিক কিংবা বৌদ্ধিক অবস্থান
নিয়ে বিতর্ক অতীতেও ছিল, বর্তমানেও আছে, ভবিষ্যতেও থাকবে। তবু তাঁদের প্রকৃত শক্তি ছিল এক
জায়গায়, আর সেটা হলো তাঁরা প্রচলিত স্রোতের বিপরীতে দাঁড়ানোর সাহস দেখিয়েছেন এবং নিজের
বিশ্বাসের সাথে আত্মপ্রতারণা করেননি। এই সাহস এবং স্রোতের বিপরীতে লড়ে যাওয়াই তাঁদেরকে
ইতিহাসে প্রাসঙ্গিক করেছে। একইভাবে, বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটেও সাম্প্রতিক সময়ে আমরা দেখেছি
কীভাবে শহীদ শরীফ ওসমান হাদীর (১৯৯৩-২০২৫) মতো ব্যক্তিত্ব সাংস্কৃতিক আগ্রাসন ও রাজনৈতিক
আধিপত্যবাদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়ে এক ধরনের প্রান্তিক বৌদ্ধিক প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন। এই
উদাহরণগুলো আমাদের দেখায় যে, ব্যক্তিমানুষের প্রান্তিকতা দুর্বলতার নয়; বরং দেশ ও দশের কল্যাণে
সৃজনশীল দ্বান্দ্বিক প্রতিরোধ ও নতুন চিন্তার উন্মেষের উৎস।
নিজস্ব ব্যক্তিত্বের শক্তিতে বলীয়ান এই প্রান্তিক অবস্থানই উপরে উল্লেখিত কালজয়ী ব্যক্তিদের
চিন্তাকে সামাজিক ও সাংস্কৃতিক অগ্রগতির ক্ষেত্রে এক ধরনের দ্বন্দ্বিক শক্তিতে রূপ দেয়।
সমাজতাত্ত্বিক দৃষ্টিতে, এটি ‘দ্বান্দ্বিক উত্তেজনা’ (ডায়ালেকটিক্যাল টেনশান) যেখানে প্রচলিত ধারণা,
মূল্যবোধ ও ক্ষমতার কাঠামোর সঙ্গে সংঘর্ষের মধ্য দিয়েই নতুন জ্ঞান ও বোধের জন্ম হয়। এই
সংঘর্ষই আমাদের জ্ঞানীয় ‘অদেখা বাস্তবতা’ (ব্লাইন্ড স্পট) অর্থাৎ যেসব সীমাবদ্ধতায় আমরা
নিজেরা অনেক কিছুই দেখতে পাই না সেগুলোকে উন্মোচিত করতে সাহায্য করে। একজন ব্যক্তিমানুষ
হিসেবে আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদের ক্ষেত্রেও এই বৈশিষ্ট্যটি স্পষ্টভাবে লক্ষণীয়। তাঁর চিন্তা, কর্ম এবং
সাংস্কৃতিক উদ্যোগ বহু মানুষের বোধ, বুদ্ধি ও উপলব্ধিকে নাড়া দিয়েছে, অর্থাৎ কখনো আলোড়িত
করেছে, কখনো অস্বস্তিতে ফেলেছে, আবার কখনোবা নতুনভাবে ভাবতে বাধ্য করেছে। এক শ্রেণীর মানুষের
মাঝে এই আত্মজিজ্ঞাসা ও জ্ঞানীয় উদ্দীপনা সৃষ্টি করতে পারাটাই জাতির বৌদ্ধিক বিকাশে তাঁর প্রকৃত
অবদান। এখানেই তাঁর অনন্যতা, কিন্তু ব্যক্তিমানুষ হিসেবে তিনি নিখুঁত নন, কিন্তু সময়ের স্রোতে তরঙ্গ
তোলার মতো প্রাসঙ্গিক; তিনি ত্রুটিহীন নন, কিন্তু সাংস্কৃতিক অঙ্গনে নেতৃত্বের শূন্যতায় নেতৃত্ব
দেওয়ার মতো শক্তিমান ও প্রভাবশালী। সেই অর্থেই বাংলাদেশের বৌদ্ধিক ও সাংস্কৃতি পরিমন্ডলে তাঁর
উপস্থিতি বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ এবং তাঁর কর্মকান্ডের প্রভাব ভাবীকালের গবেষকদের গবেষণার
বিষয়বস্ত হওয়ার দাবীদার।
তাঁর বিরুদ্ধে যে অভিযোগগুলো প্রচলিত আছে এবং যেগুলো সাম্প্রতিক উত্থিত হয়েছে, সেগুলোর কিছু না
কিছু ভিত্তি থাকতেই পারে; সেসব বিষয়াদি অস্বীকার করার কোনো যৌক্তিকতা নেই। কিন্তু এসব
অভিযোগগুলোকে পরিপ্রেক্ষিত বিবেচনা ও বিচার-বিশ্লেষণ না করে উদ্দেশ্যমূলকভাবে ‘বিশেষ মোড়ক’-এ
বাজারজাতকরণের মাধ্যমে একজন প্রাতিস্বিক ব্যক্তিত্বের চরিত্রহননের হাতিয়ার হিসেবে ব্যবহার করা
নিছক সমালোচনা নয়; বরং এটি এক ধরনের সুপরিকল্পিত ভাষাগত আক্রমণ ও সামাজিক অসুস্থতার
লক্ষণ। মনোবিশ্লেষণী (সাইকো-এনালাইসিস) দৃষ্টিতে, এটি আমাদের সেই চিরপরিচিত পুরোনো প্রবণতারই
বহিঃপ্রকাশ যেখানে একশ্রেণীর মানুষ নিজেদের প্রয়োজনে প্রথমে ‘দেবতা নির্মাণ’ করে, তারপর আরেক
শ্রেণীর মানুষ সুযোগ পেলে সেই ‘দেবতা ভাঙা’র কাজ করতে কার্পন্য করে না। এই চক্রের কাছে জিম্মি
হওয়া আমাদের বৌদ্ধিক পরিপক্বতার অভাব ও চারিত্রিক দুর্বলতাকেই উন্মোজিত করে। এসব অভিযোগ
নিয়ে বিশদ আলোচনায় যাওয়া সম্ভব, কিন্তু তাতে হয়তো ‘অরণ্যে রোদন’ বা ‘উলুবনে মুক্ত ছড়ানো’র
মতোই ফলহীন বিতর্কের পুনরুৎপাদন ঘটবে। বরং এই মুহূর্তে অধিকতর জরুরি হলো ব্যক্তি আবদুল্লাহ
আবু সায়ীদকে তাঁর মানবিক সীমাবদ্ধতাসহ বুঝে নেওয়া, এবং অবক্ষয়গ্রস্ত বাস্তবতায় বৌদ্ধিক ও
সাংস্কৃতিক পরিসরে তাঁর অবদানকে যৌক্তিক, ন্যায্য ও প্রাসঙ্গিক অবস্থান থেকে মূল্যায়ন করা।
আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের বিশ্বাস, দর্শন ও ভাবধারার সঙ্গে আমার গভীর মতপার্থক্য থাকা সত্ত্বেও
তাঁকে শ্রদ্ধা করতে কখনোই আমার মনে দ্বিধা কিংবা কোন রকম সংকোচ বোধ জাগেনি। কারণ বৌদ্ধিক
সততার একটি মৌলিক শর্ত হলো মতভেদের মধ্যেও অন্য মানুষের মানবিক মর্যাদাকে অক্ষুণ্ণ রাখা। এই
অবস্থানটি আমাদের মনে করিয়ে দেয় ফরাসি চিন্তক ভলতেয়ারের (১৬৯৪-১৭৭৮) সেই সুপরিচিত উক্তিটি,
‘আমি তোমার কথার সঙ্গে একমত নাও হতে পারি, কিন্তু তোমার কথা বলার অধিকার রক্ষায় জীবন দিতেও
প্রস্তুত’। এই উক্তি কেবল বাকস্বাধীনতার নৈতিক ভিত্তিই নির্মাণ করে না; এটি আমাদের শেখায়,
ভিন্নমতকে দমন নয়, বরং ধারণ করার মধ্যেই একটি সভ্য সমাজের পরিপক্বতা নিহিত। অপরদিকে
আমাদের মনে রাখতে হবে যে, পরমতসহিষ্ণুতা গণতন্ত্রের মৌলিক পূর্বশর্ত। তাই কারো সঙ্গে চিন্তা,
চেতনা কিংবা আদর্শের অমিল থাকলেই তাকে সামাজিকভাবে ন্যাংটো করা বা হেয়প্রতিপন্ন করার কিংবা
বয়কট করার প্রবণতা হলো গণতান্ত্রিক চর্চার পরিপন্থী এবং সভ্যতার পরিমাপেও নিতান্তই
নীচুস্তরের আচরণ, এমনকি আত্মঘাতী। প্রকৃতপক্ষে ‘দেশ ও দশের কল্যাণে’ ‘বৈচিত্র্যের মাঝে ঐক্য’
প্রতিষ্ঠাই হলো জাতীয় অগ্রগতির স্মারক। আর জাতীয় ঐক্য ও সমৃদ্ধির খাতিরে আমরা সেটা করতে
পারলে জাতি হিসেবে বিশ্বের বুকে মর্যাদার আসন লাভ করব।
এই প্রেক্ষাপটে বিরুদ্ধ শক্তির প্রতি শহীদ শরীফ ওসমান হাদীর নৈতিক অবস্থান বিশেষ তাৎপর্যপূর্ণ।
তিনি আমাদের স্মরণ করিয়ে দেন যে, মনোজাগতিক আধিপত্যবাদ ও সাংস্কৃতিক হেজিমনির বিরুদ্ধে লড়াই
করতে হলে প্রতিপক্ষকে ধ্বংসাত্মক আক্রমণ বিজয়ী হওয়ার পথ বা পন্থা নয়, বরং সুপরিকল্পিত,
সৃজনশীল ও শক্তিমান সুদীর্ঘ প্রতিদ্বন্দ্বিতাই হতে পারে কার্যকর উপায়। অর্থাৎ যেসব ব্যক্তি বা
প্রতিষ্ঠানকে আপনি সাংস্কৃতিক আধিপত্যের কিংবা রাজনৈতিক আগ্রাসনের প্রতিভূ মনে করেন, তাদের
ধ্বংস করার চেষ্টা না করে নিজেকে এমনভাবে গড়ে তোলা, কিংবা নিজেরা এমন বিকল্প প্রতিষ্ঠান নির্মাণ
করা যা গুণগতভাবে এবং প্রভাব প্রতিপত্তির দিক থেকে প্রতিপক্ষের সমকক্ষ বা তার চেয়েও
শক্তিশালী। আর সেটাই হতে পারে কৌশলগত একটি সুস্থ যৌক্তিক, বৌদ্ধিক ও ন্যায়সঙ্গত সামাজিক
প্রতিক্রিয়া। ইতিহাসও বলে, টেকসই পরিবর্তন সবসময়ই নির্মাণের মাধ্যমে আসে, বিনাশের মাধ্যমে নয়।
দেশ ও দশের কল্যাণের প্রশ্নে তাই আমাদের মনে রাখতে হবে সমাজের জন্য সবচেয়ে জরুরি শিক্ষা হলো
মানুষকে মানুষ হিসেবে গ্রহণ করার নৈতিক সাহস অর্জন করা। এই প্রেক্ষাপটে আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ
এবং তাঁর প্রতিষ্ঠিত বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্র আমাদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত। সেগুনবাগিচার
একচালা টিনের একটি ছোট কক্ষ থেকে যে প্রতিষ্ঠানটি ধীরে ধীরে একটি জাতীয় সাংস্কৃতিক আন্দোলনের
রূপ নিয়েছে, তার ইতিহাস কেবল প্রাতিষ্ঠানিক সাফল্যের কাহিনি নয়; এটি একজন মানুষের স্বপ্ন,
অধ্যবসায়, ত্যাগ-তিতীক্ষা এবং বৌদ্ধিক দায়বদ্ধতার এক অনন্য সাক্ষ্য, হোক সেটা আপনার ও আমার
আদর্শ কিংবা স্বপ্নের সঙ্গে মিলে যাক বা না-ই যাক। শক্তিমান হিসেবে প্রাতিষ্ঠানিক সাফল্যের এই
উত্থানের মধ্য দিয়ে তিনি আমাদের শিখিয়েছেন মানুষ তার সীমাবদ্ধতা নিয়েও কীভাবে চিন্তার জগতে
প্রভাব বিস্তার করতে পারে; কীভাবে প্রান্তিক অবস্থান থেকেও মূলধারার বোধকে প্রশ্নবিদ্ধ করা যায়;
এবং কীভাবে বৌদ্ধিক সততা ও মানবিক দৃঢ়তা দিয়ে সময়ের সীমানাকে অতিক্রম করা সম্ভব।
এই অর্থে তাঁর ‘প্রান্তিক মানস’ ও ‘প্রাতিস্বিক ব্যক্তিত্ব’ কেবল ব্যক্তিগত বৈশিষ্ট্য নয়; এটি এক
ধরনের বৌদ্ধিক অবস্থান, যা বর্তমানের সীমা ছাড়িয়ে ভবিষ্যতের চিন্তার পরিসরেও প্রাসঙ্গিকতা ধরে
রাখার সম্ভাবনা সৃষ্টি করে। তাই তাঁকে বিচার করার ক্ষেত্রে আবেগের তাড়না নয়, বরং বোধ, বিশ্লেষণ
এবং নৈতিক সংযমই হওয়া উচিত আমাদের পথপ্রদর্শক আর এটাই আমার ব্যক্তিগত অভিমত। আমার এই
ব্যক্তিগত অভিমতের সাথে যে কেউই দ্বিমত করার অধিকার রাখেন এবং আমি সেটাকে শ্রদ্ধাভরে
অঙ্গীকার করি। পরমতসহিষ্ণুতার শিক্ষাই একটি জাতির সভ্য হওয়ার স্মারক এবং সভ্যতার চলমান
অগ্রগতিতে প্রত্যাশিত অবদান হিসেবে বিবেচিত। সবশেষে আবারও ফিরে আসতে হয় সেই মৌলিক প্রশ্নে:
আমরা কি মানুষকে মানুষ হিসেবে গ্রহণ করতে প্রস্তুত, নাকি এখনো দেবতা নির্মাণ ও ভাঙার দোলাচলেই
আবদ্ধ থাকতে চাই? আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদকে ঘিরে সাম্প্রতিক আলোচনাগুলো আমাদের সামনে এই
আত্মসমালোচনার দর্পণই তুলে ধরে। কোনো ব্যক্তির সীমাবদ্ধতা, মতবিরোধ বা বিতর্ককে অজুহাত
বানিয়ে তাকে সম্পূর্ণভাবে অস্বীকার করার প্রবণতা আসলে আমাদের নিজেদের বৌদ্ধিক
অপরিপক্কতারই প্রতিফলন। কারণ যে সমাজ যৌক্তিক চিন্তাভাবনায় ব্যক্তির ব্যক্তিক সীমাবদ্ধতা ও
তার অবদানের মধ্যে পার্থক্য করতে শেখে না, সে সমাজ শেষ পর্যন্ত সামষ্টিক কল্যাণের রাজপথ তথা
স্বাধীন চিন্তার চর্চাকেই পরিহার করে।
একটি সুস্থ, গণতান্ত্রিক ও মার্জিত সমাজে ব্যক্তির মূল্যায়ন হয় তার সামগ্রিক অবদানের আলোকে,
বিশেষ করে তার শক্তি ও দুর্বলতা, সাফল্য ও সীমাবদ্ধতার সমন্বিত পাঠের মাধ্যমে। সেই দৃষ্টিকোণ
থেকে দেখলে, বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের মাধ্যমে যে বৌদ্ধিক ও সাংস্কৃতিক জাগরণ সৃষ্টি হয়েছে, তা কোনো
একক বিতর্ক বা অভিযোগের গণ্ডিতে আবদ্ধ করে দেখা যায় না। বরং এটি প্রমাণ করে একজন মানুষ তাঁর
সব অসম্পূর্ণতা নিয়েও, কীভাবে একটি জাতির পাঠাভ্যাস, চিন্তার জগৎ এবং আত্মপরিচয়ের বিনির্মাণে
দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব ফেলতে পারেন। প্রতিষ্ঠানটির উদ্দেশ্য, কর্মপদ্ধতি কিংবা সম্ভাব্য নেতিবাচক
প্রভাব নিয়ে গঠনমূলক আলাপ-আলোচনা, সমালোচনা-পর্যালোচনা অবশ্যই হতে পারে; বরং হওয়াই উচিত।
সেই বিশ্লেষণের ভিত্তিতে আরও শক্তিশালী ও কার্যকর প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার চিন্তাও আমাদের জন্য
জরুরি। শহীদ ওসমান হাদীর নৈতিক অবস্থান উল্লেখ করে আগেই বলা হয়েছে, শক্তিমান প্রতিপক্ষের
বিপক্ষে দাঁড়ানোই আমাদের উৎকর্ষ ও অগ্রগতির সোপান। আমাদের দেশে প্রতিষ্ঠানের বড্ড অভাব
রয়েছে এবং এ বাস্তবতায় একটি প্রতিষ্ঠানের সবকিছুই খারাপ হতে পারে না। তাই ব্যক্তি বা
প্রতিষ্ঠানকে ভেঙে ফেলার চেয়ে তাদের চেয়ে শক্তিশালী বিকল্প নির্মাণই হওয়া উচিত প্রকৃত চ্যালেঞ্জ।
অর্থাৎ আবদুল্লাহ আবু সায়ীদের বিপরীতে আপনি আরো শক্তিশালী মানুষ হিসেবে নিজেকে প্রমাণ করুন,
কিংবা তাঁর বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রের বিপরীতে আরো শক্তিশালী প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলুন।
পরিশেষে বলতে চাই, এই সময়ের সবচেয়ে বড় প্রয়োজন ব্যক্তিকে নিখুঁত প্রমাণ করা নয়, কিংবা তাকে
ভেঙে ফেলা নয়; বরং তাকে তার মানবিক মর্যাদায় সমসাময়িক বাস্তবতায় বুঝে নেওয়া। সমালোচনা থাকবে
এবং থাকতেই হবে; কিন্তু সেই সমালোচনা হতে হবে শালীন, তথ্যনির্ভর, যৌক্তিক এবং বৌদ্ধিকভাবে
সৎ। কারণ যে সমাজ সমালোচনার ভাষা হারায়, সে সমাজ শেষ পর্যন্ত সত্য বলার সক্ষমতাও হারায়।
আমাদের উচিত হবে এই উপলব্ধি থেকে শিক্ষা নেওয়া যে, প্রান্তিক মানস ও প্রাতিস্বিক ব্যক্তিত্বদের
প্রতি সহনশীলতা ও ন্যায্যতা প্রদর্শন করা মানে তাঁর প্রতি অন্ধ আনুগত্য দেখানো নয়; বরং এটি
আমাদের নিজেদের বৌদ্ধিক পরিপক্বতা এবং নৈতিক দক্ষতা ও দৃঢ়তার প্রমাণ। আর ঠিক এই জায়গাতেই
আব্দুল্লাহ আবু সায়ীদ আমাদের জন্য এক গুরুত্বপূর্ণ আয়না হয়ে উঠতে পারেন যেখানে আমরা শুধু তাঁকে
নয়, নিজেদেরকেও নতুন করে চিনতে শিখি।
লেখক: ভিজিটিং ফ্যাকাল্টি, ইউনিভার্সিটি অব রোহ্যাম্পটন, যুক্তরাজ্য।
১২০ বার পড়া হয়েছে