প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মিড-ডে মিল: পুষ্টির প্রতিশ্রুতি, না-কি মানহীনতার শঙ্কা ?
রবিবার, ২৬ এপ্রিল, ২০২৬ ৪:৪৮ অপরাহ্ন
শেয়ার করুন:
শিক্ষার্থীদের ঝরে পড়া রোধ, বিদ্যালয়ে উপস্থিতি বৃদ্ধি এবং পুষ্টি নিশ্চিত করার লক্ষ্যে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে মিড-ডে মিল কর্মসূচি চালু হয়েছে—যা নিঃসন্দেহে একটি সময়োপযোগী ও প্রশংসনীয় উদ্যোগ।
গত বছরের ১৫ নভেম্বর থেকে শুরু হওয়া এই কর্মসূচির আওতায় সপ্তাহে পাঁচদিন শিক্ষার্থীদের জন্য ফর্টিফাইড বিস্কুট, ডিম, ইউএইচটি দুধ, বনরুটি এবং মৌসুমি ফল সরবরাহের কথা রয়েছে।
কুষ্টিয়ার কুমারখালী উপজেলার ১৪৭টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে এই কর্মসূচি বাস্তবায়িত হচ্ছে। উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা যায়,
মেসার্স সৈকত এন্টারপ্রাইজ ও ওসাকা নামের একটি এনজিও খাবার সরবরাহ করছে। ২০২৫ সালের চাহিদা অনুযায়ী প্রায় ২৬ হাজার ৮৪০ জন শিক্ষার্থীর জন্য তারা খাবার সরবরাহ করছে।
তবে এ বছর শিক্ষার্থীর সংখ্যা বৃদ্ধি পেলেও সেই অনুপাতে খাদ্য সরবরাহ বাড়েনি—যা স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নের জন্ম দেয়।
এর চেয়েও উদ্বেগজনক বিষয় হলো—সরবরাহকৃত খাবারের মান নিয়ে উঠে নানা অভিযোগ। স্থানীয় অভিভাবক, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের ভাষ্যমতে, অনেক ক্ষেত্রে নষ্ট বা অপরিপক্ব কলা, আধাসিদ্ধ বা নষ্ট ডিম, এমনকি ফাংগাস ধরা পাউরুটি পর্যন্ত বিতরণ করা হচ্ছে। এসব অভিযোগ বিচ্ছিন্ন নয়; বরং একাধিক স্থানে একই ধরনের সমস্যা দেখা যাচ্ছে বলে জানা গেছে।
প্রশ্ন হলো—এই খাবারের মান যাচাইয়ের দায়িত্ব কার? শুধুমাত্র শিক্ষকরা কি এই গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব যথাযথভাবে পালন করতে সক্ষম?
অভিভাবকদের মতে, চোখে দেখে ভালো বা খারাপ বলা যথেষ্ট নয়; খাদ্যের গুণগত মান পরীক্ষার জন্য প্রয়োজন বিশেষজ্ঞ পর্যায়ের তদারকি।
তাদের আশঙ্কা, মানহীন খাবার শিশুদের স্বাস্থ্যের জন্য ঝুঁকিপূর্ণ তো বটেই, পাশাপাশি পুষ্টিকর খাবারের প্রতিও তাদের অনীহা তৈরি করতে পারে।
একজন অভিভাবকের পাঠানো আধাসিদ্ধ ডিমের ছবি যেন পুরো পরিস্থিতির প্রতীক। শিশুদের হাতে যদি এমন খাবার তুলে দেওয়া হয়, তাহলে এই মহৎ উদ্যোগের উদ্দেশ্যই প্রশ্নবিদ্ধ হয়ে পড়ে।
উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা এ বিষয়ে অবগত হয়েছেন এবং উর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে বিষয়টি জানিয়েছেন। তিনি আশ্বস্ত করেছেন যে, একটি মনিটরিং কমিটি রয়েছে এবং দ্রুত এ বিষয়ে সভা করে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়া হবে। তবে বাস্তবতা হচ্ছে—সমস্যা চিহ্নিত হওয়া আর তা কার্যকরভাবে সমাধান হওয়া এক বিষয় নয়।
মিড-ডে মিল কর্মসূচি নিঃসন্দেহে শিক্ষার্থীদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ সহায়ক উদ্যোগ। কিন্তু এর সফলতা নির্ভর করছে খাবারের গুণগত মান, সঠিক সরবরাহ ব্যবস্থা এবং কঠোর তদারকির ওপর। শুধুমাত্র কর্মসূচি চালু থাকলেই হবে না; তা যেন কার্যকর ও নিরাপদভাবে বাস্তবায়িত হয়, সেটিই সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ।
এখন প্রয়োজন—সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের আন্তরিকতা, নিয়মিত মান যাচাই, এবং জবাবদিহিমূলক তদারকি ব্যবস্থা। শিশুদের পুষ্টি নিয়ে কোনো ধরনের আপস গ্রহণযোগ্য নয়। কারণ আজকের এই শিশুরাই আগামী দিনের ভবিষ্যৎ।
লেখক: হাবীব চৌহান, সাংবাদিক
১৪০ বার পড়া হয়েছে