পোশাকের পরিবর্তন নয়, চাই আত্মার সংস্কার ও মেহনতি মানুষের অধিকার
বৃহস্পতিবার , ৩০ এপ্রিল, ২০২৬ ২:৩৩ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
একটি সমাজ বা রাষ্ট্রের আমূল পরিবর্তন কেবল বাহ্যিক কাঠামোর রদবদলের ওপর নির্ভর করে না। আমরা বারবার শাসনের অলঙ্কার বা পোশাক পরিবর্তন হতে দেখেছি, কিন্তু সাধারণ মানুষের ভাগ্যের চাকা খুব একটা ঘোরেনি। এর মূল কারণ—আমরা কাঠামোর সংস্কার নিয়ে যতটা ভাবি, মানুষের চরিত্রের গভীর সংস্কার নিয়ে ততটা ভাবি না। প্রকৃত সুশাসন ও সমৃদ্ধি নিশ্চিত করতে হলে পরিবর্তনের ছোঁয়া লাগতে হবে আমাদের চিন্তায়, কর্মে এবং রাষ্ট্রীয় দর্শনে।
সুশাসনের মূল ভিত্তি হলো ব্যক্তির সততা, মর্যাদা এবং ‘কগনিটিভ ট্রান্সপারেন্সি’ বা মানসিক স্বচ্ছতা। একজন মানুষের পোশাক তাকে পরিচয় দেয় না, বরং তার কাজ ও আদর্শই তার পরিচয়। প্রতিটি নাগরিক, বিশেষ করে রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্বে যারা থাকেন, তাদের চরিত্রে যদি সততা এবং দায়বদ্ধতা না থাকে, তবে কোনো আইনই সমাজকে কলুষমুক্ত করতে পারবে না। প্রতিটি মানুষকে তার পদের প্রতি ‘ডেডিকেটেড’ হতে হবে; তবেই রাষ্ট্রের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত হবে।
দুর্নীতি আমাদের সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে ক্যান্সারের মতো ছড়িয়ে পড়েছে। সুশাসন প্রতিষ্ঠার প্রথম শর্তই হলো এই দুর্নীতির শিকড় উপড়ে ফেলা। কেবল লোকদেখানো অভিযান নয়, বরং দুর্নীতির উৎস এবং রাঘববোয়ালদের আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে। আইন ও শৃঙ্খলার কঠোর প্রয়োগ এবং প্রমাণের মাধ্যমে মানুষের মনে এই আস্থা ফেরাতে হবে যে—কেউ আইনের ঊর্ধ্বে নয়। প্রতিটি মানুষের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং আইনের শাসন বাস্তবায়নই হবে প্রকৃত রাষ্ট্রের পরিচয়।
আমাদের অর্থনীতি দাঁড়িয়ে আছে কৃষক ও শ্রমিকের ঘামের ওপর। অথচ এই মেহনতি মানুষগুলোই সবচেয়ে বেশি অবহেলিত। প্রকৃত সংস্কার হতে হবে তাদের কেন্দ্র করে!
কৃষক যেন সিন্ডিকেট বা মধ্যস্বত্বভোগীর হাতে জিম্মি না থাকে, তাদের ফসলের ন্যায্য মূল্য এবং কৃষি উপকরণ সহজে পাওয়া নিশ্চিত করতে হবে।
শিল্প খাতের বিকাশে শ্রমিকের অধিকার রক্ষা এবং কাজের সুস্থ পরিবেশ নিশ্চিত করা অপরিহার্য। শিল্পায়ন ছাড়া বেকারত্ব দূর করা সম্ভব নয়।
বেকারদের জন্য কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং নিম্ন আয়ের মানুষের জন্য ‘ইনকাম সিকিউরিটি’ বা আয়ের সুরক্ষা প্রদান করা রাষ্ট্রের প্রধান অঙ্গীকার হওয়া উচিত। পেটে খিদে নিয়ে মানুষের কাছ থেকে নৈতিকতা আশা করা কঠিন।
একটি জাতির দীর্ঘমেয়াদী উন্নতির জন্য প্রয়োজন যুগোপযোগী শিক্ষা ব্যবস্থা। কেবল সার্টিফিকেট-ধারী শিক্ষিত নয়, বরং নৈতিকতাসম্পন্ন দক্ষ মানবসম্পদ তৈরি করতে হবে। শিক্ষার সাথে যোগ হতে হবে আমাদের হাজার বছরের সংস্কৃতি ও কৃষ্টি। অপসংস্কৃতির আগ্রাসন রোধ করে সুস্থ ও সৃজনশীল সাংস্কৃতিক চর্চা মানুষের মনকে উদার করে। সংস্কৃতিই একটি জাতির আত্মার পরিচয় বহন করে, তাই একে রক্ষা করা আমাদের জাতীয় কর্তব্য।
তাত্ত্বিকভাবে আমাদের সংবিধানে অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, শিক্ষা ও চিকিৎসার নিশ্চয়তা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে দেশের একটি বড় অংশ এখনো মানসম্মত চিকিৎসা বা উন্নত শিক্ষা থেকে বঞ্চিত। মৌলিক চাহিদাগুলো যখন কেবল অধিকার হিসেবে কাগজে থাকে কিন্তু সুযোগ হিসেবে সবার কাছে পৌঁছায় না; তখন রাষ্ট্রের ধারণা পূর্ণতা পায় না।
সংবিধানে (অনুচ্ছেদ ১৫) এগুলোকে 'রাষ্ট্রীয় পরিচালনার মূলনীতি' হিসেবে রাখা হয়েছে; যা সরাসরি আদালতের মাধ্যমে বাস্তবায়নযোগ্য নয়। এটাকে আইনি বাধ্যবাধকতায় রূপান্তর করা গেলে মৌলিক চাহিদা পূরণে রাষ্ট্রের দায়বদ্ধতা আরও বাড়ত।
প্রবৃদ্ধির সুফল যখন কেবল একটি নির্দিষ্ট শ্রেণির হাতে কুক্ষিগত হয়, তখন তাকে অন্তর্ভুক্তিমূলক উন্নয়ন বলা যায় না। মধ্যবিত্তের সংকোচন এবং অতিধনীর সংখ্যা বৃদ্ধি সামাজিক অস্থিরতার অন্যতম কারণ।
সুশাসন কেবল সদিচ্ছার বিষয় নয়, বরং প্রতিষ্ঠানগুলোকে (দুদক, নির্বাচন কমিশন, বিচার বিভাগ) রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত করার বিষয়। প্রতিষ্ঠান শক্তিশালী হলে ব্যক্তি পরিবর্তন হলেও পদ্ধতি ঠিক থাকে।
বাংলাদেশ অর্থনৈতিকভাবে অনেক উন্নতি করেছে, মাথাপিছু আয় বেড়েছে। কিন্তু সমস্যা হলো, এই সম্পদ সবার হাতে সমানভাবে যাচ্ছে না। ধনীদের সম্পদ বাড়ছে দ্রুত, আর সাধারণ মানুষ দ্রব্যমূল্যের চাপে হিমশিম খাচ্ছে। দেশে সম্পদের বণ্টন সুষম হওয়া জরুরি।
একটি আদর্শ দেশের বড় বৈশিষ্ট্য হলো স্বচ্ছতা---আমাদের দেশে দুর্নীতি ও জবাবদিহিতার অভাব একটি বড় বাধা। যদি সরকারি সেবাগুলো সাধারণ মানুষ কোনো ভোগান্তি ছাড়াই পেত--- তবেই আমরা আদর্শ অবস্থানের দিকে আরও একধাপ এগোতে পারতাম।
এত সীমাবদ্ধতার মাঝেও ইতিবাচক দিক হলো আমাদের দেশের মানুষের সহনশীলতা এবং পরিশ্রম। অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও প্রযুক্তির ছোঁয়া সাধারণ মানুষের জীবনকে আগের চেয়ে সহজ করেছে। তরুণ প্রজন্ম যদি দক্ষ হয়ে গড়ে ওঠে এবং সুশাসন নিশ্চিত হয়; তবে বাংলাদেশ অবশ্যই একটি আদর্শ রাষ্ট্রে পরিণত হবে।
পরিবর্তনের হাওয়া কেবল পতাকায় লাগলে চলবে না, তা লাগতে হবে মানুষের অন্তরে। আইন আছে, কিন্তু তার সঠিক বাস্তবায়ন নেই—এমন পরিস্থিতির অবসান ঘটাতে হবে। প্রতিটি মানুষ যখন দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ হয়ে নিজের দায়িত্ব পালন করবে এবং রাষ্ট্র যখন শ্রমিকের ঘামের মূল্য ও কৃষকের ফসলের মর্যাদা দেবে, তখনই প্রতিষ্ঠিত হবে প্রকৃত সুশাসন।
সুশাসন কোনো অলৌকিক বিষয় নয়, এটি একটি নিরন্তর সাধনা। যখন রাষ্ট্রের প্রতিটি স্তরে স্বচ্ছতা আসবে, যখন কৃষক ও শ্রমিক সম্মানের সাথে বাঁচতে পারবে, যখন শিক্ষা ও সংস্কৃতি আমাদের জাতীয় পরিচয়কে শক্তিশালী করবে—তখনই আমরা একটি আদর্শ রাষ্ট্র পাব।
চরিত্রের পরিবর্তন, দুর্নীতির অবসান এবং মেহনতি মানুষের অধিকার রক্ষা—ই হোক আমাদের আগামীর বাংলাদেশ।
১২৫ বার পড়া হয়েছে