তৃণমূলের ক্রীড়া বিপ্লবঃ বিশ্বমঞ্চে বাংলাদেশের নতুন স্বপ্ন
সোমবার, ২৭ এপ্রিল, ২০২৬ ৪:১০ পূর্বাহ্ন
শেয়ার করুন:
একটি সুস্থ, সবল ও মেধাবী প্রজন্ম গড়ে তোলার লক্ষ্যে সরকার সম্প্রতি ৩য় থেকে ৯ম শ্রেণি পর্যন্ত ৭টি খেলা (ফুটবল, ক্রিকেট, কাবাডি, ভলিবল, অ্যাথলেটিক্স, ব্যাডমিন্টন ও সাঁতার) বাধ্যতামূলক করার যে গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তা বাংলাদেশের ক্রীড়া ইতিহাসে এক নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে।
এই মহৎ উদ্যোগকে সফল করতে হলে কেবল কাগজে কলমে নিয়ম করলে হবে না; প্রয়োজন মাঠপর্যায়ের কাঠামোগত আমূল পরিবর্তন এবং প্রকৃত ক্রীড়াবিদদের সক্রিয় অংশগ্রহণ করাতে পারলে; হতে পারে এই পরিকল্পনার বাস্তব প্রতিফলন।
যেকোনো কাজের সফলতা নির্ভর করে সঠিক মানুষের হাতে দায়িত্ব প্রদানের ওপর। বর্তমান প্রেক্ষাপটে ক্রীড়াঙ্গনের সবচেয়ে বড় শক্তি হলো আমাদের দেশের সাবেক খেলোয়াড়রা। যারা অতীতে মাঠ ও ময়দানের ঘাম ঝরিয়েছেন, তারাই সবচেয়ে ভালো জানেন একজন শিশুকে কীভাবে খেলোয়াড় হিসেবে গড়ে তুলতে হয়। প্রতিটি জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে অভিজ্ঞ ও নিবেদিতপ্রাণ সাবেক খেলোয়াড়দের নীতিনির্ধারণী ও তদারকির দায়িত্ব দিতে হবে। তাদের অভিজ্ঞতা ও প্যাশনই হবে তৃণমূলের ক্রীড়া উন্নয়নের মূল চালিকাশক্তি।
বর্তমানে প্রতিটি উপজেলায় ‘উপজেলা ক্রীড়া সংস্থা’ থাকলেও সেগুলো কার্যত স্থবির ও অকার্যকর হয়ে আছে।
এই সংস্থাকে সচল করতে হলে
রাজনৈতিক পরিচয় নয়, বরং সাবেক খেলোয়াড় ও প্রকৃত ক্রীড়া সংগঠকদের ভোটাধিকার ও নির্বাহী ক্ষমতা দিতে হবে।
উপজেলার কেন্দ্রীয় খেলার মাঠটি যেন সারাবছর কেবল খেলোয়াড়দের অনুশীলনের জন্য উন্মুক্ত থাকে, তা নিশ্চিত করার সর্বময় ক্ষমতা এই সংস্থাকে দিতে হবে।
যেকোনো কাজের সফলতা নির্ভর করে সঠিক মানুষের হাতে দায়িত্ব প্রদানের ওপর। বর্তমানে প্রতিটি উপজেলায় ‘উপজেলা ক্রীড়া সংস্থা’ থাকলেও সেগুলো কার্যত স্থবির ও অকার্যকর হয়ে আছে।
যোগ্য ক্রীড়াবিদদের জায়গা না পাওয়া এবং জবাবদিহিতার অভাব তৃণমূলের ক্রীড়াকে পঙ্গু করে দিয়েছে।
কেন্দ্রীয় খেলার মাঠগুলো মেলা, রাজনৈতিক সভা বা অন্য ব্যবসায়িক কাজে ব্যস্ত থাকে, যা কোমলমতি শিশুদের খেলাধুলার অধিকার কেড়ে নিচ্ছে।
বাজেট বরাদ্দের অপ্রতুলতা এবং দীর্ঘ ধারাবাহিকতার অভাবে দেশের ক্রীড়াঙ্গন স্থবির হয়ে আছে।আমাদের জাতীয় বাজেটের বিশাল আকারের তুলনায় যুব ও ক্রীড়া খাতের বরাদ্দ অত্যন্ত নগণ্য।
সর্বশেষ বাজেটেও এই বরাদ্দ মোট জাতীয় বাজেটের মাত্র ০.৩০% থেকে ০.৩১% এর মধ্যে সীমাবদ্ধ।এর বড় অংশ আবার ব্যয় হয় অবকাঠামো নির্মাণ ও পরিচালন খাতে।ফলে তৃণমূল পর্যায়ে মানসম্মত ক্রীড়াসরঞ্জাম কেনা বা নিয়মিত টুর্নামেন্ট আয়োজনের মতো মৌলিক কাজগুলো চরম অর্থ সংকটে থমকে দাঁড়ায়; জাতীয় বাজেটে সরাসরি উপজেলা ক্রীড়া
সংস্থার জন্য বিশেষ বরাদ্দ রাখতে হবে যেন তারা স্থানীয় টুর্নামেন্ট ও সরঞ্জাম কেনায় স্বাবলম্বী হতে পারে।
তৃণমূল থেকে প্রতিভা বাছাই বা ‘ট্যালেন্ট হান্ট’-এর জন্য সাবেক খেলোয়াড়দের ‘মেন্টর’ বা
অন্বেষক হিসেবে নিয়োগ দিতে হবে।এই মহৎ কাজের স্বীকৃতিস্বরূপ তাদের জন্য একটি সম্মানজনক মাসিক সম্মানী বা বিশেষ
ভাতা নিশ্চিত করতে হবে। এতে একদিকে যেমন তাদের আর্থিক নিরাপত্তা ও সামাজিক মর্যাদা নিশ্চিত হবে, অন্যদিকে তারা সম্মানের সাথে দেশ গড়ার কাজে নিজেদের উজাড় করে দিতে পারবেন। তারা সরাসরি প্রাইমারি লেভেল থেকে জহুরিরমতো প্রতিভা বাছাই করে বড় বড় ফেডারেশন ও বোর্ডের কাছে পৌঁছে দেবেন।
সরকার ও সাবেক খেলোয়াড়দের সাথে তৃতীয় শক্তি হিসেবে কর্পোরেট সেক্টরকে যুক্ত করতে হবে। বড় বড় কোম্পানিগুলো তাদের সিএসআর (CSR) ফান্ডের মাধ্যমে নির্দিষ্ট উপজেলা বা স্কুলগুলোর দায়িত্ব গ্রহণ করবে। এই অর্থ সরাসরি সাবেক খেলোয়াড়দের পরিচালিত কোচিং ক্যাম্প, সরঞ্জাম সরবরাহ এবং মাঠ সংস্কারে ব্যয় হবে। এর ফলে সরকারি তহবিলের ওপর চাপ কমবে এবং প্রতিটি উপজেলা এক একটি ‘স্পোর্টস হাব’-য়ে পরিণত হবে।
পুরো প্রক্রিয়াটিকে দুর্নীতি ও স্বজনপ্রীতিমুক্ত রাখতে একটি স্বাধীন ক্রীড়া মনিটরিং সেল গঠন করা অপরিহার্য। সাবেক খেলোয়াড়রাই এখানে জুরি হিসেবে কাজ করবেন। প্রতিটি বাছাই প্রক্রিয়ার ডিজিটাল ডাটাবেজ থাকবে, যেন কোনো অজুহাতে প্রকৃত মেধা ঝরে না পড়ে।
এই সুসংগঠিত কাঠামো কার্যকর হলে গ্রাম থেকে শহর—সর্বত্র একটি সুস্থ ক্রীড়া-সংস্কৃতি গড়ে উঠবে;ফলে তরুণ সমাজ মাদক ও ডিজিটাল ডিভাইসের আসক্তি থেকে দূরে থাকবে।
সবচেয়ে বড় কথা, সঠিক প্রশিক্ষণের মাধ্যমে প্রতি বছর জাতীয় দলগুলো প্রতিভাবান খেলোয়াড় পাবে----যারা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে লাল-সবুজের পতাকাকে নতুন উচ্চতায় নিয়ে যাবে। সর্বত্র মাঠে খেলা থাকতে হবে জেলা, উপজেলা, বিভাগে নিয়মিত প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় শ্রেণীর টুর্নামেন্টগুলো সচল ও সক্রিয় করতে হবে। স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ভিত্তিক টুর্নামেন্ট পরিচালনা এবং মাঠে তৃণমূল থেকেই সকল শ্রেণীর শিশুদের আনতে হবে ; এ ব্যাপারে অভিভাবকদেরও একটা বড় ভূমিকা রাখতে হবে। তাহলেই বাংলাদেশ বিশ্বমঞ্চে প্রতিযোগিতা কররতে পারবে এবং একদিন যে কোন খেলায় সর্বোচ্চ ট্রফি নিয়ে আসতে পারবে।
সবিশেষ, উপজেলা ক্রীড়া সংস্থাগুলোকে সচল করা
এবং সাবেক খেলোয়াড়দের মর্যাদা ও দায়িত্ব প্রদানই হতে পারে বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের ‘গেম চেঞ্জার’।
সরকারের বাধ্যতামূলক ক্রীড়া কর্মসূচিকে এই পেশাদার কাঠামোর সাথে মেলাতে পারলে তৃণমূলের ধূলোবালি থেকে উঠে আসবে আগামী দিনের সম্ভাবনাময়ী তারকারা।সকল পরিকল্পনাগুলোবাস্তবায়িত হলে, বাংলাদেশের ক্রীড়াঙ্গনের পরিবর্তনগুলো
আমরা খুব দ্রুত দেখতে পাব।
প্রাবন্ধিক, সমাজকর্মী।
২৭৬ বার পড়া হয়েছে